ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ আপডেট : ৬ মিনিট আগে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

  সাঈদ চৌধুরী

প্রকাশ : ১২ জুন ২০২২, ২২:২৩

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
সাঈদ চৌধুরী

শিশু মামুনের সাথে কথা বলছিলাম। কালো ছিপছিপে দেহ, ঠোঁট শুকিয়ে আছে। গায়ে একটা শর্ট প্যান্ট পরে থাকা ছেলেটি গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করছে। তখন রাত প্রায় ১২টা বাজে। মামুনের সাথে আরও কয়েকজন শিশু এসে দাঁড়ালো।

মামুনকে জিজ্ঞেস করার পর জানা গেল সে শ্রীপুরেই থাকে। তার আরেক ভাইও ময়লারই কাজ করে। সারাদিন দোকানগুলোতে জমিয়ে রাখা ময়লাগুলো মামুন ও তার সঙ্গী অনায়াসে খালি হাতে ধরে ধরে ময়লার ভ্যানে তুলছে। সে ময়লাগুলোতে সব ধরনের ময়লা আছে। একদিকে যেমন পঁচা খাবার আছে তেমনি ফলের খোসা, ওষুধের খালি বোতল, ওষুধের প্যাকেট, স্যালাইনের প্লাস্টিকের প্যাকেট, ক্লিনিকের গজ, ব্যান্ডেজসহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের ময়লা আছে। কিছু ময়লা পচে এত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিলো যে, কাছে থাকার কোনো উপায়ই নেই। অথচ ওদের কাছে তেমন কিছুই মনে হচ্ছে না।

মামুনকে জিজ্ঞেস করার পর ও জানালো ময়লার কাছে থাকতে থাকতে ওদের এখন আর এগুলো দুর্গন্ধ মনে হয়না। মামুনদের মতো কিশোররা যারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে জড়িত, তাদের বেশির ভাগ কিশোরই ধূমপান ও নেশার সাথে জড়িয়ে যায়।

ডাস্টবিন হিসেবে আমাদের দেশে এখনও রাস্তার পাশের জায়গাকেই বেছে নেয়া হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। শ্রীপুরের মতোই অন্যান্য জায়গায়ও শিশু-কিশোররাই ময়লা আনা নেয়ার এ কাজের সাথে জড়িত। এর ফলে এই শিশুরা যে পারিশ্রমিক পায়, সে পারিশ্রমিকও এদের জীবনের জন্য তেমন কোনো উপকারে আসেনা।

মামুনসহ আরও কয়েকজনের সাথে কথা বলে ওদের অসুস্থতার কথা জানা গেল। অনেক সময়ই ওরা পেটের সমস্যায় ভোগে, খাওয়ায় অরুচি থাকে আর এ কারণেই তাদের যাতে হাতে গন্ধ অনুভব করতে না হয়, সেজন্য নেশার দিকে ধাবিত হয় তারা। বেশিরভাগ শিশুই ধূমপান করে খুব সাবলীলভাবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে যারা সম্পৃক্ত, বিশেষ করে, শিশু-কিশোররা তাদের ব্যাপারে সরকারসহ আমাদের সকলের এখনই মনোযোগী হওয়া খুব বেশি প্রয়োজন।

সরকার শিশুদের নিরাপত্তায় অনেক কাজ, প্রকল্প এবং বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় একসাথে হয়েও অনেক কাজ শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গতিশীল রেখেছে। মূলত সুবিধাবি ত শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দুইটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর। প্রকল্প দুটি হচ্ছে, চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প এবং সার্ভিসেস ফর দ্যা চিলড্রেন এট রিস্ক। সেনসিটিভ সোস্যাল প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্পটি দেশের বিশটি জেলার নারী, শিশু ও যুবাদের নিয়ে কাজ করেছে। প্রথম প্রকল্পটিতে পথ শিশুদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার বিষয়ে নির্দেশনা ছিলো।

দ্বিতীয় প্রকল্পে কম্পোনেন্ট ১ এ স্পষ্ট করেই বলা আছে কর্মজীবী শিশুদের কথা, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিশু সুরক্ষাকল্পে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠিত করা এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করে কেইস বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা, আবাসন, কাউন্সেলিং এবং পুনঃএকীকরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু এসব বিষয়গুলোতেও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। যারা প্রকৃতপক্ষে ময়লার ভাগাড়ে শ্রম দিচ্ছে, তাদেরকে খুঁজে এনে পুনর্বাসন করা যেমনি কঠিন, তেমনি এরা এদের নিজেদের এ কাজ থেকেও সরে আসতে চায়না। এর ফলে এদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমনি বাড়তে থাকে, তেমনি এদের ভেতর স্বাভাবিক জীবন যাপন করার ইচ্ছাশক্তিও মরে যায়। তলিয়ে যেতে থাকে এরা আসক্তি আর বিষন্নতার গভীর অন্ধকারে।

২০১১ সালের শিশু নীতির ৬.২. এ শিশুর দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বলা আছে; শিশুর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, সার্বিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়কে অগ্রাধিকার প্রদান করার বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু যে শিশুরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে কাজ করছে, তাদের কত শতাংশ শিশু এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের কার্যক্রমে যুক্ত হতে পেরেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এবং বাস্তবায়ন সে অর্থে নেই।

সরকারের ভালো ভালো প্রকল্প শিশুদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখলেও কিছু কিছু জায়গায় আরও বেশি করে ভাববার এবং মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন আছে। যারা বর্জ্যব্যবস্থাপনার সাথে কাজ করছে, সেসব শিশুদের ব্যাপারে সরকারের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যমাত্রা নিতে হবেই। তা না হলে সকল শিশুদের নিরাপত্তা এবং অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি অসমাপ্তই থেকে যাবে।

যাদের বয়স কম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ পেশা থেকে তাদের বের করে ঝুঁকিমুক্ত অন্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত করে দিতে হবে এবং যারা ষোল বছরের উপরে, তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। ময়লা সংগ্রহের সময় তারা যাতে সঠিক পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট) ব্যবহার করে, সেটা ইউনিয়ন পরিষদ অথবা পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করতে হবে। নেশার সাথে জড়িয়ে পড়া, ধূমপানে আসক্ত হওয়ার মতো ঘটনা থেকে বের করে আনতে কাউন্সিলিং বাড়াতে হবে কেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক। এ পেশায় জড়িত শিশু-কিশোরদের মারাত্বক নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের অন্যান্য সংক্রমণের আশংকা থাকে। অনেকসময় এই ধরনের নিউমোনিয়া এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে থাকে, যার কারণে তাদের জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

যেহেতু বর্জ্যে রাসায়নিক মিশ্রণ আছে, এমন দুষিত বায়ুর সং¯পর্শে থেকে চোখ, নাক বা গলার সংক্রমণ বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেসঙ্গে ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো ফুসফুসের নানাবিধ জটিলতা, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে এ পেশার সাথে অনিরাপদভাবে জড়িত মানুষদের, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের।

বর্জ্যদূষিত এলাকা, যেখানে সীসা দূষণেরও ঝুঁকি রয়েছে, এমন এলাকায় কাজ করা শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশসহ এবং স্নায়ুবিক ক্ষতি হতে পারে। এ সাথে রয়েছে অবসন্নতা, মাদকাশক্তিসহ হতাশাজনক বিষাদময় জীবন। ভাগাড়গুলো থেকে যে মিথেন গ্যাস নিসৃত হয়, যারা এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত, তাদের আরও বেশি করে ¯œায়ুবিক দুর্বলতা সৃষ্টির আশংকা থাকে। যাতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সাথে তার পরিবারও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাও এই শিশুদের টিকে থাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সবকিছু মিলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত শিশু-কিশোরদের নিয়ে ভাবা এবং এদের নিরাপত্তায় সরকারের মনোযোগী হওয়া এখন সময়ের দাবী। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারসহ এ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগী হলে ছিন্নমূল শিশুদের নিরাপত্তা যেমনি বাড়বে, তেমনি দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ সরকারের কাজকে করবে আরো বেগবান ও ফলপ্রসূ। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং এ সাথে জড়িত সকল পর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারসহ সকল সরকারি বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বোচ্চ মনোযোগ, গুরুত্ব এবং প্রাধান্য অবশ্যই দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতসহ আামদের অস্তিত্ব রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে শুধু আমাদের সচেতনতা এবং এগিয়ে আসা। (পিআইডি ফিচার)

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত