ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৩১ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:০১

প্রিন্ট

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -২৮)

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -২৮)

শাহজাহান সরদার

[দেশের জনপ্রিয় দুটি পত্রিকার (যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন) জন্মের পেছনের ইতিহাস, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া বিব্রতকর বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ, হস্তক্ষেপ, পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা দিয়ে অন্য একটি জনপ্রিয় পত্রিকা থেকে নিয়ে এসে পত্রিকা না বের করে হাতজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেয়া, পত্রিকা প্রকাশের পর কোন কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু দিনের মধ্যেই ছাপা সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে লাভ খোঁজা, ইচ্ছেমত সাংবাদিক-কর্মচারি ছাঁটাই করা সহ পত্রিকার অন্দর মহলের খবরা-খবর, রাজনৈতিক মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া কিছু রিপোর্ট, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির কিছু ঘটনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আমার এ বই ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’। জানতে পারবেন সংবাদপত্র জগতের অনেক অজানা ঘটনা, নেপথ্যের খবর।]

(পর্ব -২৮)

এই রব মিয়া এখনও বাংলাদেশ প্রতিদিনের গাড়ি চালান। মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। কোন বিষয়ে তার কোন অনুযোগ নেই। সংবর্ধনা শেষে ফিরলাম ল্যাবএইডে। শামীম সাহেব তখনও অপেক্ষা করছিলেন। আমি আসার পর আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলো। তার অফিসে থেকে আমি গেলাম পত্রিকা অফিসে। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর বাসায় ফিরি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের আবেগঘন বিদায়ের কথা বারবার মনে পড়ে। সংবাদপত্রে বা মিডিয়ায় চাকরি বদল খুবই স্বাভাবিক। তবে সম্পাদক হরহামেশা বদল হয় না। আর এক পত্রিকা ছেড়ে অন্য পত্রিকায় কোনো সম্পাদক যোগ দিলে এমন সংবর্ধনা আগে কাউকে দেয়া হয়েছে বলে আমি শুনিনি। কিন্তু এই সম্মান আমি পেয়েছি। পরদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনে সংবাদটি ভাল করে ছাপাও হয়। যাতে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রকাশিতব্য দৈনিকে যোগদানের কথাও উল্লেখ করা হয়। এক চাকরি ছেড়ে আসা আরেক চাকরিতে যোগদানে আমার কোন অবসর ছিল না। নতুন অফিসে আসা-যাওয়া। একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। নাম নিয়ে আলোচনা। এখানেও একই সমস্যা। নতুন নাম দিয়ে ডিক্লারেশন অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই আবার মালিকানা কেনার খোঁজ শুরু।

সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। ভালই রেসপন্স। কিন্তু নাম পছন্দ নয়। খোঁজাখুঁজির পর মোটামুটি পছন্দের একটি নাম পাওয়া গেল। নামটি হলো ‘বাংলা দৈনিক’। এই নামে ডিক্লারেশন যিনি নিয়েছিলেন তিনি আমার পরিচিত। আমি যখন যুগান্তরে যোগদান করি তখন তাকে আমি অন্য একটি কাগজ থেকে মফস্বল সম্পাদক করে নিয়ে এসেছিলাম। আমি আসার পর তিনিও চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি এই খবরটি জানতাম না। এখন অবশ্য তিনি জীবিত নেই। এই দৈনিক পত্রিকাটির ডিক্লারেশন তিনি মাত্র কয়েক মাস আগে পান। তার সঙ্গে আলোচনা হলো। মালিকানা হস্তান্তরে রাজি হলেন। আবেদন করা হলো জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে। প্রথমে আপত্তি। কাগজ বাজারে না আসতেই কেন মালিকানা পরিবর্তন? পরে বুঝিয়ে মালিকানা পরিবর্তনসহ সম্পাদক পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। তখন আমি হলাম ‘বাংলা দৈনিক’-এর সম্পাদক। কাগজ হাতে পাওয়ার পরই শামীম সাহেব বললেন, ডামি বের করতে হবে। আমি বললাম, আমার মাত্র একজন স্টাফ কম্পিউটার অপারেটর। ডামি বের করতে হলে আগে লোকজন নিতে হবে। আর শুধু ডামি কেন পত্রিকা বের করার পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। অফিস ডেকোরেশন, কম্পিউটার ক্রয়সহ প্রেস আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পত্রিকার জন্য যা যা প্রয়োজন সব ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন সময় কী করতে হবে সেসব বিস্তারিত আমি শামীম সাহেবকে আগেই লিখিতভাবে দিয়েছি। আমি বললাম, তাড়াতাড়ি প্রেস আনার ব্যবস্থা করেন। কারণ প্রেস বসাতে সময় লাগবে। প্রেস ছাড়া ভাল পত্রিকা করা যাবে না। আর আপনি তো আগেই বলেছেন। সবকিছুর জন্য আপনি তৈরি। তিনি বললেন, আমরা একটু ‘স্লো’ যেতে চাই। আমি বললাম কেন? পত্রিকা বাজারজাতের একটি সময় আছে। সময়মত করতে হবে। তিনি বললেন, আস্তে আস্তে করেন, সমস্যা কী? এরই মধ্যে তিনি আমার কাছ থেকে বেতন ভাতা, নিউজপ্রিন্ট ব্যয়সহ সব তথ্য নিয়েছেন। তিনি জানতে চান বাংলাদেশ প্রতিদিনে মাসে বেতনভাতা কত ছিল। আমি তাকে জানিয়ে বললাম, আমাদের এত বেশি লাগবে না। কম হলেও চলবে। আমরা অর্ধেক নতুন লোক নিব।

আমি লিখিতভাবে তাকে পদসংখ্যা, বেতনভাতার হিসাব দেই। তিনি দেখলেন, কিছু বললেন না। ডামির কথা উঠতে তাই বললাম সব ব্যবস্থা না করে ডামি হবে কীভাবে? তিনি বললেন, আন্ডারগ্রাউন্ডে অনেক পত্রিকা আছে। কিছু প্রেস শুধু এসবই ছাপায়। আমরাও তাই করব। আমি বললাম এটা ঠিক হবে না। তিনি বললেন, আপাতত আন্ডারগ্রাউন্ড ডামিই বের করেন। এরমধ্যে দেখি কী করা যায়। আমি তার বক্তব্যে হতাশ। কেননা এতবড় একটি পত্রিকা ছেড়ে এলাম ভাল কিছুর জন্য। এভাবে আমাকে আনা হলো আর এখন বলে ধীরে সুস্থে। আমি তার আচরণে হতাশ হলাম। আমি অফিস করছি। নতুন নতুন আইডিয়া, পাতার নাম, ডিজাইন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছি। প্রতিদিন অনেকে যোগাযোগ করছেন। সাংবাদিক কর্মচারী, এজেন্ট, হাকার। কিন্তু শামীম সাহেবকে তেমনি উৎসাহী দেখি না। বরং তার সঙ্গে এর মধ্যে যোগাযোগ কমে যায়। তিনি না ডাকলে আমি যাই না। এভাবে ক’দিন চলার পর হঠাৎ ফোন, তার অফিসে যেতে বললেন। গিয়ে দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এক তরুণ অধ্যাপক বসা। শুনেছি কয়েকদিন আগে তাকে ল্যাবএইডের কোন একটি প্রকল্পে নেয়া হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়েছেন মূলত একটি বিদেশি সংস্থার গবেষণার কাজ করতে। পাশাপাশি ল্যাবএইডের একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। অধ্যাপক আমার পূর্বপরিচিত। আমি যেতেই শামীম সাহেব পত্রিকার জন্য আমার দেয়া বেতন-ভাতার কাগজটি বের করে বললেন, আপনারা দু’জন বসে কাটছাঁট করে এটা ঠিক করেন। বেতন ভাতা কমাতে হবে, অনেক কমাতে হবে। আমি বোকা বনে গেলাম। সম্পাদক আমি। বেতন ভাতার তালিকা দিলাম আমি। আবার কোথা থেকে অধ্যাপক নিয়ে এসেছেন। তিনি সংবাদপত্রে কাজ করেননি, বেতন-ভাতা কী জানবেন? শামীম সাহেব আমাদের তার রুমে বসিয়ে বাইরে চলে গেলেন। অধ্যাপক নিজেও তার আচরণে বিব্রত। তবুও তিনি দেখলেন কাগজটি। দেখে বললেন, ভাই আপনার জিনিস আপনি ঠিক করেন। এটা আমার কাজ নয়। তিনি বললেন, এভাবে কি পত্রিকা হবে? আপনি ভুল করেছেন। এই অধ্যাপক লেখালেখি করেন বিভিন্ন সংবাদপত্রে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে লিখতেন না। এখন দেখি প্রায়ই তার লেখা ছাপা হয়। অধ্যাপকের কথা শুনে ভালই লাগলো আমার। তিনি এও বললেন, আপনি যে হিসাব দিয়েছেন এর চাইতে কম বেতনে কীভাবে পত্রিকা হতে পারে। এখানে বলতে চাই, বাংলাদেশ প্রতিদিনেও কিন্তু আমি ব্যয় সংকোচনের মধ্যেই রেখেছিলাম।

সব সময় বেতন-ভাতা একটি সহনীয় পর্যায়ে রেখেছি। একই গ্রুপের অন্য পত্রিকাগুলোর চাইতে ভিন্ন। কর্তৃপক্ষ বারবার বলেছে, আরো ভাল লোক আনেন। বেতন-ভাতা সমস্যা নয়। আমি বলেছি প্রয়োজন হবে না। ব্যয় সংকোচনের কারণেই বাংলাদেশ প্রতিদিন ভাল করতে পেরেছে। শামীম সাহেবের কথামতো আমি আরও কাটাকাটি করে একটি অংক দাঁড় করিয়ে তার রুমে রেখে চলে আসি। এরপর আর ক’দিন তার সঙ্গে কথা নেই। দেখাও নেই। হঠাৎ ক’দিন পর ফোন। জানালেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন অধ্যাপক আসবেন। একসঙ্গে তার মধ্যাহ্নভোজের কথা ছিল। কিন্তু তিনি অন্য কাজে যাবেন বলে থাকতে পারছেন না। আমি যেন তাকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করি এবং পত্রিকা নিয়ে কথা বলি। সেই অধ্যাপক নির্ধারিত সময়ে শামীম সাহেবের অফিসে আসেন। শামীম সাহেবের নির্দেশমত তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা অধ্যাপককে নিয়ে এলেন আমার অফিসে। তিনিও আমার পূর্বপরিচিত। কথা দিয়ে শামীম সাহেব না থাকার জন্য অধ্যাপক খুবই ক্ষুব্ধ। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি বললেন, শামীম সাহেব কাজটি ঠিক করেননি। আমাকে ফোনে জানাতে পারতেন। আমাদের সময়ের তো মূল্য আছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে আসতে হয়েছে।

চলবে...

বইটি পড়তে হলে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতিবার চোখ রাখুন ‘বাংলাদেশ জার্নাল’ অনলাইনে।

বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন

আজিজ সুপার মার্কেট (তৃতীয় তলা), ঢাকা।

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত