ঢাকা, রোববার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২০, ২০:১৮

প্রিন্ট

নাটক দিয়েই ফাইট করতে পারবো: নিশো

নাটক দিয়েই ফাইট করতে পারবো: নিশো
আফরান নিশো

ইমরুল নূর

শখের বশে মডেল হলেও অভিনেতা হওয়াটা ছিলো জেদের বশে। সময়টা তখন নব্বইয়ের একদম শেষ দিকে যখন তিনি মডেলিং শুরু করেন। সেসময় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবেই নিজেকে জড়াতে পেরেছিলেন। এরপর ডাক পান বিজ্ঞাপনের; সেখানে কিছুটা পরিচিতি অর্জন করেন। এরপর ২০০৫ সালের অভিনয়ে নাম লেখান ‘ঘরছাড়া’ নাটকে, যেটি পরিচালনা করেছিলেন গাজী রাকায়েত। মডেলরা নাকি অভিনেতা হতে পারেন না- এমন অনেক কথা শুনেছেন তিনি; যার কারণে মনে জেদ চেপে অভিনয়ে পা রাখেন। সময়ের ব্যবধানে নিজেকে গড়ে তোলেন সুপ্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হিসেবে। হ্যাঁ, তিনি আর কেউ নন; সবার পরিচিত ও প্রিয়মুখ আফরান নিশো।

শুক্রবার সন্ধ্যার এক আড্ডায় বাংলাদেশ জার্নালের প্রতিবেদকের সঙ্গে নানামুখী কথা হয় ছোটপর্দার জনপ্রিয় এই অভিনেতার। তিনি এই মুহূর্তে ব্যস্ত রয়েছেন আশফাক নিপুণ পরিচালিত নাটকের শুটিং নিয়ে। এর আগে শেষ করলেন একটি বিজ্ঞাপনের কাজ; যেখানে সচরাচর এখন এই অভিনেতাকে দেখা যায় না।

একজন মডেল থেকে অভিনেতা হয়ে উঠাটা সহজ ছিলো না নিশোর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করে, নানামাত্রিক চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন অনায়াসেই। সময়ের ব্যবধানে তিনি হয়ে উঠেছেন টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা; যার ওপর চোখ বন্ধ করেই নির্মাতা কিংবা প্রযোজকরা ভরসার বাজি ধরতে পারেন। এর জন্য অবশ্য নিজেকে অনেক ভাঙতে হয়েছে, কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নিশোকে।

একজন শিল্পীর মূল্যায়ন কীভাবে হয়? এমন প্রশ্নে আফরান নিশোর এক কথায় জবাব, শিল্পীর মূল্যায়ন হয় শিল্প দিয়ে। শিল্প ছাড়া অন্যভাবে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। একজন অভিনেতা হিসেবে তাকে সবাই মূল্যায়ন করবে তার অভিনয় দেখে। যার অভিনয় যোগ্যতা যত স্ট্রং সে তত বেশি শক্তিশালী। তবে আমাদের এখানে যোগ্য মানুষের মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে। আমি যদি উদাহরণ হিসেবে দেখি, যেমন ধরুন, একজন হুমায়ূন ফরিদী কিন্তু আমাদের দেশের সম্পদ। তাকে আমরা কতটা মূল্যায়ন করতে পেরেছি? অনেক নির্মাতা বা অনেকেই কিন্তু তাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। কিন্তু তিনি যখন চলে গেলেন তখন অনেককেই বলতে শুনেছি ‘একজন হুমায়ূন ফরিদীকে আমরা ঠিকমতো মূল্যায়ন করতে পারিনি’। এটা শুধু হুমায়ূন ফরিদী না, অনেকের ক্ষেত্রেই হয়। এখন আমার কথা হলো, যাকে আমরা বেঁচে থাকতে তার গুণের মূল্যায়ন করতে পারিনি তার চলে যাওয়ার পর এমন কথা-ই বা বলি কী করে!

অভিনয় করতে গিয়ে নানামাত্রিক চরিত্রে নিশোকে দেখা যায়। প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে বেশ সুন্দর করে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন তিনি। যে কারণে সময়ের ব্যবধানে এখন তিনি অন্যতম একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি চরিত্রের জন্য নিজেকে ভাঙতে গিয়ে কখনও কি মনে হয় যে, নিজেকে অনেক বেশি ভাঙচুর করে ফেলছি? এই নায়কের স্পষ্ট উত্তর, গল্প ও চরিত্রের জন্য নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করা দরকার সেটা ঠিকমতো করার চেষ্টা করি। এখানে ভাঙচুরের কিছু নেই। অভিনেতার কাজ অভিনয় করে যাওয়া। তার চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। আমি সেটাই করি।

অনেক সময় বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হই যে, একমুখী চরিত্রে দেখতে দর্শকরা অভ্যস্ত না। দর্শকরা বোরড হন। কিন্তু আমার কথা হলো, আমি যদি আমার কথা-ই বলি তাহলে বলবো, আমার যারা ভক্ত তারা আমার শুভাকাঙ্ক্ষি। এখন আমি যেটাই করি না কেন, সেটাই তাদের ভালো লাগবে। কথায় বলে না, প্রিয় মানুষের সবকিছু ভালো, মন্দটাও ভালো। বিষয়টা ঠিক এরকমই।

আর আমাকে কখনও কেউ একমুখী চরিত্র নিয়ে কিছু বলেননি। কেউ হয়তো বলেন, উনি এই চরিত্রটা কেন করলেন? বা উনি ঐ চরিত্রটা অনেক ভালো করেছেন। কারও কাছে আমাকে ক্লিন শেইভে ভালো লাগে আবার কারও কাছে দাড়িসহ ভালো লাগে। এটা হচ্ছে যার যার পারসেপশন।

কোনো কাজ প্রচারে এলে সেটি নিয়ে অনেকসময় দর্শকদের ভালো ও মন্দ দুই ধরণের মন্তব্যই দেখা যায়। মন্দের ক্ষেত্রে কোনোসময় সমালোচনারও অন্ত থাকে না। দর্শদকের সেই সমালোচনাগুলোকে কীভাবে নেন আপনি কিংবা তাদের মন্তব্য থেকে কি কাজের ক্ষেত্রে বা নিজের মধ্যে কোনোরকম পরিবর্তন আনেন? নিশো বলেন, আমার গুরু হুমায়ূন ফরিদী আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, ‘কাজ যেটাই করো, মন দিয়ে করবে’; আমি সেটাই করি। মনযোগ দিয়ে কাজটা করে যাই।

সমালোচনা বিষয়টা অবশ্যই আমার জীবনে পজেটিভ। এটাকে আমি সবসময় পজেটিভলি নিই। কারণ সমালোচক মানে হচ্ছে যিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। কোনো বোদ্ধা কিংবা জ্ঞানী মানুষ যখন আমার কোন কাজ দেখে সমালোচনা করেন এবং বলেন, এটা এভাবে নয়; ওভাবে হলে হয়তো আরও ভালো হতো। সেটাকে আমি সবসময় পজেটিভলি গ্রহণ করি এবং সেটা নিজের মধ্যে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। আর দর্শকদের মধ্যে যারা সঠিকভাবে সমালোচনা করেন সেটাও আমার কাছে পজেটিভ। কারণ সেটা আমাকে আরও ভালো পারফর্মার হতে সহযোগিতা করে।

আমরা সবসময় আক্রমণ এবং সমালোচনা দুটোকে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলি, যেটা আসলেই ঠিক নয়। আমি কখনওই কোনো আক্রমণ থেকে নিজেকে পরিবর্তন করি না। কেউ যখন বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো মন্তব্য করেন সেটা কখনওই সমালোচনা না; এটা আক্রমণ। আমাদের এখানে সবাই নিজেকে আলোচক-সমালোচক ভাবে, যদিও তারা বিশ্লেষক না।

সমালোচনা করতে হলে অবশ্যই একটা ন্যূনতম জ্ঞান লাগবে। এরজন্য জ্ঞানী অথবা বোদ্ধা হতে হবে। একজন সমালোচক অবশ্যই কোনো কাজ সম্পর্কে সেটার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখান। কিন্তু আমাদের এখানে বেশিরভাগ সময়েই সমালোচনা না করে আক্রমণ করে বসে। এটা আসলে কোনো জ্ঞানী মানুষের কাজ না, মূর্খের কাজ।

কারণ সব দর্শক তো আর বোদ্ধা না। দর্শকদের মধ্যেও এমন অনেকেই আছেন যারা সুন্দর ও রুচিসম্মত সমালোচনা করেন। যে আমাকে পছন্দ করে সে আমার খারাপটাকেও পছন্দ করে ফেলে আর যে পছন্দ করে না তার কাছে আমার ভালোটাও অনেক সময় অপছন্দ করে। তাই আমি সমালোচনাকে গ্রহণ করি, আক্রমণকে না। আলোচনা আমাকে ভাবায় কিন্তু একটা সঠিক সমালোচনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। সমালোচনার ভিড়ে আক্রমণটা আমাকে কখনওই নাড়া দেয় না।

তারপর আমাদের এখানে আরও একটা ভুল ধারণা আছে যে, যেই মানুষটা প্রেমের নাটক বানায় তার কাছে কমেডিটা ভাঁড়ামি। আবার যে কমেডি বানায় তার কাছে প্রেমের নাটক মানেই লুতুপুতু। আবার যে মানুষ এই দুইটার বাইরে ভিন্নরকম বা অনন্য লেবেলের নাটক বানায় তার কাছে এই দুইটা মানেই ফালতু। এটা শুধুমাত্র আমাদের দেশেই হয়। সেদিক থেকে যে উচ্চমাপের নাটক বানায় সে বোদ্ধা লেবেলের হলেও তার মাইন্ড ন্যারো। এখন তার সমালোচনাতেই আমি নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলব না। তার সমালোচনাটা আমি গ্রহণ করবো কিন্তু পরিবর্তনের বিষয়টা ভাববো একান্তই আমি।

আমি সবার জন্যই কাজ করি। রাস্তার সন্ত্রাসী চরিত্রটাও করি, আবার পুলিশের চরিত্রটাও করি। আবার কখনও কর্পোরেট অফিসের বসের চরিত্রও করি আবারও কখনও চোরেরটাও। এই ভালো লাগাটা আসলে সকলের ভালো লাগার মিশ্রণ। শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট জোন বা দর্শকদের কথা চিন্তা করে আমি কাজ করি না। বোদ্ধা থেকে শুরু করে সব ধরণের কাজই আমাকে করতে হয়। কারণ আমার মধ্যে ভার্সেটাইল কাজ করার ক্ষুধা বেশি।

কখনও দর্শককে ধরার জন্য কাজ করি আবার কখনও দর্শকদের রুচি পরিবর্তন করার জন্য কাজ করি। আমি যখন দর্শককে ধরতে পারবো তখনই আমি তাদের পরিবর্তন করার জন্য কাজ করতে পারবো। আমি যদি দর্শকদের হয়ে কাজ না করি তাহলে তো আমি তাদের পরিবর্তন করতে পারবো না। তার জন্য আগে দর্শকদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে হবে তারপর তাদের নেতা হতে হবে। তারপর সেই ভিড়টাকে নিয়ে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হতে হবে।

প্রায় সময়ই সিনেমার নায়ক হয়ে খবরের শিরোনামে আসেন কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা খবরেই সীমাবদ্ধ। সিনেমায় আপনাকে কবে দেখা যাবে বা সিনেমা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি? নিশো বলেন, আমাদের দেশ বলি বা যেকোনো ইন্ডাস্ট্রি-ই বলি, সিনেমা বিনোদনের সবচেয়ে প্লাটফর্ম বা মাধ্যম। ইচ্ছে যে নাই তা কিন্তু না; ব্যাটে-বলে না মিললে তো আর কিছুই করার থাকেনা। এখন পর্যন্ত অনেক অনেক সিনেমার প্রস্তাবই পেয়েছি; হয় গল্প পছন্দ হলে নির্মাতা পছন্দ না আবার সব ঠিক থাকলে গল্প পছন্দ হয় না। এটাই হয়েছে অনেকবার। আর এও হয়েছে যে, অনেক নির্মাতাই আমাকে বলেছেন ‘ভাই একটা সিনেমার গল্প শোনাতে চাই’; কিন্তু দেখা যায় যে গল্প আমার কাছে আসার আগে সেটা খবরের শিরোনাম হয়ে গেছে। অথচ সেই গল্প আমার শোনাই হয়নি আর সিনেমা করা তো পরের ব্যাপার। যেটার কারণে প্রায় সময়েই বিব্রত ও বিরক্ত হয়েছি আমি।

এছাড়াও আরেকটি বিষয়, অনেকেই সিনেমার ব্যাপারে আমাকে নিয়ে ভাবেন। তাদের অনেকের ভাষ্য থাকে এমন যে, নিশো তোমার কিন্তু সেরাটা দিতে হবে। অথচ আমি আমি সেরাটা চাইলেই আবার তারা বেঁকে বসেন। আমার কাছ থেকে যখন সর্বোচ্চটা নিবেন আমাকেও তো সেটা দিবেন, নাকি? আমি নাটক করছি, নাটকেই ভালো আছি। এখানে বহুমাত্রিক চরিত্রেই নিজেকে উপস্থাপন করেছি। বড় পর্দায় যখন নিজেকে ভাববো তখন নিশ্চয় ব্যতিক্রম এবং এখন পর্যন্ত দর্শক যেমনটা দেখেনি সেরকম কিছু হলে সেটা নিয়ে সামনে এগুবো। আমাকে সেখানে দেখে দর্শকরা দেখে ‘ওয়াও’ না বলুক; এটলিস্ট এটা বলুক যে, নিশো অনেক খেটেছে কাজটার জন্য। আর এমন না যে আমাকে সিনেমা করতেই হবে। সিনেমা না করেও ভালো আছি, মন্দ তো নেই। সিনেমা না করলেও নাটক দিয়েই আমি ইন্ডাস্ট্রিতে ফাইট দিতে পারবো।

বাংলাদেশ জার্নাল/আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত