ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:৪২

প্রিন্ট

সর্বনাশা রোহিঙ্গারা, টেকনাফে উদ্বেগ

সর্বনাশা রোহিঙ্গারা, টেকনাফে উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক

রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ আর তীব্র আপত্তির কারণে তাদের মিয়ানমার ফেরত যাওয়ার আরেকটি উদ্যোগও ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের প্রত্যাবাসন না হওয়ায় আপাতত কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন টেকনাফের স্থানীয় মানুষজন। কারণ প্রতিনিয়ত সহিংস হয়ে উঠছে তারা। মারামারি খুন চুরি ডাকাতি জমিদখল মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান অবৈধ দেহ ব্যবসা সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং বন উজাড়সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

এর ফলে ধীরে ধীরে সর্বনাশা রূপধারণ করছে ভিনদেশি এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন। এদিকে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও এনজিওর প্রলোভনে আরাম আয়েশে জীবনযাপনের লোভেও তারা দেশে ফিরতে চাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় কয়েকটি সূত্র।

অন্যদিকে গত দু’বছর আগে রোহিঙ্গাদের নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে সহানুভূতি-সহমর্মিতা ছিল এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং তাদের নিয়ে অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন তারা। রোহিঙ্গারা আদৌ মিয়ানমারে ফিরবে কি না সেটি নিয়েও তারা এখন সন্দিহান স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে উখিয়ার ঠ্যাংখালী বাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাফেজ এজহারুল হক বলেন, রোহিঙ্গারা এখন পুরো এলাকার জন্য নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের নিয়ে আমরা স্থানীয় জনগণ হিমশিম খাচ্ছি।’

১৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পলাগোয়া বাংলাদেশি এক পরিবারের আতঙ্ক আরও বেশি। তাদের চাষের জমিজমা ক্ষেতখামারে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে উল্টো তাদেরই এলাকাছাড়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করে পরিবারটি।

গৃহকর্ত্রী মুরশিদা বেগম বলেন, বাধ্য হয়ে আর্মি ডেকে রোহিঙ্গাদের শাসাতে হয়েছে। তার সন্দেহ এই রোহিঙ্গারা আর ফেরত যাবে না।

তিনি বলেন, এরা (রোহিঙ্গারা) আসলে যাবে না। এমন সহযোগিতা পেলে কেউ যায়! আমাদের তারা বলে এ জমি হাসিনা তুর্কির কাছে বেচে দিছে। এটা আমাদের জায়গা। তোমরা চলে যাও।

উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ১৮হাজার ৫৭৬ জন। যার মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরই এসেছে ৭লাখ ৪১হাজার ৮৪১ জন। এই জনসংখ্যা পুরো কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের চেয়েও অনেক বেশি।

রোহিঙ্গাদের মুখে খাবার তুলে দেয়া ফারুক তাদেরই হাতে খুন:

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও খাবার জোগাড় করে দিয়েছেন যিনি, তাকেই প্রাণ হারাতে হলো তাদের হাতে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের ছবি পোস্ট করে সেই কথাই জানান দেয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গাদের হাতে যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক খুনের পর স্থানীয় বাসিন্দারা এসব বলছেন। তারা বলছেন, এটাই কি মানবতার প্রতিদান! এ কেমন মৃত্যু!

মিয়ানমারের রাখাইনের মৃত্যুকূপ থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যখন দিশেহারা, তখন টেকনাফে অনেকের মতো যুবলীগ নেতা ওমর ফারুকও (৩২) তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছিলেন। তার বাবা নিজস্ব ১৪ একর জমিতে প্রায় ৫ হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আর সেই ওমর ফারুক বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা শিবিরের ডি-ব্লকে খুন হলেন রোহিঙ্গাদের হাতে।

মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ রোহিঙ্গারা:

এদিকে দুবছর ধরে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করলেও নিজদেশে ফেরার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না রোহিঙ্গারা। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, নাগরিকত্ব ও রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি, নিজস্ব ঘরবাড়ি সম্পত্তি ফেরত, নিরাপত্তা এবং নির্যাতনের বিচারের দাবি পূরণ না হলে দেশে ফিরে যাবেন না।

ক্যাম্পে অবস্থিত মিয়ানমারের বুচিডং এলাকার নেতা আবুল বাসার প্রায় সোয়া লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন। ফেরার প্রশ্নে তাদের ৫-দফা পূরণের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার ভয় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে আবার ক্যাম্পে ঢোকানো হবে।

তার ভাষায়, আমাদের যে পাড়া ছিল সেটা সমান করে মগ, চাকমাদের দিয়ে এই মাথায় একটা আর ওই মাথায় একটা ঘাঁটি বসাইছে। তাহলে আমাদের নিয়ে কোথায় রাখবে?

পালিয়ে বাংলাদেশে আসার পথে মগদের হাতে খুন হন রাবিজান বেগমের স্বামী। চারটি মেয়ে নিয়ে তার আশ্রয় হয়েছে টেকনাফের এক ক্যাম্পে। নিজের এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তার প্রতি মুহূর্তের।

তিনি বলেন, আমরা নিজেরাই চলে যেতে চাই। থাকতে চাই না। বিচার পেলে আমরা যাব না হলে ফাঁসি দিলেও আমরা যাব না।

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চায় না মিয়ানমার:

উখিয়া টেকনাফের সব ক্যাম্পেই রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। শিবিরে ৫-দফা দাবিসংবলিত ইংরেজিতে লেখা প্রচারপত্র বিলি করতেও দেখা গেছে তাদের।

তাদের দাবি, ২২ আগস্টের প্রত্যাবাসন মিয়ানমারের একটা লোক দেখানো কূটচালমাত্র। আসলে তারা রোহিঙ্গাদের আর ফেরত নিতে চায় না। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের আগে এই অল্প-কয়েকজন ফিরিয়ে নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এবং সমালোচনা আড়ালের একটি চেষ্টা হচ্ছে বলেও রোহিঙ্গারা মনে করছে।

দুই বছরে এসেও প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারার হতাশা ছিল শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালামের।

তিনি বলেন, দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও বহুল প্রত্যাশিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। এটি দৃশ্যত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেমন একটি হতাশার কারণ হিসেবে বিরাজ করছে একইভাবে উখিয়া ও টেকনাফের যারা স্থানীয় লোকজনের তাদের মধ্যেও একটি বিরাট হতাশা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।

তবে কালাম একই সঙ্গে জানান, জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না এটি বাংলাদেশ সরকারের নীতি।

আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমছে:

অল্প জায়গার মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদা পূরণ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ সংকটে শুরুর মতো সহযোগিতা আর মনোযোগেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যেও আছে উদ্বেগ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর মুখপাত্র জর্জ ম্যাকলিওড বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোটা এখন একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এই শরণার্থীদের প্রতি শুরুতে যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ছিল সেটা এখন নেই।

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত