ঢাকা, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : ৩৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২০, ১৫:০৪

প্রিন্ট

কাঠমান্ডু ট্রাজেডির দুই বছর

ছেলে-নাতনির স্মৃতি আকড়ে বেঁচে আছেন ফিরোজা

ছেলে-নাতনির স্মৃতি আকড়ে বেঁচে আছেন ফিরোজা
ছবি-সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

‘রাতগুলোকে খুব দীর্ঘ মনে হয়। কোনও রাতেই ঘুমাতে পারি না। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে চোখ দুটো বুজলে হঠাৎ চমকে উঠি। মাঝেমাধ্যে মনে হয়, নাতনি প্রিয়ম্ময়ীকে নিয়ে এসে দরজায় কড়া নড়ছে প্রিয়ক। মা মা বলে ডাকছে।’ তখনও তার চোখ ভেজা ছিল। দেয়ালে টাঙ্গানো ছেলে প্রিয়কের ছবি মুছতে মুছতে এভাবেই বলছিলেন ফিরোজা বেগম। গত দু বছর এক মুহূর্তের জন্য ছেলে প্রিয়ক ও নাতনি প্রিয়ম্ময়ীকে ভুলতে পারেননি ফিরোজা। থামেনি তার কান্না। নির্জন দোতালা বাড়িতে কেটে যাচ্ছে নিঃসঙ্গ ফিরোজার দিনগুলো।

প্রিয়ক ফিরুজা বেগমের একমাত্র সন্তান ছিলেন। দুর্ঘটনায় প্রিয়কের একমাত্র মেয়ে তামারা প্রিয়ণ্ময়ী নিহত হয়। আহত হন স্ত্রী আলমুন নাহার এ্যানী। সুস্থ হয়ে এ্যানী আবার নতুন সংসার গড়েছেন। আর ফিরোজা বেঁচে আছেন ছেলে আর নাতনির স্মৃতি আঁকড়ে ধরে।

তিনি শুকনে ঠেঁটে বিড়বিড় করে বলেন, ‘আমি কীভাবে বেঁচে আছি কেউ জানে না। একে তো বেঁচে থাকা বলে না।’

স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র সন্তান প্রিয়ককে বুকে আগলে সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সে সুখও কপালে সইলো না। এটুকু বলেই হাউমাও করে কাঁদতে থাকেন ফিরোজা। টাকা পয়সা ধন-সম্পদের অভাব নাই তার, অভাব কেবল প্রিয়জনের।

১২ মার্চ কাঠমান্ডু ট্রাজেডির দুই বছর পূর্ণ হল। ২০১৮ সালের এই দিনে নেপালের কাঠসান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয় ইউএসবাংলার ফ্লাইট বিএস ২১১। ভয়াবহ এইদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫১ যাত্রী। এ তালিকায় ছিলেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী এফ এইচ প্রিয়ক ও তার মেয়ে তামাররা প্রিয়ম্ময়ী। তাদের মৃত্যুর দিন গাজীপুরের শ্রীপুরের নগরহাওলা গ্রামের বাড়িতে শূন্য দৃষ্টিতে একাকী বসেছিলেন ফিরোজা,। এখানে বাড়ির পাশেই সমাহিত করা হয়েছে প্রিয়ক ও প্রিয়ম্ময়ীকে।

এখন কীভাবে দিন কাটে আপনার—এমন প্রশ্নে মায়ের চোখে জলের ধারা নামে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফিরুজা বেগম বললেন, ‘একমাত্র সন্তানকে এক বছর আগে আল্লাহ নিয়ে গেছে। আমার পুতুলের মতন দেখতে নাতনিটাকেও আল্লাহ নিয়ে গেছে। এখন নামাজ–কালাম পড়ি আর তাদের জন্য দোয়া করি।’

প্রিয়কের মা জানান, ছবি নামের একজন নারী তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকছেন। প্রিয়ক বেঁচে থাকতে ছবিকে বাড়িতে কাজে সহযোগিতা করার জন্য রেখেছিলেন। ছবি নামটা প্রিয়কের খুব পছন্দের ছিল। তাই তাকেও আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই গুরুত্ব দিতেন প্রিয়ক। প্রিয়কের মা জানান, সব সম্পত্তি আইন অনুযায়ী যাদের যা পাওয়ার, তা দিয়ে বাকি সম্পত্তিটুকু তিনি মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য দান করে যাবেন। সে অনুযায়ী কাজও চলছে। নগরহাওলা গ্রামে বড় একটি মাদ্রাসাসহ মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা করেছেন তার প্রিয় নাতনির নামে। প্রিয়কের নামে তার থাকার বাড়িটিতে একটি হাসপাতাল তৈরি করার জন্য তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে এই বাড়িতে ছোট করে হলেও একটা হাসপাতাল করব।’

‘আমার তো এখন আর কেউ নাই। সন্তান আর নাতনির স্মৃতি বুকে নিয়ে প্রতিদিন বাঁচি। প্রিয়কের নামে বাড়িটাতে হাসপাতাল বানাব। নাতনির স্মরণে মসজিদ-মাদ্রাসা করে সবকিছু ওয়াক্‌ফে দিয়ে মরতে চাই।’

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত