ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০২:০৬

প্রিন্ট

‘নিন্মবিত্তের কষ্টের কথা যদি কেউ ভাবেন তবে পেঁয়াজ সিন্ডিকেট ধরুন’

‘নিন্মবিত্তের কষ্টের কথা যদি কেউ ভাবেন তবে পেঁয়াজ সিন্ডিকেট ধরুন’
ঢাবি প্রতিনিধি

যে পেঁয়াজের থাকার কথা ছিল রান্না ঘরের ঝুরিতে আর দোকানীর ডালাতে, সে এখন দেশময় আলোচিত। যা বিক্রি হত কেজিতে তা এখন দরদাম চলছে হালিতে! অত্যন্ত দামি ও মূল্যবান বস্তু বুঝাতে কেউ কেউ নারীর জন্য পেঁয়াজের অলংকার বানিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছেন এক ধরণের প্রতিবাদ হিসেবেই। পেঁয়াজ নিয়ে এই গোলকধাঁধার রহস্য কী? এ নিয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।

আলাপচারিতায় ছিলেন সাইফুল ইসলাম খান।

‘বছর দশেক আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি সমিতি থেকে একটি সম্মেলন হয়েছিল। সেই সম্মেলনে আমি উদ্বোধনী বক্তৃতা রেখেছিলাম। যার শিরোনাম ছিল- পেঁয়াজের রাজনৈতিক অর্থনীতি! লোকজন খুব হাসাহাসি করছিল যে, পিঁয়াজের আবার রাজনৈতিক অর্থনীতি কি? কাজেই এ রকম একটা অবস্থা ১০-১২ বছর আগেও ঘটছিল। সেখানে আমার বক্তব্য ছিল- আমাদের এখানে নানা সময়েই বহু জিনিসের মধ্যে একটা সিন্ডিকেশন তৈরি হয়। এর সঙ্গে খুব বেশি লোক জড়িত থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ করে এক-একটা জিনিস হয়, সিন্ডিকেশন হয়। মাঝখান দিয়ে কেউ বা ওই সিন্ডিকেট একটা বড় অর্থ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়।’

‘অনেকে এটাকে মার্কেট ইকোনমি (বাজার অর্থনীতি) বলতে পারে, কিন্তু আমার মতে এটা মার্কেট ইকোনমি না। অথবা সেই মার্কেট ইকোনমি না যেই মার্কেট ইকোনমিতে প্রতিযোগিতার মধ্যে জিনিসের মূল্য নির্ধারিত হবে। এই ধরণের ঘটনার নাম হচ্ছে মার্কেট ডিসটরশন (বাজার বিকৃতি)। বাজার বিকৃতি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক বিষয়ও হওয়ার কথা। আমাদের এখানে একটু অন্য রকম। স্বাভাবিক বিষয় এই জন্য যে, বাজার বিকৃতি যদি না থকত তবে রাষ্ট্রের যে হস্তক্ষেপ এই প্রসঙ্গটাও থাকত না।’

‘বাজার বিকৃতি অনেক কারণেই হতে পারে। যদি সচেতনভাবে বাজার বিকৃতি ঘটে তাহলে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। রাষ্ট্রের রেগুলেটরি কর্মকাণ্ড যাকে বলে। সরকার চাল কেনে, ধান কেনে। সরকারের তো ধান কেনার দরকার নাই। তারপরেও সরকার ধান কিনে কেন? মজুদ করে কেন? কারণ বাজারে যদি কখনো চালের সংকট হয়, তখন সরকার তার গুদামগুলো খুলে দেয়। বাজারে চাল ছেড়ে দিলে চাহিদা ও যোগানের নিয়ম অনুযায়ী একটা স্থির অবস্থা বজায় থাকে। বাজার বিকৃতি ন্যাচারাল (স্বাভাবিকভাবে) যদি নাই হবে তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা থাকারই কথা না। যেহেতু এগুলো আছে সেহেতু আপনাকে মেনে নিতে হবে যে, বাজার বিকৃতি হয়। এই বাজারের বিকৃতিটা যদি সচেতনভাবে কোন গ্রুপ করে থাকে সেটাকে আমরা সিন্ডিকেট বলি।’

‘আমার প্রশ্ন হল- বাজারে কি পেঁয়াজ নাই? আপনি কি বাজারে গিয়ে পেঁয়াজ পান না? বাজারে কি আপনি পেঁয়াজ কম দেখছেন? আমি তো তাও (কম) দেখি না। ধরুন- আমি কোন অর্থনীতিবিদ না। আমি পলাশী বাজারে যাই। আমি যে জায়গা থেকে পেঁয়াজ কিনতাম সেই জায়গায় যতটুকু পেঁয়াজ দেখতাম তার চাইতে এখন কম দেখছি না। তাহলে পেঁয়াজ যে কম এটা তো ঠিক না। পেঁয়াজ আছে কিন্তু দাম বেশি। যদি এমন হত ১০টা লোক পেঁয়াজ বেচত এখন কমে গেছে, একটা লোক বেঁচে; তাও তো না। বাজারে পেঁয়াজ কম থাকলে দাম বাড়বে, কিন্তু এখানে তো ঘটনা তা নয়। যোগান যদি একই রকম থাকে আর দাম যদি দেড়শ টাকার দিকে চলে যায়, তাহলে কোথাও কোন বড় গলদ আছে। কোথায় এই গলদ হচ্ছে? আমি বলছি- এটা সিন্ডিকেট। পেঁয়াজের রাজনৈতিক অর্থনীতি শুরু হয়েছে। এখন পেঁয়াজের ভিতর থেকে কেউ হয়ত শত কোটি টাকা, হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছেন।’

‘সরকার যেহেতু নিজেই বলছে- পেঁয়াজের যোগান ঠিক আছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী পেঁয়াজ আছে। তাহলে দাম বাড়ছে কেন? চাহিদা ও যোগানের যে সূত্র সেটা কি কাজ করছে না? কাজ যদি না করে তাহলে অন্য জায়গায় করছে কেন? কোথাও কোন ঝামেলা হয়েছে। ঝামেলাটা খুঁজে বের করেন। আমার ধারণা হচ্ছে- ঝামেলাটা সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের খুঁজে বের করা উচিত। এখন তো দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চলছে, ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান চলছে। এটা (পেঁয়াজ সিন্ডিকেট) তো বড় ধরণের দুর্নীতি।’

‘পেঁয়াজ তো ফ্রেঞ্চ পারফিউম না যে, না হলেও চলবে। পেঁয়াজ খাওয়ার জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। পেঁয়াজ ছাড়া বাচ্চারা রান্না খেতে পারে না। খাদ্যাভ্যাস তো পরিবর্তন করতে পারবে না। বাঙালী, গরীব মানুষ ভাতের সঙ্গে মরিচ, একটু পেঁয়াজ, ডাল এবং বাড়ির আঙ্গিনার শাক সবজিই তো খায়।’

‘এত এত সিন্ডিকেট আপনারা ধরতে পারেন কিন্তু পেঁয়াজ একটা জিনিস যার সিন্ডিকেট পাওয়া যাচ্ছে না- এটা তো গ্রহণযোগ্য না। মূলকথা হচ্ছে- বাজার বিকৃতি হয়েছে। এটা সৃষ্টি করেছে সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটকে শক্ত হাতে ধরা দরকার। মানুষ পেঁয়াজ বাবদ যে অতিরিক্ত ব্যয়টা করে ফেললো, দেশের বেশির ভাগ মানুষই তো গরিব, নিন্মবিত্ত। তাদের কষ্টের কথা যদি কেউ ভাবেন তাহলে সিন্ডিকেট ধরাই যথেষ্ট হবে না। এ ধরণের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তার জন্য বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এই কাজটা সরকারের।’

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত