ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬ অাপডেট : ১০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৯, ১০:০৫

প্রিন্ট

‘ফ্ল্যাটের সবাইকে ধর্ষণ করে উচিত শিক্ষা দাও’

‘ফ্ল্যাটের সবাইকে ধর্ষণ করে উচিত শিক্ষা দাও’
অনলাইন ডেস্ক

‘ফ্ল্যাটের সবাইকে ধর্ষণ কর। তাতে ওদের একটা উচিত শিক্ষা হবে।’এটা ছিলো ফেসবুক গ্রুপের একটা ম্যাসেজ যা দেখে ফেলেছিলো অ্যানা (ছদ্মনাম)। এরপর ঘটে গেলো এতগুলো ঘটনা। আর ম্যাসেজটি যদি হঠাৎ করে অ্যানার নজরে না পরতো তাহলে হয়তো কিছুই হতো না। কিংবা নিয়মিত একটার পর একটা মেয়ে ধর্ষিতা হতো। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারতো না এর পিছনে কাদের হাত রয়েছে।

কেননা এই বিশ্রী বার্তাগুলো যারা লিখেছিলো তারা তো সবাই অ্যানার বন্ধু ছিলো। যাদের সে ভালোবাসতো, বিশ্বাস করতো এবং রোজ তাদের সঙ্গে বসেই আড্ডা মরতো। কিন্তু সে বুঝতেই পারেনি তার ছেলেবন্ধুরা ভিতরে ভিতরে কতটা ভয়ঙ্কর আর হিংস্র! সবচেয়ে বড় কথা এই ছেলেগুলো তাদের মেয়েবন্ধুদের ভীষণ খারাপ নজরে দেখতো। শুধু তাই নয়, তারা তো অ্যানা ও তার মেয়ে বন্ধুদের নৃশংসভাবে রেপ করারও পরিকল্পনা আঁটছিলো। নিজেদের মনোবাসনাগুলোই তারা ওই ফেসবুক গ্রুপে লিখে যাচ্ছিলো সমানে। হঠাৎ করেই একদিন তা নজরে আসে অ্যানার।

ম্যাসেজগুলো যেভাবে অ্যানার নজরে এলো

গত বছরের প্রথম দিকের ঘটনা। তখন অ্যানার বয়স ১৯ বছর, যে বয়সে মেয়েরা ছেলেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তখন তার ক্লাস ছিলো। সে বসেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট রুমের সোফায়। এ সময় তার পাশের ছেলেবন্ধুর ল্যাপটপে হঠাৎ করেই একের পর এক মেসেজ আসা শুরু হলো।

অ্যানা তার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, -ঘটনা কী রে?

বন্ধুটি বলল, ‘তোমার কাছে খারাপ মনে হতে পারে। তবে আমাদের ছেলেদের এই গ্রুপে আমরা মজা করে অনেক কথাই বলি। তুমি চাইলে দেখতে পার।’

অ্যানা কৌতূহলী হয়ে মেসেজগুলো পড়তে শুরু করলো, যেগুলো গ্রুপ লেখা হচ্ছিলো গত দেড় বছর ধরে। সেগুলো পড়তে পড়তে অ্যানার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। কেননা এগুলো নিছকই মজা করে লেখা মেসেজ না। এখানে তো রীতিমত ধর্ষণের হুমকিও ছিলো। ওই ফেসবুক চ্যাট গ্রুপে অ্যানার বন্ধুরা নিজেদের নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ও সিরিয়াল রেপিস্টদের নামে নিজেদের নাম রেখেছে।

‘ওরা আমাদের এক সহপাঠীকে নিয়ে কথা বলছিল। ওরা লিখছিল কীভাবে ওকে ওরা অপহরণ করবে, তারপর শেকল দিয়ে বিছানায় বেঁধে রাখবে, ওকে বিছানায় প্রস্রাব করিয়ে তার ওপর ঘুমাতে বাধ্য করবে।’

ওই গ্রুপে লেখা বেশিরভাগ মেসেজ ছিল এর চেয়েও ভয়াবহ।

অ্যানা বললেন, ‘এটা কোনো উটকো মন্তব্য নয়। একটা পুরো অনলাইন কমিউনিটি এ ধরনের কথা বলছে। তারা খুবই আনন্দের সাথে এ ধরনের ভয়াবহ কথা বলছে। এটা নিয়ে তারা বেশ গর্বিতও!’

অ্যানা ওই চ্যাট গ্রুপে নিজের নাম সার্চ দিয়ে দেখলেন শত শতবার তাকে নিয়ে নানা কথা বলা হয়েছে। কীভাবে তাকে ধর্ষণ করা হবে এরও বর্ণনা রয়েছে সেখানে।

অ্যানার বন্ধুটি বললো, ‘আরে এগুলো তো মজা করে বলেছে, সিরিয়াস কিছু না। ছেলেরা এভাবেই কথা বলে। এগুলো নিছকই রসিকতা।’

কিন্তু অ্যানা তা মানতে পারছিলো না। সে সমানে স্ক্রল করে চলেছিলেন। আর নিজের ফোনে ওদের এসব চ্যাটের ছবি তুলে রাখছিলেন।

অ্যানা বলেন, 'আমি আমার বন্ধুকে বলেছিলাম যে এটা আমার মনের শান্তির জন্য করছি। কিন্তু আমার চেহারা দেখে আমার বন্ধুটি আঁচ করতে পেরেছিল যে ঘটনাটি আমি স্রেফ মজা হিসেবে নেইনি।'

মেসেজগুলো দ্রুত স্ক্রল করতে করতে অ্যানা যখন গণধর্ষণ, যৌনাঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে ডজন ডজন মেসেজ দেখেন, ভয়ে সে আঁতকে ওঠে।

সে বলে, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত। কারণ যারা এমনসব ভয়াবহ কথা বলছে তারা সবাই আমার বন্ধু, আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।’

এর কয়েকদিন পরেই ইস্টারের ছুটি কাটাতে বাড়িতে যায়। কিন্তু ক্যাম্পাসে ফেরার পর আবার এইসব ছেলেদের সাথে তার দেখা হবে ভাবতেই তার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল।

‘আমি ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য আমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম। কিন্তু ওখানে ফিরে যেতে আমার আর একটুও ইচ্ছা করছিল না।’

সেদিনই অ্যানা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়েরের সিদ্ধান্ত নেন।

অভিযোগ দায়ের

অ্যানা ও তার আরেক মেয়ে সহপাঠী মিলে কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ জানালেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানালেন যে তাদের দুইজনকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞসাবাদ করা হবে।কিন্তু যে লোকটি তাদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিল সে ছিল ইউনিভার্সিটির প্রেস ডিরেক্টর।

অ্যানা বললেন, ‘আমার কাছে বিষয়টি খুবই আজব মনে হয়েছে। তদন্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এ কোন লোককে বেছে নিল!’

প্রেস প্রধান হিসেবে পিটার ডানের দায়িত্ব ছিল ব্রিটেনের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি হিসেবে স্বীকৃত ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখা, এজন্য মিডিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা। আর তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তার দায়িত্ব হল, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা।

শিক্ষার্থীদের পত্রিকা, 'দ্য বোয়ার'-এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে বিষয়টি জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে যে, ডানের এই দুই দায়িত্বপালন কিছুটা সাংঘর্ষিক। তবে তারা দাবি করে যে, ওই সময়ে ডান তার প্রেস বিষয়ক দায়িত্বের কিছুটা অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ওই দুই মেয়ের সাথে কথা বলার এক মাস পর চ্যাটকারী ওই পাঁচ ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দু'জন দশ বছর, দু'জন এক বছর এবং একজন আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হয়।

অ্যানা এবং তার বন্ধু জানায়, তারা জানত না দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তারা গণমাধ্যমে এ খবর জানতে পারে। তবে তারা জানে না কোন ব্যক্তিকে কোন সাজা দেয়া হয়েছে। তবে ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। দশ বছরের জন্য যাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তারা এ শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করে।

টুইটারে নিন্দার ঝড়

চার মাস পর দশ বছরের জন্য বহিষ্কৃতদের সাজা কমিয়ে মাত্র এক বছর করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অ্যানা বলেন, ‘আমাদেরকে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো কারণ জানানো হয়নি। আমাদেরকে বলা হয়েছে যে নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, কিন্তু আমরা জানি না সেই নতুন তথ্য-প্রমাণগুলো কী। আমার মনে হচ্ছিল আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হবে। আমরা যে দুইজন অভিযোগ করেছি, আমরা দুইজন যেন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি, যারা কখনোই আমাদের কথা শুনবে না।’

অ্যানা এবং তার বন্ধু শেষ চেষ্টা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তির কথা জানান।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর স্টুয়ার্ট ক্রফট তাদের জানান যে তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা অবহেলার প্রমাণ তারা পাননি। তিনি তদন্তের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

তিন সপ্তাহ পরে, এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট এক মেয়ে শিক্ষার্থী বিষয়টি টুইটারে তোলেন, খুব দ্রুতই #শেমঅনইউওয়ারউইক ট্রেন্ডিং হতে শুরু করে।

ফলে ঘটনাটি আবারো জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তদন্ত প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছ থেকে বিভিন্ন বিভাগ নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়া শুরু করে।

কিছুদিন পরেই এক হাজার শব্দের এক বিবৃতিতে প্রফেসর ক্রফট জানান যে, ওই চ্যাটগুলি পড়ে তার মনোভাবের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে।

তবে শিক্ষার্থীরা তার এই প্রতিক্রিয়াকে ভালোভাবে নেয়নি। তাদের কাছে এ বক্তব্য খুবই দায়সারা মনে হয়েছে।

এর তিনদিন পরে তিনি ঘোষণা দেন, যাদের শাস্তি কমানো হয়েছিল তারা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরবে না। তবে এটা কী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, না-কি শাস্তিপ্রাপ্তদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, এ বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেননি।

যার ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। দুদিন পরেই, শত শত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিছিল করে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যালয় অভিমূখে মিছিল করে। প্রতিবাদের দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, ঘটনার শিকাররা যে মর্মপীড়ায় ভুগেছে, তার জন্য তারা ‘গভীরভাবে দুঃখিত’।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনামূলক কোন ব্যক্তিগত বার্তা পায়নি।

ওয়ারউইক-এর এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে অনলাইনে যৌন সহিংসতা এবং এ ধরনের সমস্যাগুলো রোধে কাজ করে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও আপিল প্রক্রিয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু করেছে, যা ২০১৯ এর সামারে শেষ হবে।

কিন্তু যেসব মেয়ে এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, তারা অবশ্য মনে করেন না যে এর এর সুষ্ঠু সমাধান আদৌ হয়েছে। অ্যানা এখন থার্ড ইয়ারে পড়ছেন। আর কিছুদিন পরে তার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হবে। সে এখন কেবল দিন গুণছে। কবে তার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকবে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে এবং এখান থেকে সে চলে আসতে পারলে বেঁচে যায়।

অ্যানার ভাষায়, ‘আমি আমার গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে যেতে চাই না। আমি এখন শুধু দিন গুণছি কখন এই দিনগুলো শেষ হবে আর এমন দিন আসবে যখন আমার আর কখনো ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে না।’

মোবাইলে ফেসবুক চ্যাটের ক্রিনশট নিতে থাকে অ্যানা

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close