ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ আপডেট : ২ মিনিট আগে

আলোর ঠিকানা কতদূর

  মোস্তফা কামাল পাশা

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৮:৫৮

আলোর ঠিকানা কতদূর
মোস্তফা কামাল পাশা
মোস্তফা কামাল পাশা

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ছোট্ট লেখা ছাড়ি। বরাবরই যেমন দেই, তেমনি। জনপ্রিয়তার লোভ টার্গেট করে কিছুই লিখিনা। নিজে যা সত্য মানি, যদ্দুর সম্ভব তাই বলি, লিখি, সবখানেই। ফে বু'তে বন্ধু, অনুসারী মিলে ১০ হাজারের বেশি।

লাইক, কমেন্টের সংখ্যা ব্যাতিক্রম ছাড়া সর্বোচ্চ ২০/৩০! বুষ্ট করে হাজার হাজার এমন কী লাখও করা যায়। টেকনিকটা অনেক ব্যাক্তি, অনলাইন পোর্টাল ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেন, কিছু ডলার খরচ করে। অফার আছে-ইচ্ছে নেই। পাঠক সংখ্যা জানা আছে, ওতেই তুষ্ট।

কোন বিশেষ বার্তাবাহী (Massage)লেখা ছাড়া প্রকৃতিকে নিয়ে কেবল মজা করি। তবুও কেউ কেউ নিজকে আক্রান্ত ভাবেন এবং এড়িয়ে চলেন। স্বাভাবিক, নিজে আক্রান্ত ভাবলে প্রতিরোধ করতাম, যুক্তি ও সত্যের অস্ত্রে। অন্যেও তাই করবেন, তেমন আশা নিরর্থক।

আপোষ করে বেঁচে থাকা, স্বার্থঘনিষ্ট ও পছন্দের জনদের খুশি রাখার কাজটা আমরা খুব ভালই পারি। নিজে একটু কম। জখমি ভেবে অনেকে নিরবে সরে যান। তখন অপেক্ষমান অনুসারী বাছাই করে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ হয়। কিন্তু বড় অংশ চুপচাপ আটকে থেকে মনিটরিংয়ে রাখেন ২৪ ঘণ্টা।

কী কী করছি, কারে আছাঁচা দিচ্ছি, ওসব তাঁদের সার্বক্ষণিক চোখে থাকা চাই! এটা অসুখ না শব্দকম্পের ওজন মাপার নেশার টান, ঠিক বুঝিনা! এটা সত্য, নিজে সবখানে এলোপাতাড়ি গুতোইনা। লেখা বা আইটেম মনোযোগ কাড়লে তবেই। কার লেখা বা কতবড় সেলিব্রিটি, এসব হিসাব খুব কম হয়। খুব আপন হলেও ভুলভাল বা কপিপেষ্ট এড়িয়ে যাই। অবশ্য ফে বু'তে দিনে গড়ে দু' ঘণ্টার বেশি সক্রিয় থাকিও না।

ফিরিস্তির কারণ, পোস্টে কিছু সম্মানিত শিক্ষক মনোকষ্ট পেয়েছেন। ইনবক্স ও হোয়াটসঅ্যাপ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি বেশ। আমিতো জন্মছাত্র। স্বাভাবিক কারণে শিক্ষক মানেই পরম সম্মানিত জন। কাটির হাট হাইস্কুলের পরম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মোসলেহ উদ্দিন স্যার, নৃপেন দেব স্যার, আলমগীর স্যার, এমদাদ স্যারেরা বাংলা-ইংরেজির পোক্ত ভিত গড়ে না দিলে আমি কী এতসব ছাইপাশ লিখতে পারতাম? প্রাথমিক লেভেলের গৃহ শিক্ষকরাও।

দুঃখিত, ওনাদের নাম বিস্মৃতির আড়ালে। তো, কোন সাহস বা আক্কেলে শিক্ষক মহোদয়দের অবজ্ঞা বা অপমান করবো? অসম্ভব। 'নিবেদন' পোস্টটায় দয়া করে আরেকটু মনোযোগ দিলে ঠিকই বুঝতে পারবেন। ওটায় কলেজ শিক্ষক সাইবার বন্ধু বিবি ফাতেমা চমৎকার মন্তব্য দিয়েছেন। ঝরঝরে ইংরেজিতে লেখা তাঁর মন্তব্যে চলমান বাস্তবতার সার সংক্ষেপও ফুটে উঠেছে।

অন্যরাও তাই পারতেন। কেন অন্যত্র ঢুঁ দিলেন, বোধের অগম্য। নিজের ভুল অন্তত বুঝতে পারতাম। নিজে কখনো শতভাগ কেন, ৬০ ভাগও শুদ্ধ দাবি করিনা। ভুল থেকেই শিখি। শিক্ষক হিসাবে আপনাদের নিকট শিখব। আমার পরিবারিক নিকট জনের অনেকে শিক্ষকতা করেন। একমাত্র মেয়েজামাই মাহফুজও (মাহফুজুর রহমান খান) শিক্ষক। মাহফুজকে যারা চিনেন-জানেন, শিক্ষক হিসাবে তারাই ভাল বুঝবেন, তার নিবেদন, দক্ষতা ও কৃতিত্ব।

সে'ও আমার মত শিকলমুক্ত। গলায় চাকরির শিকল পেঁচায়নি। আইভরি কোষ্টে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের সেনা কন্টিনজেন্টে ক্যাপ্টেন পদ মর্যাদায় দু'দফা সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। এরপর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট, বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমি) ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি-চট্রগ্রামে ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছে, করছে।

তার বড়ভাই মাহবুবুর রহমান খানও ক্যাডারভুক্ত কলেজ শিক্ষক। মাহবুব সহকারী অধ্যাপক পদ মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউটে যুক্ত আছে। মেয়ে ঊর্মি, মাহবুব, মাহফুজ, ওদের একমাত্র ছোটবোন নুশরাতও ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে, বড় ছেলে উপলও। ফরাসিসহ আরও ক'ভাষায় মাহফুজের দখল আছে। তাহলে কোন যুক্তিতে ছেলেমেয়েদের অপমান করবো, বলুন? একটা বিষয় নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝি, ডিগ্রি, ডক্টরেট লেখা পড়ার শেষ স্তর নয় বরং শুরু বলা যায়। টানা চর্চা, সাধনা, গণযোগাযোগ ও অনুসন্ধিৎসা ছাড়া লেখাপড়া ও জ্ঞানের বহমান স্রোত আটকে যায়। শ্যাওলা, কচুরিপানাসহ নানা আগাছায় মগজ গিজগিজ করে।

মেধা, সুস্থ চিন্তা ও মননের বিকাশ থেমে যায়। তখন মানুষের মনে নেতিবাচক নানা চাওয়া-পাওয়ার হিসাব জট পাকায়। ভুল পথে কেউ কেউ নিজের অবাঞ্চিত পাওনা আদায় উশুল করেও নেয়। সমকালীন বাস্তবতায় শিক্ষক সমাজ কোন বিচ্ছিন্ন মনোরম দ্বীপের বাসিন্দা নন। তাঁরাও এই সমাজের মানুষ। দোষ-গুণ থাকবেই। কিন্তু দোষটা অন্য সব সেক্টরের মত বিশেষায়িত ও স্পর্শকাতর শিক্ষা সেক্টরে সংক্রমণ ছড়ালে জাতিকে বড়বেশি মূল্য শুধতে হয়।

প্রাক বা প্রাথমিক স্তরে আনন্দ পাঠের মাধ্যমে ছাত্রদের নিজদের পছন্দের লেখাপড়ায় একবার আগ্রহ তৈরি করে দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কিন্তু শতভাগ সফল। উন্নত দেশগুলোতে তাই হয়। শিশুর কাছে নিজ আগ্রহের জগতের বন্ধ দরজা খুলে গেলে সে জিপিএ ৫ বা এ প্লাসের বাজির ঘোড়া হবেনা।

জ্ঞান ও প্রকৃত শিক্ষা আত্মস্থ ও চর্চা করে পেশাগত জীবন এবং রাস্ট্রের বড় সম্পদ হিসেবে নিজকে গড়ে নেবে। আবার কোরানে হাফেজ বা ক্বারিব মত না বুঝে মুখস্ত ও কারিকুলাম নির্ভর শিক্ষা একজন জিপিএ-৫ শিশুকে বানিয়ে দেয় মানব রোবট।

ক্যাম্পাস গুলো বেশি বেশি মানব রোবট উপহার দেয়ায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে অসংখ্য মানবিক সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। কথা হচ্ছে, আমরা কী সঙ্কটকে আদর দিয়ে পুষব, না উত্তরণের পথ খুঁজব? আমাদের কী জ্ঞান, সৃজনে টগবগে মেধা চাই, না কারিকুলাম নির্ভর রোবট চাই?

ঠিক করতে হবে শিক্ষা মন্ত্রককে। তারপরের দায়িত্ব শিক্ষকের। চলমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কেউ স্ব স্ব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেনা। না করায় ভুগছেন শিক্ষক, বেশি ভুগছে সমাজ ও রাস্ট্র।

সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষকদের মোটামুটি সম্মানজনক বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দেয়া হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গত মেয়াদ থেকে। সংখ্যাটা বিশাল। বাড়তি সম্মান ও সম্মানীর বিনিময়ে এঁরা রাষ্ট্রকে কী উপহার দিচ্ছেন, সম্ভবত মনিটরিংএর যথাযথ ব্যবস্থা নেই।

এই দায় রাস্ট্র বা শিক্ষক কেউ এড়াতে পারেনা। জিপিএ বা কারিকুলাম নির্ভর শিক্ষা মানব সম্পদ বা জ্ঞান নির্ভর মানুষ তৈরি করেনা, করে ভূয়া 'ইগো'র বিশাল লেজ! যা সম্পদ নয়, দায়। নিষ্ঠুর সত্য অস্বীকার করা মানে, মরুঝড়ে বালুতে উটের মত মুখ গুঁজে পড়ে থাকা। আর বেসরকারি শিক্ষা খাতে চলছে ভয়ঙ্কর এক নৈরাজ্য। শিক্ষা এখন কর্পোরেট বাণিজ্য। অগুণতি বেসরকারি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ! বাহারি নামের এলিমেন্টারি, কে জি তথা প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিকের ভিড় পাড়া-মহল্লা, গ্রামেও 'ঠাঁই নেই- ঠাঁই নেই' অবস্থা! করোনা বহু গ্রাস করলেও যেগুলো আছে, সেগুলোর পরিবেশ, জায়গা, পাঠক্রম, মান, শিক্ষক যোগ্যতা পুরোই নিজেদের পছন্দ নির্ভর।

মাদ্রাসা শিক্ষা বাদই থাক। যোগ্য, মেধাবী শিক্ষক যদি উপযুক্ত সম্মান ও সম্মানী না পান, তাহলে তিনি কীভাবে মহৎ পেশাটিতে তাঁর সর্বোচ্চটা ঢেলে দেবেন? আর কম বেতনের অযোগ্য শিক্ষক মানেইতো অসুখ! তিনি না জেনেও বেশি জানার বান করবেন!

পেশাগত অনিশ্চয়তায় ভুগবেন। শিক্ষায়তনের পাঠক্রমে কেন, নিজের সন্তানকেও নিশ্চিত ভুল শিক্ষা দেবেন। শিক্ষাঙ্গনের কর্পোরেট দানব নির্মূল ও ইগো নির্ভর শিক্ষকদের ঘন ঘন মোটিভেশানাল কর্মসূচিতে যুক্ত করে কিছু সুফল মিলতেও পারে। শেষ কথা হচ্ছে, নিবেদিত ও জ্ঞান নির্ভর শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষার পাঠক্রম আমূল সংস্কার ছাড়া জাতিকে আলোর ঠিকানায় তুলে আনা অসম্ভব।

মোস্তফা কামাল পাশা, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত