ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ৪৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩১

প্রিন্ট

সাইফুল্লাহ আল মামুনের সাইবিতা

সাইফুল্লাহ আল মামুনের সাইবিতা
মাইন সরকার

সাইবিতা বলতে আসলে আমি বুঝতে পারি- সাই মানে সাইফুল্লাহ, বিতা মানে কবিতা, অর্থাৎ সাইফুল্লাহ আল মামুনের কবিতা। কবিতা হলো সুন্দরের প্রকাশ আর এই সুন্দরের প্রকাশ পাওয়া যায় সাইফুল্লাহ আল মামুনের কবিতায়। কবি নিজেই সাইবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন- (Saibita is a new format of poetry which is bigger than Haiku and smaller than Sonnet) উন্নত ভাষা ও অল্প কথার ব্যবহারের সমন্বয়ে কবি তৈরি করেছেন তার নিজস্ব ধারা বা কবিতার Format, পৃথিবীতে কবিতা সেই আদি থেকে প্রতিনিয়ত পরির্বতনশীল এবং সময়ের বাকবদলে কবিতারও শরীরগত ও চিন্তাগত পরির্বতন হচ্ছে। একসময় আমরা পয়ার বা সরবৃত্তে কবিতা লিখতাম যার ভেতর পরিপূর্ণ ছন্দ মিল থাকতো।

আমরা আমাদের প্রাচীন কালের চর্যাপদকে যদি দেখি তাহলে স্পষ্ট সেই সময়ের রুপচিত্র খুঁজে পাবো। আবার আধুনিক কালের শুরুতে ছন্দবন্ধতার খেলা ভেঙে যে গদ্য ছন্দে নিয়ম শুরু হয়েছিলো তা এখনও আছে তবে অনেক কবির কবিতায় ভাবগত ও ভাষাগত কিছু পরির্বতন পাওয়া যায়। এখন অনেক কবিতাই আর ছন্দে লেখা হয় না। আবার কবিতায় সাধু ভাষার ব্যবহারও নেই, আর এই সময়ে এসে আমরা কবিতাকেও অনেক সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছি যা খুব অল্প সময়েই পাঠক পাঠ করতে পারে। (যেমন পের্ত্রাক যে সনেটের প্রবর্তন করেছিলেন তা ছিলো সময় উপযোগী। তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবিরা সনেট লিখতে শুরু করলো। আবার জাপান যখন হাইকু লেখতে শুরু করলো তখন পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবিরা হাইকু চর্চা শুরু করলো।) আর এই সময়ে এসে অসংখ্য কবিরা ফেসবুকে কবিতা চর্চা করছে এবং এখানে কিছু পাঠকও পাওয়া যায়। ফেসবুকে কবিতা লেখা মোটেও দোষের কিছু নয়। তবে বাংলা ভাষার আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতাকে বদল করে গেছেন কিন্তু এই উত্তর আধুনিক সময়ে এসেও জীবনানন্দের বলয় থেকে বের হতে পারেননি আমাদের অনেক খ্যাতিমান কবিরাও।

এই কারণে হয়তো জীবনানন্দ বলেছিলো- ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। আর এখাবে সাইবিতার ভেতর কবিতার ধারাবাহিতা ও কবিতার শরীরগত মিলও পাওয়া যায়। যেমন-

সাইবিতা- বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

‘পায়ের নিচে পৃথিবীকে

ভেঙে ফেলার সাহস আমার আছে

তবুও আমি নেপোলিয়ান

কিংবা জুলিয়াস সিজার নই

আমি কবি, কবিতা দিয়েই

বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখি।’

অথবা

সাইবিতা- তিন

‘পাপী ভালো ভালো কথা বলে

ভালো কাজ করে কম

কাজে দক্ষ ফাঁকি দেয় হরদম,

অযোগ্যতাকে আড়াল করে

যোগ্যতার ভান করে কত অধম’

এই কবিতাগুলো খুব অল্প কথার কবিতা যেখানে শব্দের বাড়াবাড়ি নেই বললেই চলে। কিন্তু শব্দগুলোর ভেতর একটা আলাদা রিদমতা আছে, এখানে প্রত্যেকটি কবিতাই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় আছে। যদিও এই সময়ের অনেক কবির কবিতাই একরৈখিকতা কিংবা সরলরৈখিকতার বাহিরে যেয়ে বহু রৈখিকতায় ডুবে যায় তখন আর মূল বিষয়কে খুঁজে পাওয়া যায় না, মূল বিষয় অদৃশ্য হয়ে যায় কিন্তু এখানে প্রতিটি কবিতাই সরল রৈখিক যার ভেতর মূল বিষয় বিদ্যমান।

তবে এখানে অন্তমিল পাওয়া গেলেও মাত্রাবিন্যাসে কোনো ড্যাফিনিট বিষয় নেই। যেমনটা আছে সনেট কিংবা জাপানি হাইকুতে।

৬২ সালের হাঙরি জেনারেশনের পর কবিতাকে অনেকটা সহজ, প্রাণবন্ত কিংবা আবৃত্তিযোগ্য করে তুলেছিলেন কবি হেলাল হাফিজ তার ‘যে জ্বলে আগুণ জ্বলে’ এই গ্রন্থটির মধ্য দিয়ে আবার আশি, নব্বই দশকের কবিতায় তেমন কোনো বদল পরিলক্ষিত হয়নি।

জীবনানন্দ দাশের পর কবিতার আবেদন কিংবা আমূল কোনো পরির্বতন আসেনি বাংলা কবিতায়। তবে মধ্য আশির কবি রিফাত চোধুরীর কবিতার টোনটা একটু আলাদা যেখানে নব ভাবের উদয় আছে বলে আমার মনে হয়।

আবার শূন্য দশকের এসে কোনো কোনো কবি কবিতাকে জটিল করে তুলার চেষ্টা করেছেন, কোনো কোনো কবি দাউদ হায়দারকেও অনুকরণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে শূন্য দশকের কবি আপন মাহমুদের কবিতায় একটা আবেদন আছে যা পাঠক হৃদয়কে শিহরিত করে।

প্রকৃতপক্ষে কবিতা কখনই দশকের ভেতর আবদ্ধ থাকে না, কবিতা একটি মুক্তশিল্পকলা যেখানে কবিরা স্বাধীন, একজন কবি তার সবটুকু স্বাধীনতা নিয়েই কবিতা লিখেন বা চর্চা করেন। বাংলা ভাষায় খুব বেশি সাহসী কবি নেই যে কীনা দশক ভেদ করে ওঠে আসবে। মৌলিক বা চিরায়ত কবিতা কখনই দশকের ভেতর আবদ্ধ থাকে না।

কবি সাইফুল্লাহ্ আল মামুনকেও আমি কোনো দশকের ভেতর ফেলতে চাই না-কেননা তিনি কবিতাকে যাপন করেন, কবিতাকে সময় দেন, কবিতাকে ভালোবাসেন।

যেমন তাঁর সাইবিতা- কবিতার স্বপ্ন

‘কবিতার স্বপ্ন আমায় কাঁদায়,

অকারণে হাসায়

কবিতার সাথে আমার পরিচয়

বহুদিনের, বহু কারণের।’

কবিতার সহজিয়া মানুষ সাইফুল্লাহ আল মামুনের সাইবিতা গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ করেন উৎস প্রকাশন- অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮, বইটি পাঠে আশা করি কাব্য অনুরাগী পাঠকের ভাবনার পাল বিস্মৃত হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত