ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:০০

প্রিন্ট

ছোটগল্প: মোবাইল লাভ (ভ্রাম্যমাণ ভালোবাসা)

ছোটগল্প: মোবাইল লাভ (ভ্রাম্যমাণ ভালোবাসা)
রাজীব কুমার দাস

উর্বশী কেঁদে কেঁদে হোস্টেলে যেদিন মাখনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ এনেছে; আমরা হোস্টেলের কেউ তেমন কিছু মনে করিনি। সবাই ধরে নিয়েছি; ওদের ভালোবাসার রসায়ন বেশ পুরোনো জম্পেশ। তাছাড়া টুকটাক, মান, অভিমান, ঝগড়া লেগেই আছে। রাজনীতির আদর্শিক ভাবধারায় তারা দু’মেরুর হলেও বেশ মানিয়ে চলে।

উর্বশী’র বাম রাজনীতির আড়ালে মাখন মিশ্র অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে প্রাইভেট পড়ানো ছাত্রী, সিনিয়র, জুনিয়র পড়ুয়া এমন কী বেশ সুনামের কর্পোরেট অফিসের স্মার্ট সুন্দরীর মনের বাগানে ফোটা কাঠগোলাপ, গন্ধরাজ, জুঁই, চামেলি, কামিনী, শিউলি, কাঁঠালচাঁপা চুরি করেছে। যেই মাত্র ধরা খেয়েছে; আমার কাছে নালিশ দিয়ে সালিশে হাজির হয়ে সবাই একই কথা বলেছে-

ও চোর মন চোর, চুরি করেছে আমার মন।

ও চোর, ঘুম চোর, চুরি করেছে আমার ঘুম।

ও চোর, সুখ চোর, চুরি করেছে সব সুখ।

ভাগ্যিস! হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেলো। কেউ শিল্পী প্রীতমের গানে ‘ফুলে ফুলে মধু পান করে অবশেষে মন ভাঙার নালিশ করেননি’।

ওর আসল নাম নির্ঝর। মাখনে পেটুক বলে, আদরে সবাই মাখন বলে। হোস্টেলে প্রথমদিন নির্ঝরের মামা আমার হাতে দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে বলেন, ‘মাখনের বাবা নেই; আমাদের বাড়িতে বড় হয়েছে। ডাক্তার হয়ে দেশসেবা করবে; আপনি ছাত্রনেতা। প্লিজ একটু দেখবেন।

অনুরোধ রাখতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। সবার কথা, ‘আবাল ভোদাই জুনিয়র যেখানে লাইন ধরে ফরমায়েশ খাটবে; সেখানে কী করে মাখন, ফাখন আমাদের রুমমেট হয়ে নাক ডেকে ঘুমোবে’।

রতনের হাক্কা হুয়ার সাথে সাথে স্বপন, সৌরভ, কায়েস, ইমরুল কেয়া হুয়া! কেয়া হুয়া! সমস্বর প্রতিবাদে আমার মনটা ভেঙে গেলো। মাখন আমার মনের অবস্থা বুঝে যে মাত্র চলে যাবে।

কায়েসের প্রশ্ন- তুমি মনে কষ্ট পেলে? উত্তর: না।

তুমি মোস্ট জুনিয়র। সবেমাত্র মেডিকেল কলেজে এসেছো! রুমে মানিয়ে চলতে পারবে তো?

উত্তর: দেখুন আমি মামাবাড়ির গরু রেখে, কাপড় ধুয়ে এমনকি সাপের কামড়ে যখন মরিনি; ঠিকই পারবো। মুহূর্ত্যে সবার চোখের কোণায় কুয়াশা বিন্দু জল। কারোর মুখে কথা নেই। যাই হউক, মাখনের একটা গতি হলো। অল্পদিনে মাখন সবার প্রিয়জন হয়ে মশারি, মেসের খাবার, মাঝে মাঝে রান্নাকরা, এককথায় ও আমাদের আপনজন। আমার ছোট ভাই নেই; কখন ছোট ভাইয়ের স্নেহের আসনে বসে আছে, বুঝতে পারিনি।

মাখন সবার স্নেহের আসন নীরবে কেড়ে নিয়েছে; কেউ বুঝতে পারেনি। আমি না হয় ওর জন্যে না খেয়ে বসে থাকি। সৌরভ, কামরুল, কায়েস?

মাখন বেশ মেধাবী। টিউশনি বাজারে বেশ চাহিদা। প্রতিদিন টিউশনি করে ফিরতে রাতের প্রায় এগারোটা ছুঁই ছুঁই। আমরা সবাই ইন্টার্নশিপ করছি।কেউ কেউ প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরির অফার পাচ্ছি। মাখন আমাদের আদর, আস্কারা পেয়ে কখন, কীভাবে ‘লাভবার্ড’ হয়ে সরিষা, সূর্যমুখী, যব, ধান, ভুট্টা হজম করে চলেছে; আমরা কেউ জানি না।

যতদিন যাচ্ছে আমাদের ‘লাভবার্ড মাখন’ জন আব্রাহাম, দেব, জিৎ হয়ে ধানমন্ডি, বসুন্ধরা, গুলশান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জিমে সিক্স প্যাক শরীর, আব্রাহাম স্টাইল হেয়ার কাট, ব্র্যান্ড আইটেম সুগন্ধি, চনমনে দেহ মন; আমাদের আরো আদরে শীত মকমল কম্বলে পোষা ‘বাবু তুমি খাইছ’ টাইপ ভালোবাসায় তুলতুলে ব্রাউন বেড়ালের মতো আদরে মিউ মিউ করে ডাকে। আমরা সবাই হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই।

ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে- প্রিয়া, বিপাশা, রুহি, সাফিনা, নিহা, বর্ষা, পৌষি, আরোহী, জুলি, সাফা, বিজলি, চুমকি, প্রিয়াঙ্কা, মল্লিকা, জুঁই ডাকে আঁতকে জেগে উঠি। আদরের ‘লাভবার্ডের’ সেবা করি। গায়ের কাঁথা কম্বল টেনে দিই।

এদিকে ‘লাভবার্ডের’ শালিসের শুনানি চলছে। আমরা কী দণ্ডে দণ্ডিত করবো? শালিসের একটু দূরে ব্রেক কষে হাজির তিন তরুণী। হাঁপিয়ে দাপিয়ে যেইমাত্র ছুঁই ছুঁই ভাব; সোফিয়া, নাদিয়া, কিরণ, পিয়া বিপাশার সমস্বর চিৎকার- ‘খবরদার ময়লা হাতে আমার বাবুকে ছুঁতে পারবা না কিন্তু।’

শালিস পণ্ড, দণ্ডের তো প্রশ্নই নেই। তেড়ে আসা তরুণী শিলা, বৃষ্টি, মেঘ বেশ কারাতে জানে। শিল্পপতি পরিবারের মেয়ে। নাদিয়া, কিরণ, পিয়া বিপাশা, সোফিয়া আস্তে আস্তে সরে পড়েছে। আমাদের ভোঁদাইটারে সিক্স প্যাক, ফ্যাশন সচেতনে এ কারাতে শিলা, বৃষ্টি, মেঘই দায়ী। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না! এ পর্যন্ত প্রেম দূরে থাক, ‘Anatomy,Netter’s Atlas of human embryology, junqueiara's Basic Histology, clinical anatomy, Happer's illustrated biochemistry, medical physiology, এনেস্থেসিওলজি, কমিউনিটি মেডিসিন পড়ে প্রেমের ধৈর্য, সহ্য, আবেগ, অনুরাগ কোনোটাই নেই।’ প্রথম প্রথম হাতে তেমন টাকা পাইনি। বাড়ি হতে হাত খরচ যা পেতাম তাতে মেসের ঝোলভাত, ডাল পর্যন্ত।অভাবের তাড়না নিয়ে পুরাতন ঢাকায় এক ছাত্রী পড়িয়েছি।

বনেদি পরিবার; ইডেন কলেজের ছাত্রী। নোট, হোম পরীক্ষা খাতা মূল্যায়ন করতে হোস্টেলে নিয়ে আসতাম। খুলেই অবাক বিস্ময়ে ছাত্রীর প্রেমপত্রে- ‘প্রেম পবিত্র শুধু, প্রেম করিলে পাবে মধু, প্রেম করে যে জন, ভালো থাকে তার মন।’ অনেক প্রেমপত্র পড়েও প্রেমপাত্র হতে পারিনি।

বিয়ের অফার, বাড়ি, গাড়ির টোপ। এ রকমের অনেক ছাত্রী-যুবতীর প্রেমযুদ্ধে আমি বার বার হেরে লক্ষণ সেনের মতো পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে প্রেম ইতিহাসের ভীরু, কাপুরুষ হয়ে আমাজন গহীনের দিগম্বর আদিবাসী গোত্রের বিষাক্ত তীর হতে নিজেকে রক্ষা করেছি। এর মাঝে তরুণীদের বেশ আনাগোনা হোস্টেল গেটে বেড়ে গেছে। দারোয়ান দাদুকে সোজা বলে দিয়েছি; কোনো তরুণী-যুবতী, গৃহিণী মাখনের কাছে আসবে না না। আমার শেষ কথা।

আমাদের ‘লাভবার্ড’কে সবাই চোখে চোখে পাহারা দিচ্ছি। কাঁধে ক্যামেরা, হাতে স্পিকার নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া, জুম লেন্স ক্যামেরা হাতে আমাদের হোস্টেল রুমের জানালা, দরজা, বাথরুম, হল রুম, ক্যাফেটেরিয়া, এমনকি মলত্যাগের দৃশ্য ধারণে পাক-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ উত্তেজনা নিয়ে তাক করে আছে। জুম লেন্স ক্যামেরা ইনসুইং, আউটসুইং দিয়ে ক্লিক ক্লিক লাইন লেংন্থ নিশানায় সাংবাদিক ভাইয়েরা বল করে যাচ্ছে। হোস্টেল, রাস্তার দোকানি, গেইট পাহারার দাদু, বাবুর্চি এমনকি মশলা বাটার মরিয়ম, সিঁথি পর্যন্ত আমাদের ছোট ভাইকে ‘সর্বদা রাখিব নিরাপদ, দেখাবো পালানোর পথ। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নিরাপদে রেখেছি।’

এদিকে, ‌‘মায়ের দোয়া’ টিভি চ্যানেল লাইভ করছে নারী সাংবাদিক। পুলিশ, বিমান বালা, নায়িকা, মডেল, স্কুল কলেজের ছাত্রী, ভার্সিটি, সুমতি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাত্রীদের ‘we want love justice’ প্ল্যাকার্ড হাতে খণ্ড খণ্ড মিছিলে আমাদের হোস্টেল চত্বর কানায় কানায় ভরে গেছে। চারিদিকে পরিপূর্ণ মানুষ আর মানুষ। কোনদিকে একটুও ফাঁকা নেই। আমাদের নিরাপদে রাখতে কয়েক প্লাটুন দাঙ্গা দমন পুলিশ ঘিরে রেখেছে। ‘লাভ চ্যানেল’ সাংবাদিক লীলা চৌধুরী কেঁদে কেঁদে লাইভ করে চলেছেন। দেশ বিদেশের সব ডাক্তার আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, আমরা কী বলি, কী করি?

ছাত্রী, নায়িকা, মডেল, নারীবাদী আমাদের মাখনের আমুদে নামে বেশ ডাকছে- ‘ও কারো কাছে বাবু খাইছো।’ নায়িকার বশীরাজ, মডেলের আরবাজ, বিমানবালার প্রেমরাজ, বিধবার স্বপ্নবাজ, নারীবাদের যৌনদস্যু। ওয়ান ওয়ে রাস্তা, প্রচণ্ড জ্যামে পড়ে শিশু, নারী, অসহ্য গরমে কাঁদছে। মিডিয়াগুলো লাইভ করছে। সবার একটি প্রশ্নের জবাব আজ ‘লাভবার্ড মাখন’কে দিতেই হবে। কেনো সবার মন ভেঙে খান খান করে দিয়েছে? সবার মনে প্রতিমুহূর্ত্যে ‘লাভ মোবাইল কোর্ট’ বসিয়ে কী কারণে ভালোবাসা জরিমানা করে মনের অলিগলি ঘুরেছে। লাভ জরিমানা রশিদ কাউকে দেয়নি কেনো?

লাভ মিনিস্টার (love minister) সেফুদা এসে পুলিশ কমিশনার মি: চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে ‘লাভবার্ড’কে বকুল ফুলের মালা পরিয়ে দেন। লাইভ সম্প্রচার চলছে।

এদিকে লাইভে হাজারো প্রেম পিয়াসি যুবতীর হৃদয় ভাঙ্গার গান শুনতে পাচ্ছি। সারাজীবন প্রেম বিরহ কাতর, প্রেম ভিক্ষুক সুকুমার বাউল বৃদ্ধ বয়সের শেষ আহাজারি সঞ্চয় ‘বলবোনা গো, আর কোনদিন ভালোবাসো শুধু মোরে’ গানটি গাইতে রওনা করেছেন। সুকুমার দাদু লাভবার্ড নির্ঝর ওরফে মাখনের কাছে শিখবেন; কী করলে হাজারো নারী প্রেম পিয়াসী হয়, পুরুষদের বিশ্বাস করে, হাসে, কাঁদে।

লাভ মিনিস্টার সেফুদা ‘প্রেম সম্রাট’ দাবিতে অনড় না থেকে নির্ঝরের ‘লাভ কোর্টে’ সারেন্ডার করেছে। শব্দবোমা না মারার শর্তে উনাকে ‘লাভ মিনিস্টার’ হিসেবে পরীক্ষা সাপেক্ষ দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে।

এবার সে কাঙ্ক্ষিত ‘লাভবার্ড’ নির্ঝর ওরফে মাখনের বক্তৃতার পালা ‘প্রিয়জন আমার; আমি সবাইকে ভালোবাসি। আমি প্রতিদিন সংবাদে ভালোবাসা প্রতারণা ধর্ষণের তিনশত পঁয়ষট্টি দিনের একটি হিসেব করে দেখেছি; বছরে এ স্বাধীন দেশে হাজারের উপরে নারী ধর্ষিত হন। (অন্য নির্যাতন বাদে) শ্রীলংকা, সিরিয়া, ইরাক যুদ্ধেও এতো নারী নির্যাতিত হননি। আজ আমার (Mobile love) ভ্রাম্যমাণ প্রেমে কোনো যুবতী, নারী অসতী হতে হয়নি। কেউ স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়নি, কেউ প্রতারিত হয়নি। আমার মতো এ দেশে হাজারো মাখন আছে; কিন্তু তাদের সৎ মন, সাহস, চিন্তা কোনোটা নেই।

এ দেশের প্রায় পুরুষ আমৃত্যু নারীর স্তন, যোনি, মাংসল নিতম্ব, পুরু ঠোঁট, চিন্তাতে জীবনের বেশ দীর্ঘপথ পাড়ি দেন। আমি যেখানে যাই; যা করি, বলি ‘কথার কথা’ নিয়ে বলি না। নারীদের শ্রদ্ধা করি, শ্রদ্ধার আসনে যাপিত জীবনে আমার ‘লাভ কোর্টে’ চলার পথে ফেসবুক, ইউটিউব ও ভার্চুয়াল সততা নিয়ে সমাজের অবহেলিত নারীদের সাহস, বুদ্ধি দিয়ে পাশে থেকেছি, ভালোবেসেছি। ভালোবাসা অনুভবে, প্রকাশে নয়। যার যতো বেশি ভালোবাসা; তার প্রকাশ ততো কম। সবার জীবনে মোবাইল লাভ (ভ্রাম্যমাণ প্রেম) সফলতায় বনে আনুক। সূর্য আস্তে আস্তে দেবে যাচ্ছে।পাখিরা বাসায় ফিরে যাচ্ছে। আগামী সকালের প্রাণময়, মনোময় আশা নিয়ে উর্বশীর হাতে হাত রেখে ‘লাভবার্ড’ নির্ঝর সামনে এগিয়ে চলেছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কবি পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত