ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:১৫

প্রিন্ট

নীলা হারুন-এর পাঁচটি কবিতা

নীলা হারুন-এর পাঁচটি কবিতা
অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের নারীরা যেমন হয়

এখানে নারীরা মায়েদের মত হাসে।

সুন্দরীদের আমের মত মুখের আদল,

তাদের গায়ের রং

মাটি ঝেড়ে উঠে আসা;

ছায়ায় পড়ে থাকা

হলুদের মত।

এখানে নারীদের হাতের পরশে

আবোল তাবোল কাঁকড় ছাড়িয়ে

পায়েশের ঘ্রাণ উঠে আসে-

প্রাতরাশে।

এখানে নারীরা বিস্বাদ সবুজকে

স্বাদে ভরিয়ে দেয়;

কিশোরীরা আমলকী গুঁজে

চুলে আর গালে।

অনবরত গল্পের ফাঁকেও

তাল নারকেলের পাতা

বিছানার পাশে এলিয়ে দেয় তারা

সুনিপুণ ধাঁচে।

এখানে নারীরা শিশুদের দিকে টানে।

টানে পরিজন আর ছোট বড় সবার দিকেই-

তারা কেবল নিজেদের দিকেই টানেনা।

ভরদুপুরের প্রেম

তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হল এক প্রচণ্ড তপ্ত দুপুরে।

অলস শরীরেও সেই উত্তাপ ঘাম এনে দেয়।

শহুরে পিচের গরমে ক্ষয়ে যাবে যেন রবারের স্যান্ডেলের তলা।

মাথার তালু গরম হয়ে চুলগুলোকে রুক্ষ করতে করতে চামড়া ঝলসে দেয়।

সেই আগুন গরম ললাটের নিচে,

রোদে সরু হয়ে আসা চোখে আমি দেখি-

পথের ধারে শুষ্ক তুমি দাঁড়িয়ে।

কতক্ষণ ওভাবে ছিলে কে জানে?

বোধহয় অনেকক্ষণ।

বড্ড অসহায় লাগছিল তোমাকে।

তবু, নির্জ়ীব তোমার ঠোঁটগুলো ছিল টুকটুকে লাল।

আর কি মায়াবী চোখ!

হাওয়াই মেঠাই এর মত গোলগোল দৃষ্টি।

চারপাশে কোথাও একটুকু জল নেই।

কেন যেন মনে হল,আমার কাঁধের কাছটায় তাকিয়ে আছ।

আমি সামান্য চা ওয়ালা,চা এর সাথে ‘টা’ এর বিস্কুট,

সস্তা কিন্তু কুচমুচে,

ক্রেতা সন্তুষ্টি এর জন্য এক বোতল পানিও সাথে রাখি।

দেখেই বুঝতে পারি বোতল থেকে পান করায় তুমি অভ্যস্ত নও।

চায়ের ফ্লাস্কের পেয়ালার মতন মুখ ভর্তি করে জল ঢেলে দেই।

এগিয়ে দেই তোমার আপ্যায়নে।

কি সুন্দর খুকির মত টুকটুক করে,

যেন এক্কাদোক্কা খেলছ-এইভাবে লাফাতে লাফাতে

তুমি হেঁটে এলে!

জলের মাঝে ডুবতেই তোমার লাল ঠোঁটদুটো ভিজে উঠল।

আমি তোমাকে ভালবেসে ফেললাম।

আর তুমিও আমাকে।

হে আমার ছোট পাখি,

তোমার নরম পালকের বুনন ঝাপটে তুমি

আমার আঙ্গুলের ডগায় এসে বস।

ছোট শরীরে পদ্মার ইলিশের মত ছড়ানো চকচকে লেজ।

আজকের মত বেচাকেনা শেষ,

এই গরমে আর কেই বা চা খাবে?

লাচ্ছির দোকানী পোষাচ্ছে শীতের লোকসান!

তোমাকে পেয়েছি,এবার বাড়ী যাব।

প্রেমের শ্রাদ্ধ

এনে দিতে পার বুঝিবা - সোনালী রোদ্দুর।

জলের অতলে,ছাইচাপা আগুনের তলে

লুকোন দীর্ঘশ্বাস,

জীবনটাকে নরম রুটির মত কেটে কেটে নিচ্ছে।

ভাবছ,বুঝি কিছু এল গেল না। ভুল ভেবেছ।

একটু একটু করে তো,

জমা জলের পুরোটাই শুষে নেয়-

স্যাঁতস্যাতে ভূতল।

এই যে একচিলতে করে জীবন যাচ্ছে চলে প্রতিনিয়ত ,তার ক্ষতিপূরণ কিসে হবে শুনি?

আচ্ছা,তুমি কখনো কোন লাজুক স্বপ্ন দেখেছ?

সূর্যালোক যেমন এক তৃণ্মুখ চুম্বন করে,

অপরদিকে গুল্মের শেকড় জমিনের তল-

আমাদের বৃক্ষের শেকড় তো জড়িয়ে গেছে সেই কবে;

ছুঁয়ে ধরিত্রীর পাথুরে অন্তর।

তুমি বুঝিবা ভাব আমায় খেয়ালী!

নিজের চারপাশে খুব তুলেছি দেয়াল।

ভাব, খুকির মত ভয়ার্ত চোখ হয় আমার

যখন মাঝরাতে উঠে ডেকে-

গল্পের মানুষরূপী শেয়াল।

মানুষ আমায় কে ভেবেছে কবে?

আঘাত পেয়েছি সবখানে একই।

জানো,পথের বেড়াল,দেয়ালের যুধিষ্ঠির,

গোল গোল গুবরেপোকা-

তারাও আমাকে,

মানুষ ভাবে না!

আমার নামে তুমি কার কাছে করবে অভিযোগ?

জগতের সকলের কাছেই আমি সমান দোষী।

অপরিচিত নির্বোধকেও শুধালে আমার নাম করে,

সেও তোমায় দেখিয়ে দিবে কাজী!

ভাবছ, বেশ উল্টোপাল্টা বকছি।

ভাববেই তো!

বেড়ির মাঝে লালিত আমি-

অবাধ্য এক প্রাণীতো!

জানো,আমার এপাড়ের মেঘেরাও ওপারে

তোমার দেশের আবীর মেখে আসে।

ঘুরেফিরে বেড়ায় হাঁসের ঝাঁক,

কুচকুচে কাক,

ক্লান্ত বাতাস ছুঁয়ে যায়

আমাদের সিক্ত আঁখি।

তোমার পাহাড়ের কোল মিশেছে

আমার ঘাসের তরে

বৃষ্টির ছাঁট নেচে নেচে যায়-

দুই জমিনের পরে।

তোমার জলের ধার ঘেঁষে –

আমার জলের মাছ,

তোমার রংধনু ছুঁয়েছে-

আমার আকাশ।

আচ্ছা,আমাদের যে শেকড় সকলের আড়ালে জড়িয়েছে পাথরের কিনারা বেয়ে,

তা যদি কোনদিন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে-

তবে সেটা সামলে নিতে পারবে তো!

আবদার

আমাকে একটা শহর দাও

আমি তাকে মনের মত করে সাজাই ।

সারি সারি লাল দুরালাপনী ঘরে

অসংখ্য আলাপেরা থাকবে -

তোমার অপেক্ষায়।

লেবুরঙ্গা আলো জ্বালিয়ে দেব

সন্ধ্যে হলেই ,

যেন এ শহরের প্রতিটি অলিগলি

তোমার ভালবাসা পায় !

আমাকে একটা শহর দাও

আগুনরঙ্গা কৈফিয়তের স্রোতের

অভিমানও ভুলিয়ে দেব;

নর্দমাগুলোকে বদলে দেব

সোনালী মাছের আবাসে!

এ শহরের অসংখ্য গাছপালা

আকাশটাকে করে দেবে আরও নীল,

ঘন হবে যত পুরনো ফ্যাকাশে রং,

রেলের মরিচা ধরা পথেও

ভালবাসা খুঁজে পাবে তখন।

আমাকে তুমি একটা শহর দাও,

অসংখ্য সুখী মানুষে ভরে দেই তা -

যারা শিশুর মত সরল ;

হ্যানিম্যানের মিষ্টি কাঁচের শিশিতেই যাদের

সকল রোগের হবে সমাধান ।

এ শহরে কোন আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলবে না কেউ

এ শহরে প্রয়োজন হবেনা কোন ঝাড়ুদারের ;

কমলা বিকেলে গোলাপী হ্রদের পাড়ে লাল ঝরা পাতা

আমাদের ভুলিয়ে দেবে -

সমস্ত অতীত বিষাদ ।

মধ্যরাতে একসাথে বেজে উঠবে

অপেক্ষায় থাকা সারি সারি দুরালাপনী সব !

তার মাঝে ক্ষয় হবে -

তোমার আমার জমানো কথার কলরোল।

বাংলাদেশের গ্রাম

যেভাবে উঠান রাঙ্গিয়ে দেয়

পাকা আমের বর্ণের ফসল,

সেভাবে কিষাণের চোখে

নেমে আসে আলস্য।

বীজরঙ্গা সেই বাদামী উঠান-

যাতে পড়ে ছায়া

আম আর কাঁঠালের

সে উঠানে একটা ভূততাড়ানো গাছ ও

বেঁচে থাকে থোকা থোকা টক নিয়ে।

সেই টক বরই কাঁটা এড়িয়ে

মাঝরাতে চালে বসা প্রেত ঘুম ভাঙ্গায় এখানে।

আর চড়ুইরা খেয়ে নেয়-

মেঘে ভেজা ফেলে দেয়া ফেনে ইতস্তত পড়ে থাকা

একটি দুইটি ভাত;

যা উঠানের একপাশে গজানো

মাটির চুলার ধার ঘেঁষে

জমিটাকে কেটে দিয়েছে যে নালা ইঞ্চিখানেক।

সরু স্রোতস্বীনী ফেন সেই নালা দিয়ে বয়ে যায়।

ভাতের ফেনা সমুদ্রের ফেনার মত।

মাটির হাঁড়ি নামক ঝর্না থেকে গড়িয়ে দিলে

একটা ধবধবে নদীর মত বেয়ে চলে সুবাস।

সেখানে গোসলে সাবান ডলে ফেনিয়ে উঠা

গ্রাম্য শিশুকে দেখা যায়-

যার গায়ের রং

গাছের বাকলের মত সুন্দর।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত