আমি বিশ্বাস করি না
রাজীব কুমার দাশ
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৫, ১৬:৩৪

চনমনে সকাল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা হীরাঝিল রাজপ্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাংলা বিহার উড়িষ্যা প্রজা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
' বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে। কে শোনাবে - আশার বাণী
কবিতাখানি। 'নবাবদেশে কেউ তাঁর কথা মানছে না। শোনছে না কেউ নবাবী ফরমান। একমাত্র গোলাম হোসেন ছাড়া নবাবের ভবিষ্যৎ সবাই যে যার মতো করে জেনে গেছেন। পলাশীর ময়দানে ইংরেজ মুখোমুখি দাঁড়াতে তারিখটা মীর জাফরের হাতে এখনো রয়ে গেছে। ইংরেজ দূতের পাঠানো তারিখ ও সময় ধরে,পরাজয়ের আনুষ্ঠানিকতা মেনে জনাব জাফর আলী খান নবাবকে জানিয়ে দেবেন। অভাবের অপমানের মতো করে গায়ে না মাখিয়ে স্বজনের অভাবও সেদিন নবাব সিরাজ কাউকে বুঝতে দেননি।
সেদিন ছিল বারে শনি। গ্রাম শহরে ইংরেজ সংস্কৃতি বেশে বেশকিছু খুনোখুনি লুটতরাজ ধর্ষণ দেখে স্বয়ং ইংরেজ সমাজসংস্কারক কবি সাহিত্যিক চিন্তক বুদ্ধিজীবি চিন্তিত হলেন। তাঁরা নবাব পরবর্তী সময় বিচারে বাংলা বিহার উড়িষ্যা ভাগ্যে; ইংরেজ বংশ পরম্পরা স্হায়ী ভাগ্যে স্হায়ীরূপে নিজেদের কোনোকিছু নাই দেখে, নিজেদের মনে প্রাণে সবাইকে ওয়ান টাইম প্রেম ভালোবাসার পশু কসাই বানিয়ে নিলেন।
ইংরেজ মনে যেমন ভাবা তেমন কাজ মনে, ধীরে ধীরে বাংলার জনগণ আইনের ব্যবচ্ছেদ গবেষণ মনে, নিজেরা নিজেদের মা বাবা ভাই বোন বউ বাচ্চা কাচ্চা মেরে সুবিধেমতো জায়গায় রেখে দিয়ে মহান শ্রেষ্ঠ বাদী ফরিয়াদী পুরস্কার জিতে নেন। নিজের মেয়ে কিংবা পুত্রবধূ নিজেই ধর্ষণ সেরে অসংখ্য নিন্দিত পুরস্কার জিতে মানব খচ্চর প্রজাতি পয়দা করেন।
এক সময়, বদ্বীপে নিজেদের নিরাপদ স্হান, ঘরবাড়ি ঠিকানা, ধর্মালয়, বিচারালয় বলতে নিজেদের কাছে নিরাপদ কোনোকিছু অবশিষ্ট রইলো না। যেটুকু সহায় সম্বল রইলো সেটুকু হলো- ধূর্ত বিনয়।
মানুষের এই স্বাভাবিক বিনয়কে বাঙালি জাতি বানিয়ে নেয় ধূর্ত বিনয়। বিনয়ে থাকে সারল্যতা চিন্তায় পরোপকার হৃদয় বন্ধন,পরিশীলিত চিন্তা প্রজ্ঞা; সর্বোপরি পরম হিতকর কল্যাণ। তার বাইরে এসে বাঙালি পারিবারিক বন্ধন বিনয় মানে, - ক্ষুধার্ত এক একজন নেকড়ে চতুর অজগর। ছাত্র-শিক্ষক পরম্পরা বিনয় মানে ছাত্র শিক্ষক মিথস্ক্রিয়া অধ্যয়ন বাদে যে যার মতো, মুনিব বানর লুকোচুরি খেলা। তারপরে একদিন বিনয় নামে," your excellency. " বিষাক্ত পরজীবি সিফিলিস ছত্রাক স্হায়ীরূপে বাংলার মসনদে এসে বিহার উড়িষ্যা বাদে দেশীয় বাংলা মগজ ছারখার করে দিলেন।
সেই সতের শ সাতান্ন সাল জুন পেরিয়ে,
ধীরে ধীরে বিহার উড়িষ্যা পেরিয়ে বদ্বীপে
জেঁকে বসল,বাঈজী মুন্নি সংস্কৃতি। সামনে
বিনয় পশ্চাৎদেশে লাথি সংস্কৃতি পেরিয়ে
এ বাঙালি জাতি বেশিদূর এগিয়ে যেতে
পারেননি।সামরিক স্কুল কলেজ ব্যারাক ছাউনিতে লেখা থাকে," কঠিন প্রশিক্ষণ, সহজ যুদ্ধ।" প্রাইমারি স্কুলে পড়ুয়া যে ছাত্রটি সহজে দু'য়ে দু'য়ে চার মেলাতে গিয়ে সহজ প্রশিক্ষণে বলে বসেন, " যত্তসব আজগুবি মার্কা কথা, আমি বিশ্বাস করিনা।
এক এক করে প্রাইমারি শিক্ষক ছাত্রকে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য মুকস্থ করালেও সে বলেন,- বিজ্ঞানের যুগে নিজের চোখে দেখিনি যখন আমি ওসবে বিশ্বাস করিনা একদম।
ইঁচড়েপাকা প্রাইমারি ছাত্র হাইস্কুলে যাবার পরে সাবালক হয়ে গেলেন। সে তার কোনোকিছুতে বিশ্বাস না করে চিরতরে বিশ্বাস হারা হয়ে গেলেন। কোনোকিছুতে নাই বিশ্বাসে সে একদিন তার জন্ম পিতাকেও অস্বীকার করে বসেন ।
পড়ালেখা নিয়ে সজীবকে তার বাবা জাফর আলী খান বকা দিতেই বলে বসেন, " তুমি কে? আমি কে?"
- আমি তোমার বাবা জাফর আলী খান।
- তুমি আমার একমাত্র সন্তান।
- তোমার আম্মি মুন্নি জান। বিশ্বাস না হয় যদি তোমার আম্মিজানকে জিজ্ঞেস কর?
সজীব বাপজান।না না না তা কোনোদিনও হতে পারেনা। আমি তা বিশ্বাস করিনা। আমি বিশ্বাস করিনা। বিজ্ঞানের যুগে প্রমাণ চাই। তোমরা কী ভাবে কী করে আমার বাপ মা হলে? তার প্রমাণ চাই। প্রমাণ ছাড়া আমি কোনোকিছু বিশ্বাস করিনা।
সজীবের বাবা মা থর থর করে কেঁপে চলেছে। বাবা জাফর আলী খানের কপালে চিন্তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘাম হঠাৎ করে দর দর কবিতা হয়ে ঝড়ে পড়েছে। তারা কী ই বা করবেন? সজীবের বিশ্বাস ফেরাতে তাকে জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়াদি রেকর্ড করা কোথাও নাই। এক সাঙ্ঘাতিক জটিল পরিস্হিতি দেখে, জাফর আলী খান ও মুন্নি দম্পতি টাইম ট্রাভেল নিয়েও বিস্তর বোঝালেন।
সজীবের একমাত্র উত্তর, " আমি বিশ্বাস করিনা। "
বদ্বীপের ঘরে ঘরে নাই আশা ভরসা বিশ্বাস সিরাজউদ্দৌলা হতাশার কতশত বছর পেরিয়ে গেছে। কেউও নবাব সিরাজের অভিশাপে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি।
আশা ভরসার শেষ চেরাগ নিভে গেছে।
সিরাজ বিলাপের শেষ কন্ঠস্বর বদ্বীপের
পথে ঘাটে কুকুর বেড়াল শেয়ালের মুখে মুখে, " নিয়তি ভাগ্যাকাশে দূর্যোগের ঘনঘটা। কে আমাদের একমুঠো খাবার দেবে? কে আমাদের বাঁচার নিশ্চয়তা স্বাধীনতা দেবে? দেশ পরিবারের মানুষকে বিশ্বাস করে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কী ই বা এমন ভুল করেছিল। তোমরা কে কোথায়?
আমাদের কথা এইবার বিশ্বাস কর।"বদ্বীপের ঘরে ঘরে নানান বেশে ফিরিঙ্গি ইংরেজ মোহাম্মদী বেগ, ঘসেটী বেগম, রবার্ট ক্লাইভ চিৎকার - না না প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে। না না বৎস! তোমরা কুকুর বেড়াল শেয়ালের কথা বিশ্বাস করনা। বদ্বীপের কোনো শক্ত প্রমাণ নাই। প্রমাণ ছাড়া বাঙালির কথা বিশ্বাস করতে নাই। বাঙালি নিজেও অন্যের কথায় নিজেদের জন্ম প্রমাণ নাই বলে দাবী করে বসেন। তাঁরা সহজ সরল বেকুব বলদ বলে বার বার নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে পৃথিবী দেশের নানান জনের দ্বারে দ্বারে তাঁদের জন্ম পরিচয় খুঁজে বেড়ান। তাঁরা এক একজন ফিরিঙ্গি ইংরেজ জাফর আলী খান ঘসেটী বেগম জগৎশেঠ বর্গি তুর্কি পরিচয়ে নিজেদের সেরাটা চিনিয়ে বার বার অসহায় সিরাজ সময় ডেকে নেয়। সে সময়ে তাঁরা সিরাজ সময়ের লুটপাট সেরে পালিয়ে যান। কেউ কেউ নতুন করে নবাব জাফর আলী খান মুন্নি বেগম হয়ে নতুন ফিরিঙ্গি ইংরেজ ডেকে দেশের সকলকিছু বিলিয়ে দেন।
কিছু দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা
হতাশা ভরসা কন্ঠে সেই হতে এই পর্যন্ত
বলে বলেছেন, " কে জ্বালিয়ে দেবে আশার
প্রদীপ ?
কে গাইবে ভরসা দরদী গান?
কে ভরিয়ে দেবে অন্নপূর্ণা হাতে সমৃদ্ধির মোহর;
কে বলবে গানে গানে কানে কানে আমায় ফেলে যেয়ো না খোকা;
তুমি দেশ ছেড়ে চলে গেলে হয়ে যাব একাকি সন্তান চিরকালীন একা। "নবাব সিরাজ সময়ের মতো করে,বার বার বদ্বীপের মাঠে ঘাটে পাহাড়ি জনপদ নদী নালা, সমুদ্র, দরিয়ানগর, খাল বিলে গগনবিদারী চিৎকার ভেসে আসছে খোলা মুখে আকাশে বাতাসেঃ
- না, না, আমি বিশ্বাস করি না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক প্রাবন্ধিক ও কবি। মেইল: [email protected]
বাংলাদেশ জার্নাল/এমপি










