ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ২৭ মিনিট আগে
শিরোনাম

কমলগঞ্জে ফলবাগান উচ্ছেদ, উঠছে অনিয়মের অভিযোগ

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১:১৫  
আপডেট :
 ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১:২৩

কমলগঞ্জে ফলবাগান উচ্ছেদ, উঠছে অনিয়মের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সংরক্ষিত বনভূমিতে এক ব্যক্তির গড়ে তোলা বাগানের ছয় শতাধিক মাল্টা ও কমলা গাছ কেটে দিয়েছে বন বিভাগ।

গত ১৬ জুলাই উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে বাগানটি উচ্ছেদ করা হয়।

উপজেলার আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি বস্তি এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমিতে বাগানটি গড়ে তুলেছিল বন এলাকার বাসিন্দা মুহিবুল্লাহর পরিবার।

পরিবারটির অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে বন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে আসছেন। এবার টাকা দিতে না পারায় ফলবাগান কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া বন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে লিখিত অভিযোগ করায় তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।

তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে বাণিজ্যিক ফলবাগান করার সুযোগ নেই। তাই বন বিভাগের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতেই আইন অনুযায়ী এ অভিযান চালানো হয়েছে।

বিএনপি সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির মধ্যে ফলবাগান উচ্ছেদের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন।

অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের বক্তব্য নিয়েছে।

সরেজমিনে কালিঞ্জি বস্তি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢালে সারি সারি কাটা মাল্টা ও কমলা গাছ পড়ে আছে। গাছে এখনও ফল ঝুলছে।

বন এলাকার বাসিন্দা মুহিবুল্লাহর স্ত্রী আলেকজান বিবি গণমাধ্যমকে বলেন, “বাগানটি ঘিরে তারা স্বপ্ন দেখছিলেন। বন বিভাগের লোকজন গাছ কাটার সময় অসহায়ভাবে তাদের দেখতে হয়েছে। তাদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, বন বিভাগই তার স্বামীকে ‘বন ভিলেজার’ হিসেবে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিল। বাড়ির পাশের খালি জায়গায় সাত থেকে আট বছর আগে পাঁচ শতাধিক মাল্টা ও অর্ধশতাধিক কমলার চারা রোপণ করেছিলেন তারা।

পরিবারের সব সঞ্চয় সেখানে বিনিয়োগ করে ছেলে আলিম উল্লাহ বাগান গড়ে তোলেন। এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফল সংগ্রহের আশা ছিল। সম্প্রতি গাছে ফল আসাও শুরু করেছিল।

এর মধ্যেই যৌথ অভিযানে বাগানটি উচ্ছেদ করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত বন ভিলেজার মুহিবুল্লাহ অভিযোগ করে গণমাধ্যমকে বলেন, “বনের ভেতরে কোনো কাজ করতে গেলেই বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে বাধা কিংবা মামলার মুখে পড়তে হয়। এবার পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিলেন তারা। দিতে না পারায় ফলের বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছিলেন। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, আদমপুর বন বিটের আয়তন ১৩ হাজার ৮০ একর। এখানে একজন বিট কর্মকর্তা, চারজন বনপ্রহরী ও ৮৫ জন বন বাসিন্দা বা বন ভিলেজার রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বন বাসিন্দা পরিবারের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে দুই শতাধিক পরিবার সেখানে বসবাস করছে।

আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার গণমাধ্যমকে বলেন, মুহিবুল্লাহর ছেলে আলিম উল্লাহ সংরক্ষিত বনের প্রায় পাঁচ একর জমি অবৈধভাবে দখল করে মাল্টা ও কমলার বাগান করেন। পাশাপাশি পাহাড় কেটে সমতল করা, পুকুর খনন এবং টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়।

তার দাবি, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল বনপ্রহরীরা অবৈধভাবে মাটি কাটা ও সীমানা বেড়া স্থাপনে বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে বনপ্রহরী শাহীনুর আলম আহত হন। ওই ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় মামলাও করা হয়।

পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অর্জুন কান্তি বলেন, “যেখানে ফলের বাগান করা হয়েছে সেখানে আগে বন বিভাগের রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। ধীরে ধীরে সেসব গাছ কেটে জায়গাটি দখল করা হয়েছে। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী মুহিবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালেও বনজ গাছ কাটার অভিযোগে তিনটি মামলা রয়েছে।”

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বন বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের সহযোগিতায় সেখানে বসবাস করছেন এবং ছোট পরিসরে কৃষিকাজও করেন। তবে বনের ভেতরে নতুন স্থাপনা বা আবাদ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিরোধের ঘটনাও ঘটে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রিতম বড়ুয়া বলেন, “চাঁদা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করাই অভিযানের উদ্দেশ্য।”

তিনি বলেন, “বন আইনে সংরক্ষিত বনভূমিতে বাণিজ্যিক ফলের বাগান করার কোনো সুযোগ নেই। আর ফলের গাছ রেখে দিলে জমিটি কার্যত ব্যক্তিগত দখলেই থেকে যেত। তাই বনভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য গাছ অপসারণ ছাড়া বিকল্প ছিল না।”

ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান বলেন, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বন বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়েছেন।

তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় নথিপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে বাস্তবতার ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন সরকার ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হবে।”

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, “এটি সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার অভিযানের অংশ। যেখানে ফলের বাগান করা হয়েছে সেখানে আগে বন বিভাগের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। সেগুলো কেটে জমি দখল করে ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বন ভিলেজার ব্যবস্থা চালুর সময় পরিবারগুলোকে নিচু জমিতে সীমিত আকারে ধান চাষের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাহাড় বা টিলায় বাণিজ্যিক ফলের বাগান করার কোনো বিধান বন আইনে নেই।”

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের মোট আয়তন ২০ হাজার ২৭০ একর। এর মধ্যে ছয় হাজার একরের বেশি বনভূমি বিভিন্নভাবে দখলের শিকার হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, “বিগত বছরগুলোতে সংরক্ষিত বনের অনেক জমি দখল হয়েছে। বন রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর এবং যেখানে খালি জমি রয়েছে সেখানে বনায়নের নির্দেশনা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “তবে যদি কেউ অসাধু উপায়ে বা অর্থের বিনিময়ে বনভূমি দখলের সুযোগ দিয়ে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সূত্র: বিডি নিউজ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত