ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৭ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২১, ১৪:০৮

প্রিন্ট

‘নারী-পুরুষ উভয়ই সমান কিন্তু বঞ্চিত হয় নারীরা’

‘নারী-পুরুষ উভয়ই সমান কিন্তু বঞ্চিত হয় নারীরা’
মেহজাবীন চৌধুরী

ইমরুল নূর

নারী একটা পরিবারের স্তম্ভ, অনুপ্রেরণা। তাদের প্রতি সম্মানার্থেই একটি দিনকে আলাদাভাবে স্মরণ করা হয়। ৮ই মার্চ নারী দিবস। বিশ্বব্যাপী এটি উদযাপিত হয়। এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। বিশেষ এই দিনটিতে নারীর অবদান, মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন ছোট পর্দার বড় তারকা মেহজাবীন চৌধুরী।

নারী দিবস

একটা দিনকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে নারীদের জন্য, এটাকে আমার কাছে ভালোই মনে হয়। দিনটাকে আমরা স্মরণ করি শুধু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র একটা দিনেই নারীদেরকে সম্মান করবো, দুটো কথা লিখবো আর বাকি দিনগুলোতে অসম্মান করবো এমন মন-মানসিকতা থেকে পুরুষদের বের হয়ে আসা উচিত। শিক্ষা কিন্তু একদিনের জন্য নয়, সারাজীবনের জন্য। একইভাবে নারীদেরকে একদিন সম্মান করে পরদিন সেটা ভুলে যাওয়া; এই ধারণা পাল্টাতে হবে।

নারীর মূল্যায়ন

নারীর মূল্যায়নটা আসলে হওয়া উচিত সমাজ থেকে। কারণ এখন পর্যন্ত প্রত্যেকটা কাজের জায়গাই কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক। এখনো সমাজ পুরুষ ও পুরুষদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে আর নারীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে। যতদিন না পর্যন্ত নারীর অবদান এবং মতামতকে তাচ্ছিল্য না করে গুরুত্ব দিচ্ছে; ততদিন পর্যন্ত আমাদের সমাজ কোনোভাবেই এগুবে না। এসব ধারণা থেকে বের হতে হবে। তা নাহলে আমাদের সমাজের উন্নয়ন, বিপ্লব বা এগিয়ে যাওয়ার যে ব্যাপার; সেটা হবে না।

নারীর মূল্যায়ন কিংবা অধিকার অনুযায়ী যতটুকু হওয়া উচিত ততটা হচ্ছে না। এটা অনেক দুঃখজনক। এই একুশ সালে এসেও তার কোনো পরিবর্তন আসেনি। একটা ছেলে বা পুরুষের মতামত বা পরামর্শকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, নারীদেরকে সেটা দেওয়া হয় না। পুরুষদের থেকে নারীর পরামর্শটা ভালো হলেও সেটাকে গ্রহণ করে না সমাজ। এতে মনে হয় তাদের ইগুতে লাগে খুব। একটা প্রবণতা এখনো সবার মধ্যেই রয়ে গিয়েছে যে, নারীরা হয়তো তেমন একটা বুঝে না, কাজ পারে না, তাদের দ্বারা এটা সম্ভব হবে না। এই প্র্যাক্টিস বা চিন্তা-ভাবনাটা এখনো প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে রয়েছে। যতদিন না এই চিন্তা-ভাবনা থেকে মানুষ বের হতে না পারবে ততদিন মনে হয় না যে কিছু হবে। নারীদেরকে সবসময়ই আন্ডারএস্টিমেট করা হয়। যদিও এখন সেটা একটু একটু করে বদলাচ্ছে।

আমাদের নাটকের ইন্ডাস্ট্রিতেও তেমন একটা নারীপ্রধান কাজ হয় না। হলেও সেটা হয়তো বা দশভাগ, বাকী নব্বইভাগই থাকে পুরুষকেন্দ্রিক। এখানে দর্শকেরও অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। আমি যদি ইন্ডাস্ট্রির কথা বলি তাহলে বলবো, দর্শকের উপরই কিন্তু সবকিছু। দর্শকরা যদি নারীকেন্দ্রিক কাজগুলো দেখে, গুরুত্ব দেয় বা সেটা বোঝার ক্ষমতা রাখে তাহলে হয়তো বাধ্যতামূলক এই পরিবর্তনটা আসবে ইন্ডাস্ট্রিতে। তখন প্রযোজক, পরিচালক, নাট্যকাররা নারীকেন্দ্রিক কাজগুলো নিয়ে বেশি ভাববে, সাহস পাবে এই ধরণের কাজগুলো করার।

আমি ইউটিউবের কিছু কমেন্ট দেখেছি যে, নারীকেন্দ্রিক কাজ দেখবো না। এখন দর্শকদেরকে এইসব চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাতে ধরে তো কারো চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষেও আমরা কাজ করছি।

সাইবার বুলিং, অনলাইন হ্যারেসমেন্ট তো এখন প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এতে করে মেয়েদের উপর দিয়ে যে কী যায়, সেটা তো তারা ধারণা করতে পারছে না। নিজের সাথে না ঘটা পর্যন্ত কেউই তৎপর হয় না। এসব বন্ধ হয় না। একজন পুরুষের পোস্ট বা ছবির নিচে যতটা কম মন্তব্য আসে তার চেয়ে ততোটাই বেশি অশালীন ও কুৎসিত মন্তব্য আসে কোনো মেয়ের পোস্টে বা তাদের ছবির নিচে। তাদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন হচ্ছে না। এখন বাসায় বাসায় গিয়ে তো আর সবার মন-মানসিকতা পরিবর্তন করা সম্ভব না। নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রতিবন্ধকতা

সবকিছুর মূলে আসলে একটাই কারণ, যতদিন না মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হবে, ততদিন পর্যন্ত মেয়েরা প্রতিবন্ধকতা থেকে রক্ষা পাবে না। এর জন্য পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তনটা খুব বেশি জরুরি। আমি মনে করি নারী-পুরুষ উভয়ই সমান কিন্তু বঞ্চিত হয় নারীরা। এই যে এত এত নাটক হচ্ছে সচেতনতা নিয়ে, স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে এত এত শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে; সেগুলো থেকে শিখলেই হবে না, কাজে-কর্মে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তখনই নারীরা তাদের প্রাপ্য সম্মানটা পাবে, কোথাও প্রতিবন্ধতার শিকার হবে না।

বন্ধুত্ব

একজন ভালো পুরুষ বন্ধু কখনোই নারীর জন্য বিপদজনক না। আমি ‘কনকচাপা’ নামে একটা নাটক করেছি। সেখানে একটা কথা-ই ছিলো এরকম যে, পুরুষরাই নারীর পাশে থাকে আর কাপুরুষরা ধর্ষণ করে। কাপুরুষরা তো মানুষের পর্যায়েই পরে না।

স্ট্রাগল ও হ্যারেসমেন্ট

আমার এই দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ারে আমি কোনো বাজেরকম পরিস্থিতির শিকার হইনি, আলহামদুলিল্লাহ। অনেক স্ট্রাগল করেছি, পরিশ্রম করেছি, এখনো করছি। এখনো যে অনেক কিছু হয়ে গিয়েছি তা নয়, এখনো দেখছি, শিখছি। সত্যি বলতে কোনো পুরুষ কতৃক হ্যারেসমেন্টের শিকার হইনি। ১১ বছরের ক্যারিয়ারে আমি আমার আশে পাশে অনেক ভালো ভালো মানুষ পেয়েছি। সবার অনেক অনেক সাপোর্ট পেয়েছি। কিন্তু আমি অনলাইন হ্যারেসমেন্টের শিকার হয়েছি বহুবার। মিডিয়ার অভিনেত্রীদের নিয়েই মানুষদের আগ্রহটা বেশি থাকে এসব ক্ষেত্রে। যাদের আসলে কোনো পরিচয় নেই, তারাই এমনটা করে। এছাড়াও দেখা যায় যে, আমাদের মিডিয়ার অনেকেই অনেকের নামে নানান কথা বলে ফেলে, কিছু হলেই স্ট্যাটাস দিয়ে ফেলে কোনো যাচাই-বাছাই না করে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক স্ট্রং একটা মেয়ে। অনেক কিছু দেখেও চুপ করে থাকি, অনেক সময় কথা বলি। কিন্তু অনেক মেয়ে আছে যারা এসব হ্যারেসমেন্টের শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, এরপর কোন একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কারণ, যার সাথে ঘটে একমাত্র সেই বুঝে যে তার ভিতরের অবস্থাটা। একটাই কথা বলবো, সোশ্যাল মিডিয়াটাকে আসলে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা উচিত।

বাংলাদেশ জার্নাল/আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত