ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ২৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৯, ১৬:৩৯

প্রিন্ট

নাইবা হল যাওয়া

নাইবা হল যাওয়া
আশেক হোসেন

ঘটনাটি জেনে বেশ বিব্রত হলাম। কারণ আমার দুই প্রতিবেশিনীর মধ্যে আজ দুপুরে যে কলহ হয়েছে তার উপলক্ষ্য আমার মত একজন অধম। এমন অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। তবে কাজের বুয়া ইসমাইলের মা যে গোলমেলে কিছু করছে তা আঁচ করতে পারিনি, সেকথা বলবা না।

বর্ধিষ্ণু এই গ্রামে নবীন চাকুরে হয়ে এসেছি সম্প্রতি। বসবাসের জন্য নদীর ধারে একটি বাসা ভাড়া করেছি। বাসায় একা থাকি। কাজের বুয়া ইসমাইলের মা রান্নাবান্না করে। কাজটি সে স্বাধীনভাবেই করে কারণ ঐ বিষয়ে নাক গলাবার সময় বা অভিরুচি কোনটাই আমার নেই।

কিন্তু তাতে একটি সমস্যা হয়েছে। ইসমাইলের মার ধারণা হয়েছে, খাওয়া দাওয়ার বিষয়টি যেহেতু তার মর্জি মাফিক হয় সুতরাং আমার আর সব ভালমন্দ দেখার অধিকার সে অর্জন করেছে। তার কোন দোষ নেই কারণ বাৎসল্য নারীর সহজাত প্রবৃত্তি। তবে আমার দোষ আছে। তাহল, ভাল চাকুরি করা সত্ত্বেও এখনও আমি বিয়ে করিনি, একজন কন্যার পিতাকে দায়মুক্ত করিনি। বিষয়টি গুরুতর অপরাধ। সেই অপরাধ থেকে উদ্ধারের জন্য আমার প্রতিবেশিনীরা উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। তাঁদের একজনের আছে অনূঢ়া ভগ্নি, অপরজনের বিবাহযোগ্যা কন্যা। তাঁদের তৎপরতার কারণে একজনের কদর বেশ বেড়ে গেল। যে আর কেউ নয়, আমার পরিচারিকা কাম অভিভাবিকা ইসমাইলের মা। আমার কুমারত্ব অবসানের জন্য সেও ব্যতিব্যস্ত। তার যুক্তি, ছেলেদের বিয়ের বয়স অতিক্রান্ত হওয়া উচিৎ নয়। তাতে পদস্খলন হবার সম্ভাবনা থাকে। তেমন সুযোগ দিতে সে নারাজ।

মুরগি কেনা হয়নি তবুও খাবার টেবিলে মুরগির মাংস দেখে যখন অবাক হই, তখন তার জবাব রহস্যময়, ‘সব কিছুই কিনতে হয় না। অনেক কিছু এমনি পাওয়া যায়।’ সামনে চর্বচোষ্য খাদ্যের পেয়ালা রেখে আমি কথা বাড়াইনা।

আর একদিন দেখি, মাছের বড় টুকরো। প্রশ্ন করতেই উত্তর আসে, ‘আপনাকে সবাই আদর করে যে !’

পূর্বের মত এবারও নিশ্চুপ থাকি। চটকদার খাদ্যে উদরপূর্তি হচ্ছে, হোক। কি প্রয়োজন তার অন্তনিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে ঘাটাঘাটি করা। সুতরাং প্রতিবেশিনীদের বাড়ি থেকে প্লেট চলাচলি নির্বিঘ্ন রইলো। কিন্তু বিপদ আপদের তো হাত পা নেই, তা যেকোন সময়ে ঘটতে পারে। ঘটলও তাই।

প্লেট আসা যাওয়ার কাজটি হচ্ছিল পালাক্রমে। অর্থাৎ একপক্ষ জানতেন না অপর পক্ষের কথা। বিষয়টি সমন্বয় করত ইসমাইলের মা। কিন্তু সে ভাল সমন্বয়কারী না। ফলে উভয় পক্ষের কাছেই একদিন ধরা পড়ে গেল। তখন তাঁরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হলেন। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে দুরভিসন্ধির অভিযোগ আনলেন। কিন্তু কেউই বিবাদে জয়ী হতে পারলেন না। তখন উভয়েই ইসমাইলের মায়ের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হলেন। কথায় বলেনা, সব দোষ নন্দ ঘোষ। দুর্বলকেই বলির পাঁঠা হতে হয়। আমার উপর চাপ প্রয়োগ করা হল যেন আমি ইসমাইলের মাকে বরখাস্ত করি। বেটিতো কেঁদেকেটে অস্থির। চাকরিটি গেলে সে সর্বস্বান্ত হবে। সুতরাং আমি প্লেটের লোভ ত্যাগ করলাম এবং ইসমাইলের মাকে বহাল রাখলাম। ইতিমধ্যে অফিস চত্বরে একটি বাসা খালি হল। নদীর ধারের বাসাটি ছেড়ে আমি সেই বাসাতে উঠলাম। ইসমাইলের মা যথারীতি আমার পরিচারিকা রইলো। তবে অনধিকার চর্চা না করার জন্য তাকে সতর্ক করে দিলাম। সেসাথে, এ পর্যায়ের মানুষের বিচার বুদ্ধির উপর আস্থা রাখা যে বোকামি, সে শিক্ষা অর্জন করলাম।

আসলে কি, মানুষের উপর ভরসা করতে এবং তাকে বিশ্বাস করতে আমার ভাল লাগে। সেক্ষেত্রে, যে মানুষটির উপর ভরসা করি তাকে তার কাজে উপযুক্ত ধরে নেই। সব সময় বিশ্বাস করি, উপযুক্ত না হলে সে দায়িত্ব নেবে কেন? কিন্তু অনেক সময় ফলাফল হতাশাব্যাঞ্জক হয় এবং দেখা যায় অপাত্রে আস্থা রেখেছিলাম। তার চেয়ে বরং নিজেই যদি কাজটি করতাম বা সিদ্ধান্ত নিজের মত করে নিতাম, তাহলেই ভাল হত।

এক্ষেত্রে অবশ্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয় এবং দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা পরিহার করতে হয়। বস্তুতান্ত্রিক এ পৃথিবীতে মানুষের উপর আস্থা রাখা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, কে যে বাস্তবিক উপযুক্ত ব্যক্তি তা নির্ণয় করা কঠিন। চারিদিকে চাপাবাজেরা সরব। ‘কাজটি আমি পারিনা’, এমন কথা বলার মত সৎ ব্যক্তির খুব অভাব। অনুপযুক্ত ব্যক্তিরা সর্বত্র চিৎকার করছে, ‘আমি সব পারি ’। এসব অসৎ, ভণ্ড ও প্রতারকেরা সমাজকে অনিরাপদ করে ফেলেছে। এদের ভিড়ে সৎ ও উপযুক্ত ব্যক্তিরা হারিয়ে যাচ্ছে।

সমাজকে নিরাপদ করতে হলে সৎ চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল, ইসমাইলের মায়ের মত অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উঁচু তলার মানুষরাও প্রতিনিয়ত অসৎ চিন্তা চর্চা করে, যা সমাজকে ঘুণ পোকার মত কুরে কুরে খেয়ে নড়বড়ে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ঐ অতি চালাক অথচ নির্বোধ ব্যক্তিরা বোঝেনা, এমন ফলাফল কারো জন্য শুভ নয় এবং তেমন অসৎ চর্চার শিকার সে নিজেও হতে পারে। আজ দুপুরে একটি ছেলে আমার অফিসে বদলি হয়ে এল। পিয়নের চাকরি করে। আমার জন্য সে একটি চিঠি এনেছে। এক বন্ধুর চিঠি। তাতে রহিমুদ্দিনের জন্য তদ্বির করা হয়েছে। হাঁ, ঐ নামেই তাকে ডাকতে হবে। আমার ফুট ফরমাস, ধোয়ামোছা এমনকি রান্নাবাড়ি সবই করবে সে। বিনিময়ে তার থাকা খাওয়ার ভার নিতে হবে। কিন্তু সেজন্য-ত আমার মানুষ রয়েছে। তবু রহিমুদ্দিন নাছোড়বান্দা। সুতরাং কি আর করা। আমাকে মানুষের উপর মানুষ রাখতে হল। ইসমাইলের মা দুস্থ মানুষ। তাকে তো আর পথে বসাতে পারিনা। অতএব, ওরা দুজনেই আমার অন্ন ধ্বংস করতে লাগলো।

স্থানীয় হাসপাতালের সাথে আমার অফিসের এক প্রাচীরের দূরত্ব। সেখানে আমি ঘনঘন যাতায়াত করি স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন ছাড়াই, নিছক আড্ডা দেবার জন্য। ডাক্তার মোসাদ্দেক আমার সমবয়সী, দিলদার মানুষ। নিজ পেশায় এক ধরণের সততা লালন করেন। মানুষকে ভালবাসেন। মানুষও তা অনুধাবন করতে পারে। তাই তারাও তাঁকে ভালোবাসে। অনেকে আবার আড়ালে আবডালে পাগলা ডাক্তার বলে।

চেম্বারের সামনে ভিড় দেখে ইতস্তত করছিলাম। ডাক্তার সাহেবের গলা শুনতে পেলাম। কাকে যেন ধমকাচ্ছেন, ‘আমি যেয়ে কি করব? যা রোগী নিয়ে আয়। অমন রোগী বাড়িতে ফেলে রেখেছিস কেন? বোনটাকে মারতে চাস?’ কৌতূহল দমন করতে না পেরে ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। ডাক্তার ইশারায় বসতে বলে আবার রোগীর লোকজনের উপর চড়াও হলেন, ‘কি হল, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, একটা ভ্যান নিয়ে এক্ষুণি চলে যা।’

লোকটি খেয়া নৌকার মাঝি। সদরের ঘাটে খেয়া পারাপার করে। গাট্টাগোট্টা শক্ত সমর্থ। সবাই চেনে। সেই কালাম মাঝি অসহায় মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাথে তার আত্মীয় স্বজন। গতকাল থেকে তার বোন প্রসব বেদনায় ভুগছে। এখনও খালাস হয়নি। প্রসবের কাজে নিয়োজিত ধাত্রী এবং অন্যান্যরা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই ডাক্তার সাহেবের কাছে এসে পড়েছে। পুরুষ মানুষ হলেও তিনি ছাড়া গতি নেই। তিনিই উদ্ধার করতে পারেন।

স্থানীয় বাজারে সবাই সেই পরামর্শ দিয়েছে। তাই সে এসেছে ডাক্তার সাহেবকে কল দিতে। কিন্তু বিলম্বিত প্রসবের ব্যবস্থাপনা বাড়িতে সম্ভব নয়। ডাক্তার সাহেব সেটি বোঝেন। কিন্তু কালাম ও তার পরিবার চায় ডাক্তার সাহেব রোগীকে একবার দেখেন। তারপর তিনি যা উপদেশ দিবেন, তারা তাই মানবে। কিন্তু মোসাদ্দেক আর এমনিতেই পাগলা ডাক্তার নন! তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল? রোগীকে হাসপাতালে আনতে হবে, মানুষের হাসপাতাল ভীতি দূর করতে হবে। তিনি আমাকেও ছাড়লেন না, সবুদ মেনে বসলেন। কি আর করা? আমি কালাম মাঝিকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম।

কিন্তু সব কিছুই পন্ড হয়ে গেল যখন কালাম হাত জোড় করে কেঁদে ফেললো। পাগলা ডাক্তার সব সহ্য করতে পারেন, কিন্তু মানুষের অশ্রু! সেটা তাঁর কখনও সয়না। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন, ‘কিছু মনে করবেন না, তৌহিদ ভাই। আমাকে উঠতেই হচ্ছে। এই গর্দভ দেখছি পণ্ড শ্রম না করিয়ে ছাড়বে না। পরে আপনার সাথে কথা বলব।’ অতঃপর তিনি রিক্সা ডাকতে বললেন এবং ডেলিভারি রুমে খবর পাঠালেন, তারা যেন প্রস্তুত থাকে, একটি জটিল ডেলিভারি হবে। আমি বাসায় ফিরে এলাম। বিকেলে খবর পেলাম, কালাম মাঝির বোনকে যন্ত্র করে প্রসব করান হয়েছে। মা ও মেয়ে ভাল আছে। তবে ডাক্তারের দুপুরের আহার ও বিশ্রাম কোনটাই হয়নি।

রহিমুদ্দিনের চেহারা সম্প্রতি বেশ খোলতাই হয়েছে। গায়ে গতরে মাঝে মধ্যে নতুন কাপড়ও ওঠে। স্পষ্টতই সুখে আছে। আমার দুপুর বেলার খাবার সেই পরিবেশন করে। বেটি এ সময় থাকেনা। রান্নাবান্না করে চলে যায়। খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ করে শোবার ঘরে যাবার উদ্যোগ করছি এমন সময় রহিমুদ্দিন গলা খেঁকারি দিল। বুঝলাম কিছু বলবে। হয়ত টাকা ধার চাইবে।

- স্যার, বলছিলাম কি রান্নাবাড়ির কাজতো আমিই করতে পারি। তাহলে আর ইসমাইলের মাকে রাখার কি দরকার। মাসে মাসে কিছু টাকা বেকার খরচ হচ্ছে।

- হলে আমার হচ্ছে, ততে তোমার কি?

- আমার কিছুই না, স্যার। আপনার ভালর জন্য বলছিলাম।

- আমার ভালোর জন্য তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। নিজের কাজ কর, যাও।

দুদিন পরের কথা। অফিস থেকে ফিরে দেখি ইসমাইলের মা বসে আছে। একটু অবাক হলাম। তার তো এতক্ষণ থাকার কথা নয়। আমি ঘরে ঢোকার একটু পরেই সে দরজার সামনে উদয় হল। আমি তাকালাম। তাকে বেশ উত্তেজিত মনে হল।

- আব্বা, ঐ রহিমুদ্দিটাকে রাখার কি দরকার। একটা মানুষের খাবার খরচতো কম নয়। বাজার হাট করার জন্য আপনার আরও পিয়ন আছে। ফজলুটাকে বললে সেই সব করে দেবে।

- কেন? রহিমুদ্দিন তোমাকে কিছু বলেছে?

- ঐ ছোঁড়ার চালভাল ভাল না, আব্বা। সে বাজারের টাকা চুরি করে।

বুঝলাম, যে কোন ভাবেই হোক দুদিন আগের ঘটনাটি সে জানতে পেরেছে। যাই হোক, তাকে আশ্বস্ত করে বিদায় দিলাম।

অনন্তপুর নামে এই শহুরে গ্রামটি ছবির মত সুন্দর। উদার নীল আকাশের নিচে সবুজ শস্যক্ষেতের বুক চিরে চলে গেছে রুপালি ফিতার মত চকচকে পিচঢালা রাস্তা। এই রাস্তাটি অনন্তপুরের লাইফলাইন। কারণ দেশের অন্য কোথাও যেতে হলে এছাড়া আপনার গত্যন্তর নেই। উলুখাগড়ার ঝাড় পেরিয়ে ছোট্ট গ্রামগুলির আঁচল ছুঁয়ে রাস্তাটি চলে গেছে দূর দিগন্তে। তারই কোল ঘেঁসে প্রবাহিত হচ্ছে ছোট্ট নদী চন্দনা, যেন বিশ্বস্ত প্রেমিকা। ইসমাইলের মা আজ আসেনি। রান্নার কাজটি রহিমুদ্দিনই সারলো। বিকেলে সে এল ভীষণ দুঃসংবাদ নিয়ে। গতরাতে তার বড় ছেলে মারা গেছে। সুস্থ সবল যুবক, চন্দনা নদীতে মাছ ধরত, নাম ইসমাইল। এখন সে অতীত কিন্তু তার মা বর্তমান, যে এই মুহূর্তে আমার সামনে মাথা ঠুকছে। আমি কি করব? কি করব এই জনম-দঃুখিনী মহিলার জন্য! যৌবনে সে স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছে। দ্বিতীয়বার হয়েছে তালাকপ্রাপ্তা। সম্বল ছিল দুটি সন্তান যার একটি পাগল। যে ভাল ছিল, সে পথে বসিয়ে চলে গেল। এমন দুর্ভাগ্য নিয়ে মানুষ বাঁচে কিভাবে । মানুষ তবু বাঁচে, কাঁদে আবার হাসে। বিচিত্র মানুষের জীবন। দুঃখ, কষ্ট, কান্নাকে জড়িয়ে ধরেও মানুষ বাঁচতে চায়। ইসমাইলের মায়ের মত অজস্র দুঃখিনীরা এভাবেই বেঁচে আছে। আমি বুঝিনা, কি এদের বাঁচার প্রেরণা। সম্ভবত, কেবল বেঁচে থাকার আনন্দেই তারা বাঁচে।

ষড়ঋতুর এই দেশে ঘনঘন পরিবর্তিত হয় প্রকৃতির মেজাজ। মেঘ, বাতাস এবং গাছের পাতারা উড়িয়ে নিয়ে যায় পুরাতন বেদনা। বেদনার ক্ষতে বুলিয়ে দেয় আনন্দের পরশ। মানুষ আবার হাসতে শুরু করে। ইসমাইলের মার দু:খ এভাবেই প্রশমিত হয়।

আজ অফিসে অনেক কাজ ছিল। ফিরতে বেশ দেরি হল। বাসায় এসে দেখি, কম বয়সি একটি শীর্ণ মেয়ে ততোধিক শীর্ণ একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সিঁড়িতে বসে রয়েছে। পাশে বয়স্ক একটি ব্যক্তি। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে তিনি যা বললেন তার অর্থ হল তিনি রহিমুদ্দিনের শ্বশুর। সঙ্গের মেয়েটি তার কন্যা এবং কন্যার কোলে রহিমুদ্দিনের সন্তান। আমি অবাক হলাম কারণ রহিমুদ্দিন যে বিবাহিত তা জানতাম না। যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে তাদের বাহিরের ঘরে বসতে বলে ভিতরে চলে এলাম। ভিতরে এসে দেখি ইসমাইলের মা বসে আছে।

- কি ব্যাপার বেটি, তুমি এখনও যাওনি?

- কিভাবে যাব আব্বা? ঐ মেয়েটি কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না।

- ঘটনা কি, বলত।

- ঐ রোগা মেয়েটি রহিমুদ্দিনের বৌ। বাচ্চাটাও তার। এর আগে যেখানে ছিল সেখানেই বিয়েটি করেছিল। বদলি হয়ে এখানে আসার সময় ওদের ফেলে রেখে এসেছে।

- কেন?

- এই বৌকে নিবে না।

- নিবেনা মনে? বিয়ে করেছে, বাচ্চা হয়েছে। নিবেনা কেন?

- সে আবার বিয়ে করবে। হাসপাতালের আয়া করিমনের একটি ভাতিজি আছে। তাকে বিয়ে করবে। মেয়েটি দেখতে ভাল। করিমন মোটা যৌতুক দেবে। তবে সতীনের উপর মেয়ে দেবেনা, আগের বৌ তালাক দিতে হবে।

- আরে বাপরে, কি ভীষণ সব ব্যাপার স্যাপার! তুমি এত জানলে কিভাবে? আমার মাথায় কিছুই ঢুকছেনা। তুমি ওদের খাবার ব্যবস্থা কর। আমি গোসলে গেলাম।

বিকেল বেলায় রহিমুদ্দিনের মুখোমুখি হলাম। সে স্বীকার করল, ওরা তার স্ত্রী সন্তান, কিন্তু গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। কারণ কি? শ্বশুর তার সাথে প্রতারণা করেছে। প্রতিশ্রুতি মত যৌতুক দেয়নি।

- কিন্তু শ্বশুরের টাকায় তোমার চাকরি হয়েছে, এটাতো ঠিক?

প্রতিউত্তরে রহিমউদ্দিন নীরব রইল।

- আচ্ছা, শ্বশুর নাহয় দোষ করেছে কিন্তু তোমার সন্তান, তার দোষ কি?

- বড় হলে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসব, বিয়ে দেব।

ইসমাইলের মা কিছু একটা বলতে গেলে, সে খেঁকিয়ে উঠল।

- আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলান কেন? আমার বৌকে আমি নিই বা না নিই সেটা আমার ব্যাপার। তাতে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন?

কথাটা সে পরোক্ষভাবে আমাকেও বলল। মোক্ষম যুক্তি। ঐ যুক্তির পরে আর কথা থাকেনা। তবুও আমি নরম সুরে বললাম, ‘রহিমুদ্দিন, এতবড় অন্যায় করনা। নিজের স্ত্রী সন্তানকে ঘরে তোল। মিছে মোহে মেতনা।’ রহিমুদ্দিন হাঁ-না কিছুই বলল না। সে ঘাড় বাঁকা করে গোঁয়ারের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর, ওদের নিয়ে নিজের আস্তানায় চলে গেল। পরের দিন প্রত্যুষে সে তাদের তাড়িয়ে দিল। অবশ্য, আপদ বিদায় করতে বাসষ্ট্যান্ড পর্যন্ত গেল এবং টিকিটও কেটে দিল।

আমি কিন্তু অত সহজে হাল ছাড়লাম না। তাই গেলাম ডাক্তারের চেম্বারে। পূর্বাহ্নে রোগীর চাপ বেশি, ডাক্তার সাহেব ব্যস্ত। আমার সাথে হাত মিলিয়ে বসতে অনুরোধ করলেন। আমি চারিদিকে চোখ ঘোরালাম। সুহাসিনী আমাকে আদাব জানাল। চন্দনচর্চিত হয়ে সে এক কেণে বসে রয়েছে। রোগীর ভিড় না কমা পর্যন্ত সে বসেই থাকবে, ভিড়ের মধ্যে পিতাকে বিরক্ত করবে না। বিষয়টি আমি জানি, তাই অবাক হলাম না। আপনারাও শুনবেন নাকি, সুহাসিনী উপাখ্যান ? ডাক্তার সাহেব রোগী দেখায় ব্যস্ত। আমিও তাঁকে বিরক্ত করতে চাইনা। এই ফাঁকে আসুন, শুনে ফেলুন সুহাসিনীর কাহিনী।

সুহাসিনী একজন বৈষ্ণবী। ডাক্তারের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের বড়। তবু সে ডাক্তারের কন্যা। অবাক হচ্ছেন, তাইনা? হিসাব মিলছে না? হিসাব মিলাতে হলে কাহিনীটি পুরোপুরি শুনতে হবে। সমস্যা নেই, হাতে বেশ সময় আছে।

প্রথম যেদিন সুহাসিনী ডাক্তার সাহেবের কাছে আসে, সেদিন সে সঙ্গে এনেছিল হাঁপানি জনিত ভীষণ শ্বাসকষ্ট। নবীন ডাক্তার সংকটাপন্ন রোগী সামাল দিতে গিয়ে হিমসিম খেলেন। কারণ এমন রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এখানে নেই; নেই উপদেশ দেবার মত কোন সিনিয়র। আত্মবিশ্বাসের সংকট তাঁকেও অসুস্থ করে ফেলার জোগাড় করল। কথায় আছে, যখন কোন মৃতপ্রায় রোগীর জন্য সঞ্জীবনী ঔষধের প্রয়োজন পড়ে তখন তার কিছুটা ডাক্তারকে খাইয়ে নিলে ভাল হয়। যাই হোক, আমাদের ডাক্তার একজন ভাল মানুষ। রোগীর জন্য তিনি নিবেদিত প্রাণ। সুতরাং নিজেকে ফিরে পেতে তাঁর দেরি হলনা। সৎসাহসের শক্তিই এমন।

হাঁপানির জন্য প্রযোজ্য শক্তিশালী ঔষধটি তিনি ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগীর দেহে প্রয়োগ করালেন। রোগী প্রথমে নেতিয়ে গেল। উদ্বিগ্ন ডাক্তার রোগীর মাথা নিজের কোলে টেনে নিয়ে বারবার ডাকতে লাগলেন,

‘মা, মা, আপনার কি খারাপ লাগছে?’

কি অদ্ভুত ব্যাপার! কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগী চোখ তুলে চাইলো এবং পরিষ্কার কণ্ঠে উত্তর দিল,

‘না বাবা, আমার ভাল লাগছে।’

সেই থেকে সুহাসিনী ডাক্তারের কন্যা, বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও। সর্বস্থানে তার অবাধ গতি। নতুন ফসল উঠলে, সে সোজা চলে যাবে ডাক্তারের বাসায়। ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী আপত্তি করেন না। তিনি জানেন, সুহাসিনী যা নিয়ে আসে তা পার্থিব বস্তু নয়  প্রাণের স্পর্শে স্বর্গের অমৃত। ডাক্তার সাহেবের একমাত্র কন্যা সন্তানকে আদর করে সে বলে, ‘এগুলো আমার দিদির জন্য।’

মাঝে মধ্যে স্বামীকে নিয়ে আসে।

‘বাবা, আপনার জামাইকে একটু দেখেনতো। ওর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।’

ডাক্তার সাহেব, তার চাইতে কমপক্ষে বিশ বছরের বড় তেমন একজন জামাইকে দেখতে মোটেও বিব্রত হননা। কিন্তু জামাই বাবাজি হন। তিনি স্ত্রীর আবেগকে সম্মান করলেও তাতে অংশ গ্রহণ করেন না। তিনি ডাক্তার সাহেবকে বাবা ডাকেন না, ডাক্তার বাবু বলেন।

আমার গল্প শেষ হল। ডাক্তার সাহেবও উজাড় হলেন। সুহাসিনী ঔষধ নিয়ে চলে গেছে।

- ভালই আছেন মেয়ে, জামাই, পারিষদবর্গ নিয়ে। এখান থেকে যাবেন কিভাবে?

- কিভাবে যাব? আপনিই বলেন। এখন থেকে বোধ হয় যাওয়া হবে না ।

- সেকি! ক্যারিয়ার করবেন না?

- এ লোকগুলোকে কিভাবে ত্যাগ করব, বলেন তো? এরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। অসহায় লোকগুলোকে, আমি কার হিল্লায় রেখে যাব? কিভাবে আমার ক্যারিয়ার হবে?

- ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই মানুষগুলোর জন্য এত আত্মত্যাগ করবেন?

- ক্ষুদ্র মানুষগুলোর ভালবাসা ও আস্থার মূল্য কিন্তু ক্ষুদ্র নয়। ওতেই আমার চলবে।

- আপনি ভাই নমস্য ব্যক্তি।

- মোটেই না। আমি সাধারণ মানুষ, তাই সাধারণ মানুষের ভালমন্দ সহজেই বুঝতে পারি। যাক, এসব মারফতি আলোচনা থাক। কিজন্য এসেছেন তাই বলেন।

- এসেছিলামতো একটি সমস্যা নিয়ে, কিন্তু বড় ইমোশনাল হয়ে গেলাম।

- ইমোশনের কল্পলোক থেকে পৃথিবীর ধুলোয় নেমে আসুন।

- ঠিক বলেছেন, বাস্তব পৃথিবীতে ভালবাসার সমীরণের চেয়ে ধুলোঝড়ের শক্তি বেশি। আমি আপনার আয়া করিমন বিবিকে চাই।

ডাক্তার জিহ্বায় কামড় দিলেন,

- আরে, আরে, বলেন কি সাহেব। আপনার জন্য কত সুন্দরী এবং তাদের পিতারা কোরবানি হতে এক পায়ে খাড়া, আর সেই আপনি কিনা এক আধ বয়সী আয়াকে চান !

ডাক্তারের রসিকতায় দুজনেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। হাসি থামলে আমি রহিমুদ্দিনের ঘটনা সবিস্তারে বললাম। ডাক্তার গম্ভীর হয়ে গেলেন।

করিমন বিবিকে ডাকা হল। কে বলে আধ বয়সী! আঁটসাঁট শরীর, যৌবনের জেল্লাই এখনও বিদায় হয়নি। বোঝাই যায়, মক্ষিরানি। সে সুর ধরে যা বলল, তাতে তার কোন দোষ নেই। দোজবরের সাথে ভ্রাতুষ্পুত্রীর বিয়ে দিতে সে মোটেই আগ্রহী নয়। কিন্তু ঐ হারামজাদা নাছোড়বান্দা। সে বিরক্তের একশেষ করে ছাড়ছে। স্যারদের উচিৎ তাকে নিরস্ত করা। কোন কিছুতেই কাজ হল না। রহিমুদ্দিন বিয়েটি করে ফেললো। বাসার কাজ থেকে আমি তাকে অব্যাহতি দিলাম।

তারপরে চন্দনা নদীতে অনেক পানি গড়িয়ে গেল, অনন্তপুরের সবুজ বনানীতে অনেক পাতা ঝরে গেল, ডাক্তার মোসাদ্দেকের সাথে আমি আরও ঘনিষ্ঠ হলাম। আমরা এখন রীতিমত বন্ধু। হাসপাতালের সবুজ চত্বরে প্রায় বিকেলে আমাদের আড্ডা বসে। ডাক্তারের বাসা থেকে আসে চা এবং তেলেভাজা। জমে উঠে আসর। আমরা ছাড়াও দু’একজন অতিথি তাতে যোগ দেন। রাজনীতি থেকে টিভি নাটক সবই সেখানে আলোচিত হয়। কিন্তু সুখ কখনও নিরবচ্ছিন্ন হয় না। তার ছন্দ পতন হবেই। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হল। সেদিন কেবল অফিসে বসেছি, এমন সময় ডাক্তারের টেলিফোন পেলাম। কালক্ষেপ না করে গাড়িতে চেপে বসলাম। ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে দেখি হতে প্লাষ্টার বেঁধে একটি তরুণী বসে আছে। সে আর কেউ নয়, রহিমুদ্দিনের বর্তমান স্ত্রী। তার বাম হাতের দুটি হাড়ই ভেঙেছে। কাজটি রহিমুদ্দিনের। মেয়েটি কাঁদছে। আমি মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। রহিমুদ্দিনকে ডাকলাম। সে বাইরেই ছিল। সবার সামনে তাকে জুতাপেটা করলাম। ডাক্তার বাধা দিল না।

পরের দিন, আমার অফিসে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিরা ধর্মঘট করল। উর্ধতন কর্মকর্তা আসলেন। আমার বিরুদ্ধে অধস্তন কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করা হল। আইন নিজের হাতে তুলে নেবার জন্য উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আমাকে মৌখিকভাবে তিরস্কার করলেন। কর্মচারিদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। কমিটির সামনে রহিমুদ্দিন তার অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করল। রহিমুদ্দিনের স্ত্রী সাক্ষ্য দিল যে, পড়ে গিয়ে তার হাত ভেঙেছে, স্বামীর প্রহারে নয়। তার স্বামীকে সাহেব অন্যায়ভাবে জুতাপেটা করেছেন।

কিন্তু তাদের সাক্ষ্য ধোপে টিকলো না যখন ডাক্তার এবং তাঁর দলবল তদন্ত কমিটিকে বলল, সকল অভিযোগ মিথ্যা। মেয়েটির বাম হাতের দুটো হাড়ই ভেঙেছে, যা পড়ে গিয়ে ঘটতে পারেনা। তা অবশ্যই সরাসরি আঘাতের ফলে হয়েছে। রহিমুদ্দিনের অফিসার রহিমুদ্দিনের গায়ে হাত তোলেননি। রহিমুদ্দিনের স্ত্রী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে, কারণ প্লাস্টার করার সময় তাকে যে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, তাতে সে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। সুতরাং সে সময় কি ঘটেছে, তা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তদন্ত রিপোর্ট আমার পক্ষে গেল এবং সকল অভিযোগ থেকে আমি অব্যাহতি পেলাম। তবে, প্রশাসনিক কারণে আমাকে বদলি করা হল। রহিমুদ্দিনকেও অন্যত্র বদলি করা হল। পরবর্তীকালে, সেখানে সে আর একটি বিয়ে করেছিল। বিদায়ের দিন ঘনিয়ে এল। কয়েকদিন থেকেই ইসমাইলের মা কেঁদেই চলেছে। ডাক্তারকে তার ভার নিতে অনুরোধ করলাম। বিনা বাক্যব্যয়ে সে অনুরোধ রক্ষিত হল। ডাক্তারের বাসায় তার কর্মসংস্থান হয়ে গেল। সেখানে একজন আগে থেকেই আছে। তাতে কি? এখন দুজন থাকবে।

ডাক্তারের কাছে বিদায় নিতে গিয়ে আমি আবেগ সামলাতে পারলাম না। গলা ধরে এল, তবু বললাম, ‘ডাক্তার, তুমি যেমন আছ ঠিক তেমনটি থেক। তোমার পাহাড়ের মত উঁচু কায়ার নিচে দু:খী মানুষগুলিকে আশ্রয় দিও।’ ডাক্তার আমাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দোওয়া করি, তুমি আরও বড় হও। আমাদের ভুলে যেওনা, আবার এস। আমি এখানেই থাকব।’

আমি উত্তর দিলাম, ‘আমি ফিরে আসব। তোমার ছায়ায় নীড় বাঁধবো। ততদিন তুমি থেকো, মহীরুহের মত। ’

অনেক দিন পরের কথা। আমি এখন অনেক উঁচু পদে আসীন। তবে রাখতে পারিনি প্রতিশ্রুতি, ফিরতে পারিনি অনন্তপুরে। তবু, অনেক দূরে বসে ঐ লোকটির প্রতি প্রায়শ শ্রদ্ধায় অবনত হই। মনে হয়, কত ক্ষুদ্র আমি তার কাছে। আহ্নিক গতির নিয়মে অনন্তপুরে এখনও দিনের পরে রাত নামে, রাত শেষে প্রভাত জাগে, জেগে ওঠে জনপদ। ঢিলেঢালা আধাশহর সচল হয় ধীরে ধীরে, সরব হয় মৃদুলয়ে। মোসাদ্দেক ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে তার ব্যস্ততা। কেবল রোগী দেখা নয়, সকল সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার ডাক পড়ে। অলস এই জনপদটি যেন বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরেছে কর্মবীর মানুষটিকে।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত