ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৪

প্রিন্ট

যেভাবে স্বাবলম্বী দুখী ফাতেমা

যেভাবে স্বাবলম্বী দুখী ফাতেমা
অনলাইন ডেস্ক

মাত্র ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল ফাতেমার। বিয়ের দশ বছরের মাথায় স্বামীকে হারান তিনি। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা ফাতেমা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই বড় হয়েছেন। সুখের পরিবর্তে দুঃখেই দিন কেটেছে তার। ক্ষুধার যন্ত্রণা না সইতে পেরে খেজুর গাছের রসও চুরি করে খেয়েছেন তিনি। এখন চাষাবাদসহ বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট সার বিক্রি করেই স্বাবলম্বী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বলাকান্দর গ্রামের ফাতেমা বেগম।

বলাকান্দর গ্রামের শিরিষ খালপাড়ার সরকারের খাস জমির ঝুপড়ি ঘরে স্বামী আর সন্তানদের নিয়েই থাকেন তিনি। বড় ছেলে কায়েম আলী এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট মেয়ে তৃপ্তি খাতুন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

এ প্রসঙ্গে ফাতেমা বলেন, সংসারে সচ্ছলতার জন্য অনেক সংগ্রাম করেছি। রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বামী মারা যায়। এরপরই সংসারে নেমে আসে অন্ধকার। সন্তনিদের নিয়ে অনাহারে অথবা অর্ধাহারে দিন কাটে আমার। বিধবা হওয়ার পর শ্বশুর-শাশুড়ি আর দেবরের নির্যাতনের টিকতে না পেরে রাতের আঁধারে শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে আসি। বাবার বাড়িতে অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে কেটে যায় পাঁচ বছর। পরে আবার বিয়ে হয় পাশের ষাটবাড়িয়া গ্রামের আশরাফুল হাদির ছেলে ইকবল হোসেনের সঙ্গে।

কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে করেও মুক্তি মেলেনি ফাতেমার। কেননা স্বামী মাদকাসক্ত। শিরিষ খালের পাড়ে সরকারি খাস জমিতে টিনের ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতে থাকেন। মাদকাসক্ত স্বামীর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পালাতে চাইলেও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু সহ্য করেন।

এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় শুরু হয় ফাতেমার সংগ্রামী জীবন। ধৈর্য এবং সততার সঙ্গে নিজ কর্ম প্রচেষ্টায় এখন দিন পাল্টে গেছে তার। বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করে বিক্রি করেন। এ কাজের মাধ্যমে ফাতেমা সংসারে সুখ ফিরিয়েছেন।

২০০৫ সালে মাত্র একটি চাড়িতে কেঁচো দিয়ে শুরু করেন জীবনযুদ্ধের পথচলা। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। এখন তার ৩৫০টি চাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি হচ্ছে। সেখান থেকে উৎপাদিত সার ও কেঁচো বিক্রি করে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করেন। সেই টাকা দিয়ে মাঠে প্রায় ১ বিঘা জমি কেনা ছাড়াও সাড়ে ৯ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান, গম, সরিষা, লাউসহ বিভিন্ন সবজির চাষ করে এখন ভালোই চলছে তার সংসার।

ফাতেমা টিনের ছাউনির একটি লম্বা ঘরে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক গোবরভর্তি মাটির চাড়িতে কম্পোস্ট তৈরি করেন। যার ভেতরে ছেড়ে দেয়া রয়েছে লাল রঙের এক জাতীয় কেঁচো। কেঁচোগুলো চাড়ির ভেতরে একদিকে বংশ বিস্তার করছে অন্যদিকে গোবর খাওয়ার পর শুকিয়ে তৈরি হচ্ছে অধিক উর্বর কেঁচো কম্পোস্ট সার। এই সার ফসলি ক্ষেতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

ফাতেমা বেগম জানান, রাসায়নিক সার অত্যন্ত ব্যয়বহুল তাছাড়া সার দিয়ে উৎপাদিত ফসল খেয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া রাসায়নিক সার জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ২০০৫ সালে জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাঙ্গার-ফ্রি ওয়ার্ল্ডের প্রশিক্ষণশালা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট সারের উৎপাদন শুরু করেন।

প্রথম দিকে নিজের গরু না থাকায় গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর কুড়িয়ে ও কিনে কম্পোস্ট সার তৈরি করতেন। সে সময় লাভ অনেকটা কম হতো। বর্তমানে তার ৩টি গরু। ফলে বাইরের গোবরের আর প্রয়োজন হচ্ছে না। প্রতি কেজি সার ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করছেন। আর কেঁচো বিক্রি করছেন কেজি প্রতি ১ হাজার টাকা থেকে ১২০০ টাকা। যেখান থেকে প্রতি মাসে তিনি কমপক্ষে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকার সার ও কেঁচো বিক্রি করতে পারছেন।

এছাড়া ধান, গম, সরিষা, গলা, ঝাল, লাউসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করছেন। যা দিয়ে এখন ভালোভাবে তার সংসার চলছে। বাবার অভাবের সংসার থেকে স্বামীর সংসার পর্যন্ত কখনও অভাব পিছু ছাড়েনি। স্বামীর সংসারে এসে প্রথমে বেশ কিছুদিন হতাশার মধ্যে জীবন চলত। পরে তিনি ভেবেছিলেন, নিজে উৎপাদনশীল কোনো কাজ করবেন, যা দিয়ে সংসারের গতি ফেরাতে পারবেন। তার এ ভাবনা অনুসারেই সুযোগ পেয়ে কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এরপর নিজ বাড়িতেই শুরু করেন কম্পোস্ট সার তৈরির কাজ।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, তিনি ফাতেমা বেগমের কৃষি ও কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন পদ্ধতি নিজে দেখেছেন। একজন কৃষাণীর নিজ চেষ্টায় শূন্য থেকে সফলতা অর্জন দেশের কৃষক ও কৃষাণীদের জন্য অনুকরণীয়। যখন দেশের অগণিত কৃষকেরা কৃষিকাজে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করে জমির উর্বর ক্ষমতা হ্রাস করছে, সেসময় ফাতেমার জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ সবাইকে চমকে দিয়েছে। ফলে এক দিকে যেমন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করে পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে অন্যদিকে কৃষিকাজে খরচ সাশ্রয় হচ্ছে।

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত