ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ১০ মিনিট আগে
শিরোনাম

যুক্তরাজ্যে শরণার্থীদের জন্য কানাডার মডেলে নতুন স্পনসরশিপ ভিসা চালুর ঘোষণা

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ১১:২৬

যুক্তরাজ্যে শরণার্থীদের জন্য কানাডার মডেলে নতুন স্পনসরশিপ ভিসা চালুর ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ দিতে নতুন একটি ‘নিরাপদ ও বৈধ’ পথ চালুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিবিসি জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শরণার্থীদের স্পনসর করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসতে পারবে।

শুক্রবার রাতে ঘোষিত এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আবেদন গ্রহণ শুরু হবে।

এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম দফায় শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর কথা ২০২৭ সালে।

আগামী বছর থেকে নিয়োগদাতাদের মাধ্যমে শরণার্থীদের জন্য পৃথক কর্মসংস্থানভিত্তিক একটি ভিসা চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কানাডার দীর্ঘদিনের কমিউনিটি স্পনসরশিপ মডেলের আদলে নতুন এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, নতুন ব্যবস্থা প্রকৃত শরণার্থীদের সুরক্ষা দেবে, সেই সঙ্গে আশ্রয়ব্যবস্থার যেসব ফাঁকফোকরের অপব্যবহার করা হত, সেগুলোও বন্ধ হবে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ

তার ভাষায়, "যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য ব্রিটেন সবসময় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। তবে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণের বিশ্বাস থাকতে হবে যে এটি ন্যায্য, নিয়ন্ত্রিত এবং অপব্যবহারের সুযোগমুক্ত।"

কানাডার মডেলে নতুন ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া কমিউনিটি স্পনসরশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ শরণার্থী পুনর্বাসিত হয়েছেন।

ব্রিটিশ সরকারের দাবি, কানাডায় স্পনসর হওয়া শরণার্থীদের ৭০ শতাংশ এক বছরের মধ্যে চাকরি পান, যা সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আসা শরণার্থীদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যেও ইউকে রিসেটেলমেন্ট স্কিম (ইউকেআরএস) নামে সীমিত পরিসরে কমিউনিটি স্পনসরশিপ রয়েছে। তবে ওই স্কিমের আওতায় পুনর্বাসিত অধিকাংশ শরণার্থীর দায়িত্ব স্থানীয় কাউন্সিলগুলো পালন করে।

নতুন ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়, গির্জাসহ বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন ও অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান শরণার্থীদের বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং সমাজে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।

কে কে এই সুবিধা পাবেন, তা নির্ধারণে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাজ্য সরকার। যুক্তরাজ্যে আসার আগে আবেদনকারীদের পরিচয় যাচাই করা হবে কঠোরভাবে।

নতুন ব্যবস্থায় মোট কতজন শরণার্থীকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, তা এখনো জানায়নি দেশটির সরকার। তবে শুরুতে এ সংখ্যা সীমিত থাকবে এবং পুরো কর্মসূচি চালু হলে তা এখনকার ইউকে রিসেটেলমেন্ট স্কিমের তুলনায় বড় পরিসরে পরিচালিত হবে।

আশ্রয় আইনেও আসছে পরিবর্তন

নতুন স্পনসরশিপ কর্মসূচির পাশাপাশি আশ্রয় আবেদনে মানবাধিকার আইন এবং আধুনিক দাসত্ববিরোধী আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তাতেও পরিবর্তন আনতে চায় ব্রিটিশ সরকার।

সরকারের ভাষ্য, ভিত্তিহীন বা প্রতারণামূলক আশ্রয় আবেদন কমাতে এসব পরিবর্তন প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। সরকার মনে করে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এই সনদের সদস্য থাকা যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে আশ্রয়সংক্রান্ত পারিবারিক অধিকারের ক্ষেত্রে ‘পরিবার’ শব্দের সংজ্ঞা সংকুচিত করে শুধু নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া আধুনিক দাসত্ব আইনের অধীনে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হবে। কোনো বিদেশি নাগরিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে বা জাল নথি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তিনি এই সুরক্ষার আওতায় থাকবেন না।

রাজনৈতিক বিতর্ক

নতুন কর্মসূচি নিয়ে ব্রিটেনের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিল্পের ধারণা, বৈধ কর্মসূচিতে সুযোগ না পাওয়া অনেকেই নৌকায় চেপে সাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করবেন। তাই সরকারের এই পরিকল্পনা অবৈধ অভিবাসন কমাতে কার্যকর হবে না।

রিফর্ম ইউকের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেন, এই কর্মসূচি লেবার পার্টির নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল না। ফলে এর জন্য সরকারের কোনো জনসমর্থনের ম্যান্ডেট নেই। রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে এই কর্মসূচি বাতিল করবে।

অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ম্যাক্স উইলকিনসন একে ‘সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও নৌকায় চেপে অভিবাসন ঠেকাতে আরও উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন।

কমিউনিটি স্পনসরশিপ অ্যালায়েন্স সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগণ ও কমিউনিটিগুলো যেন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা কাকে স্পনসর করবে।

সংগঠনটির উপসভাপতি লিওনি আনসেমস ডে ভ্রিস বলেন, যোগ্যতার শর্ত অতিরিক্ত কঠোর করলে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সরকারের ভেতরেও মতবিরোধ

নতুন স্পন্সরশিপ ভিসা কর্মসূচির এই ঘোষণা এমন সময় এল, যখন অভিবাসন নীতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ও তার জুনিয়র মন্ত্রী মাইক ট্যাপের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

মাইক ট্যাপ একটি পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে যুক্তি দেন, নতুন অভিবাসন বিলে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিদেশি কেয়ার ওয়ার্কারদের ভিসা পরিবর্তনের প্রস্তাব থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত।

শাবানা মাহমুদ এ ঘটনায় ট্যাপকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের অনুরোধ জানালেও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সেই অনুরোধে সাড়া দেননি।

অভিবাসন আইন সংস্কারের অংশ হিসেবে এর আগে চলতি বছর ডেনমার্কের মডেল অনুসরণ করে শরণার্থীদের শুধু অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া এবং স্থায়ী আবাসনের জন্য অপেক্ষার সময় দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

সেই সিদ্ধান্তে লেবার পার্টির একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাদের দাবি ছিল, নৌকায় করে ঝুঁকি নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ জার্নাল/জে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত