ঢাকা, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ১৬ মিনিট আগে
শিরোনাম

ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট ‘বিক্রম-১’ সফল উৎক্ষেপণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৭:২০  
আপডেট :
 ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৭:২৫

ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট ‘বিক্রম-১’ সফল উৎক্ষেপণ
শনিবার দুপুরে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’ এর রকেট ‘বিক্রম-১’ এর সফল উৎক্ষেপণ হয়। ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক মহাকাশ বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল ভারত।

দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোনো বেসরকারি কোম্পানির রকেট সফল উৎক্ষেপণের পর কক্ষপথে (অরবিট) পৌঁছাতে সক্ষম হল।

রয়টার্স জানিয়েছে, মহাকাশ প্রযুক্তির কোম্পানি ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’ এর রকেট ‘বিক্রম-১’ শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশের পথে ছুটে যায়।

‘মিশন আগমন’ নামের এই প্রথম অরবিটাল মিশনে উৎক্ষেপণের প্রায় ১৬ মিনিটের মাথায় রকেটটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৫০ কিলোমিটার ওপরে লো-আর্থ অরবিট দেশি-বিদেশি ছয়টি পেলোড সফলভাবে স্থাপন করে।

এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর বেসরকারি উদ্যোগে কক্ষপথে রকেট পাঠানোর সক্ষমতা অর্জনকারী তৃতীয় দেশে পরিণত হল ভারত।

এনডিটিভি জানিয়েছে, নেভিগেশন সংক্রান্ত সতর্কতার কারণে রকেটটির উৎক্ষেপণ পূর্বনির্ধারিত সময়ের (সকাল সাড়ে ১১টা) চেয়ে ৩৫ মিনিট পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সফল উৎক্ষেপণের পর স্কাইরুট এক বিবৃতিতে বলে, "মিশন আগমন দারুণ সফল হয়েছে। এটি একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন। নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ শুরু করার আগে এ ধরনের আরও কয়েকটি পরীক্ষা চালানো হবে।"

স্কাইরুটের ভাষ্য, এই পরীক্ষামূলক মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রকেটটির প্রপালশন, অ্যাভিওনিকস, টেলিমেট্রি, গাইডেন্স, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।

হায়দরাবাদভিত্তিক কোম্পানি স্কাইরুট প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। ২০২০ সালে ভারত সরকার মহাকাশ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করার পর দ্রুত বিকশিত হয় এ কোম্পানি। চলতি বছর এ কোম্পানির বাজার মূল্য পৌঁছেছে এক বিলিয়ন ডলারে।

কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও পবন কুমার চন্দনা বিবিসিকে বলেন, তারা তাদের দক্ষতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, যাতে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর কাজটি ট্যাক্সি সেবার মতই সহজ হয়ে যায়।

বর্তমানে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য অপারেটরদের বড় রকেটের শিডিউলের অপেক্ষায় মাসের পর মাস বসে থাকতে হয়। কিন্তু স্কাইরুটের এই সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট স্যাটেলাইটগুলো নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করতে পারবেন।

পবন কুমার বলেন, "আপনি বন্ধুর বাড়ি যেতে চাইলে যেমন ট্রেনের অপেক্ষায় না থেকে একটি উবার ডাকেন, আমরা ঠিক তেমনি মহাকাশে একটি ক্যাব সার্ভিস দিচ্ছি।"

স্কাইরুটের রকেট ‘বিক্রম-১’ এর নামকরণ হয়েছে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক বিক্রম সারাভাইয়ের নামানুসারে। প্রায় ২২ মিটার (৭২ ফুট) উঁচু বা সাততলা ভবনের সমান এই রকেটের পেলোড ধারণক্ষমতা ৩৫০ কেজি।

সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামোয় তৈরি এই রকেটে ব্যবহৃত হয়েছে থ্রিডি-প্রিন্টেড লিকুইড ইঞ্জিন, যা ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রকেটটি প্রচলিত রকেট-গ্রেড ইস্পাতের চেয়ে অনেক হালকা এবং মজবুত, যা এর কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

বিবিসি জানিয়েছে, এই মিশনে রকেটটি মহাকাশের বর্জ্য অপসারণের জন্য রোবোটিক আর্ম বা যান্ত্রিক হাত, পৃথিবী পর্যবেক্ষণের ক্যামেরা এবং জার্মানির একটি স্যাটেলাইটসহ মোট ছয়টি প্রযুক্তিগত পেলোড বহন করেছে।

এর পাশাপাশি ছিল চমকপ্রদ কিছু প্রতীকী পেলোড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ল্যাবরেটরিতে তৈরি হীরার একটি পদ্মফুল, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'কসমিক ব্লুম'।

এছাড়া একটি ক্ষুদ্র সোনার রকেটের ভেতর ভারতের প্রখ্যাত তিন বিজ্ঞানী— চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন, এ পি জে আব্দুল কালাম এবং বিক্রম সারাভাইয়ের চালের দানার চেয়েও ছোট আকারের ভাস্কর্য মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। রকেটটিতে ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'বন্দে মাতরম' লেখা একটি বার্তাও।

এর আগে ২০২২ সালে 'বিক্রম-এস' নামের একটি সাব-অরবিটাল রকেটের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল স্কাইরুট।

কয়েক দশক ধরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) এককভাবে মহাকাশ খাতে কার্যক্রম চালালেও ২০২০ সালে সরকার খাতটিকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এর পর থেকে দেশটিতে ৪০০টির বেশি স্পেস স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে।

সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারতের অংশীদারত্ব বর্তমানের ৮ বিলিয়ন ডলার বা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।

স্কাইরুটের এই অভাবনীয় সাফল্যে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি একে ‘ভারতের মহাকাশ আকাঙ্ক্ষার নতুন দিগন্তের উন্মোচন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

স্কাইরুট জানিয়েছে, আগামী বছর থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরুর আগে এ বছর তারা আরও একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালাবে।

কোম্পানির হায়দরাবাদের কারখানায় প্রতি মাসে একটি করে রকেট তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির সিইও।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত