ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩:৪৫

প্রিন্ট

হিন্দু সহকর্মীর শেষকৃত্য সারলেন মুসলিম শিক্ষক!

হিন্দু সহকর্মীর শেষকৃত্য সারলেন মুসলিম শিক্ষক!
জার্নাল ডেস্ক

ধর্মীয় মেরুকরণের ইস্যু তুলে গোটা দেশ যখন উত্তাল, ঠিক সে সময় হিন্দু এক সহকর্মীর শেষকৃত্য সেরে মুসলিম এক শিক্ষক বুঝিয়ে দিলেন সম্পর্কের কোনও ধর্ম হয় না।

জলপাইগুড়ির ওই শিক্ষকের নাম আসফাক আহমেদ। ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকা তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হিন্দু এক সহকর্মীর শেষকৃত্য সেরেছেন আসফাক আহমেদ। হিন্দু রীতি মেনে মাথা ন্যাড়াও করেছেন তিনি। এমনকি সপরিবারে ১১দিন ধরে অশৌচও পালন করেছেন তিনি।

নভেম্বরের শেষে মারা যান বানারহাট হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক সঞ্জনকুমার বিশ্বাস। তার এই চলে যাওয়া পরিবারের বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে আসফাককে। সঞ্জনবাবুকে বন্ধু হিসাবে যেমন ভালবাসতেন আসফাক তেমনই পথ প্রদর্শক, বাবার মতো এবং গুরু হিসাবে শ্রদ্ধাও করতেন।

তাইতো তার চলে যাওয়ায় ভেঙে পড়েন আসফাক। শুধুমাত্র প্রণাম করে, ছবিতে ফুলের মালা পরিয়েই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেননি তিনি। বরং পরম প্রিয় মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাতে অন্য পথ বেছে নেন মুসলিম এই শিক্ষক।

হিন্দু রীতি মেনে মাথা মুড়িয়ে তার শেষকৃত্য সারেন। স্ত্রী এবং নয় বছরের ছেলেকে নিয়ে পালন করেন ১১ দিনের অশৌচ। এমনকি পুরোহিত ডেকে রবিবার জলঢাকা নদীর ধারে ক্রিয়াকর্মও সম্পন্ন করেন তিনি। মুর্শিদাবাদের বাড়িতে থাকা তার বাবা-মা আশফাকের এই কাজে কোনও ভাবেই বাধা দেননি।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ক্ষত তখনও দগদগে। সেই রকম একটা সময়ে মুর্শিদাবাদের কান্দি থেকে বানারহাট হাইস্কুলে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন আসফাক। সেটা ১৯৯৯ সাল। যে শিক্ষাপ্রাঙ্গন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলে, সেখানেই চরম হেনস্থার শিকার হতে হয় তাকে।

ইসলাম ধর্মের কাউকে নিজেদের সঙ্গে জুড়ে নিতে চাননি বাকি শিক্ষকরা। ব্যতিক্রম শুধু কর্মশিক্ষার শিক্ষক সঞ্জনকুমার বিশ্বাস। নানা গঞ্জনার মধ্যে তরুণ আসফাককে পুত্রস্নেহে বুকে টেনে নেন তিনি। যত দিন না মাথা গোঁজার জায়গা মিলছে, নিজের বাড়িতে তাকে থাকার আমন্ত্রণও জানান।

ধর্মের চেয়ে মনুষত্ব্যই যে বড় কথা, সে কথা আসফাককে বোঝান তিনি। আর সেখানেই সূত্রপাত। তিন কন্যার পিতা সঞ্জনবাবুর ছেলে ছিল না। তাই আসফাক অন্তঃপ্রাণ হয়ে ওঠেন তিনি। এর মধ্যেই নিজের থাকার বন্দোবস্ত করে নেন আসফাক। সঞ্জনের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকা শুরু করেন।

বাড়ি ছেড়ে অন্যত্রে চলে গেলেও তাদের বন্ধুত্বে কোনও প্রভাব পড়েনি। এমনকি ২০০৫ সালে সঞ্জনবাবু অবসর নেওয়ার পরেও সেই সম্পর্ক বহাল তবিয়তে ছিল।

আসফাক জানান, যে বছর চাকরিতে ঢুকি, সে বছর স্কুলের সুবর্ণজয়ন্তী বছর ছিল। ভিন্নধর্মী হওয়ায় অনেকেই আমার নিয়োগে আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু সঞ্জনবাবু ও তার পরিবার বরাবর আমার পাশে থেকেছেন। কু’কথা কানে তুলতে নিষেধ করেছিলেন উনি। নিজের বাড়িতে জায়গাও করে দিয়েছিলেন।

তিনি আরো বলেন, ওনার শেষকৃত্য সারা নিজের দায়িত্ব বলে মনে হয়েছিল, তাই করেছি। তবে নিছক দায়বদ্ধ ছিলাম বলে নয়, এই সম্মানটুকু ওনার প্রাপ্য ছিল।

প্রাক্তন সহকর্মীর প্রতি আসফাকের এমন ভক্তি-শ্রদ্ধায় আশ্চর্য হননি স্কুলের অন্য সহকর্মীরাও। বিজ্ঞানের শিক্ষক মুকুল বর্মণ বলেন, সঞ্জনবাবু মানুষটাই অমন ছিলেন। অনেককে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি। তবে ওনার আদর্শ আসফাককেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close
close