ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

মানুষের অভাব চলে গেলেও স্বভাব যায় না মলে

  রাজীব কুমার দাশ

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৬:২৭

মানুষের অভাব চলে গেলেও স্বভাব যায় না মলে
প্রতীকী ছবি

কবিগানের পয়ার-

শোনেন দিয়া মন

রাজার চোখে রাজ্য থাকে

প্রজা সুখে রাজা মন

সুখ সৌন্দর্য্য ঘিরে রাখে যখন তখন।

শকুনি নজর নীচে থাকে

চামচিকা মন

চাইলেও প্রজা রাজা হতে পারেনা

যখন তখন।

সাব-ইন্সপেক্টর সময়ে পেশাগত নানান কাজের বিনিময়ে সুনাম কর্মসূচিতে অন্যদের মতো আমিও অংশগ্রহণ করতাম। ভয়ঙ্কর আন্তঃজেলা ডাকাত সাধু চোর খুনি মাস্তান যাদের ধরতে গেলে পুলিশের পরপারে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে; ধরলেও জেলে রাখা যায় না এমন। ভয়ঙ্কর রকমের অপরাধীরা পুলিশ নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তাদের খোলাবুকে প্রেমিকার নাম লিখে সস্তা দামি লকেট ঝুলিয়ে নানান অপরাধ করে নিজেদের সেরাটা চিনিয়ে বাজিমাত করেন।

পুলিশের কী ই বা এমন করার আছে? পেশাদার পেশাদারিত্ব যদি অপরাধীর চাইতে বেশি না থাকে; তাৎক্ষণিক আইনসিদ্ধ সিদ্ধান্ত বুদ্ধিমত্তা কৌশল যদি অপরাধীর চাইতে বেশি না হয়, অপরাধীরা চা দোকানে বসা টুলে পা উঠায়ে বলেন,"এই ওই অমুক তমুক থানার ওসি দারোগারে আমার বউ শালির পেটিকোট ধুয়ে দিতেও রাখি না। দলনেতা সর্দার একধাপ এগিয়ে জিহ্বাস্ত্র মেশিনগানের গুলি ছুঁড়ে বলেন, আমার নীচের...কামিয়ে দিতে ও রাখি না।"

তখনি শুরু হয় আসল বিপত্তি। আর্থিকভাবে একটু করে ভালো থাকা জনগণ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থানা সদর উপশহর শহরে বাসা ভাড়া নেন। নিজের দেশে থেকে পরবাসী মনে কোনোমতে নিজেদের সন্মান ইজ্জত বাঁচিয়ে চলেন।

যে কোনো এক থানায় আমার পোস্টিং। এসপি সাহেব নতুন এসেছেন। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ করে ডাকাত সর্দার আটত্রিশ মামলার পলাতক ফেরারি একমাত্র বুকভরা সাহসে পিস্তলসহ ধরে ফেললাম। তার ঘুষি কৌশল চিৎকার হজম করে রক্তাক্ত হলাম। পৃথিবীর কথিত ভন্ড মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সাধারণ জনগণকে ডাকাত ধরার কাজে উৎসাহ দিলাম। কাগজেকলমে ওসি সাহেব সার্কেল মহোদয় এমন সফল অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন। এসপি সাহেব সবকিছু তাঁর মতো করে জেনে শোনে পেশাদার বিশ্বস্ত মনে করে, ওসি সাহেবের দিয়ে বন্ধের দিনে জেলা সদর বাংলোতে ডেকে নিলেন। বসে বসে পেশাদার সন্ত্রাসী তালিকা মেলালাম।

ঠিক দুপুর দুটো নাগাদ হবে। খাবার পাতে আমাদের খাবার দিয়ে এসপি স্যার উঠে গেলেন। তাগড়া যৌবন পেটে দস্যি খিদে বলে চলেছেন, "খা খা সবকিছু খা। লুটে পুটে চেটে খা।"

যা ভয়ঙ্কর মনে চিন্তা করেছি, তা ই হলো। আমি ভাত তরকারি নানান রেসিপি না খেয়ে সামান্য দই খেলাম। বাকি খাবারের সিংহ ভাগই খালি হয়ে গেছে তখন।

ছেলেবেলা দাদু মুখে শোনা কথা। আগের দিনে, বৃটিশ সরকার তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বনেদী পরিবার হতে লোক এনে বসাতেন। তার কারণ, পরে এসে জেনেছি, ওইসব মর্যাদাবান পদে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের কোনোকিছুতে লোভ নেই।

লোভ থাকলেও জীব হিসেবে তাঁদের মৈথুন লোভ ব্যতীত বৈষয়িক লোভ অনেকাংশে কম। পরের কয়েকবছর পরে এস,পি স্যার ডিআইজি পদে থেকে আমায় ডেকে নিলেন। নানান গল্পের ফাঁকে সেদিনের খাবার গল্প তুলে প্রশ্ন করে বলেন,"আচ্ছা তুমি ওদিন খাবার খাওনি কেন?"

আমি রাখঢাক না রেখে বললাম, "স্যার। খাবার হলো অনেক সন্মানের। আপনি না খেয়ে পাশের রুমে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলেছিলেন। আপনি না খেয়ে আমাদের খেতে দিলেন? খেলে হতো এক রকমের ধৃষ্টতা। এ ছাড়া আমি মনে প্রাণে ফ্রি না হলে কারোর বাসা বা নিমন্ত্রণে খেতে পারিনা।"

নানান জায়গায় ডাকাত কিংবা অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসী ধরতে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন, নারী মদ ও সুস্বাদু আহার। আরো কিছুদিন পরে প্রিয় স্যার রাগ করে কোনো এক স্হানে, আমার দাদু মুখের অমিয় বাণী বলে বসলেন, "কথা শোন। বৃটিশ সরকারের রাজকীয় পদে বৃটিশ সরকার কস্মিণকালেও মাছ চাল ডাল তরকারি বেপারি নাপিত সুইপার ঝাড়ুদার মাদক ব্যবসায়ী, সুদখোর, কসাই, দিনমজুর, কুলি, ডাকাত, চোর, সন্ত্রাসী, কাঠকুড়ানি পরের বাড়িতে বুয়াগিরি করে পড়ালেখা করা সন্তানদের নিয়োগ দিতেন না।"

মানুষের শরীরে বয়ে চলা জন্ম রক্তে ইচ্ছে স্বভাব মানুষ বদলে দিতে পারেন কম।

"মানুষের অভাব চলে গেলেও স্বভাব যায়না মলে।"

পৃথিবী সময়ের খাতায় খাবার পাতে চরম পেশাদার হলে মানুষ টিকে থাকেন। মাঝে মাঝে ভাবি, খাবার পাতে প্রিয় স্যার আমাদের পরীক্ষা নিয়েছেন..?

লেখক: কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কবি। মেইল: [email protected]

  • সর্বশেষ
  • পঠিত