সারাদেশে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-দোকান-উপাসনালয়ে হামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৪, ১০:২০ আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৪, ১০:২৩

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ি, উপাসনালয়সহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকার ধামরাই, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরে হিন্দুদের মন্দিরে এবং যশোর, নোয়াখালী, মেহেরপুর, চাঁদপুর ও নাটোর, খুলনায় বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে।
যশোর: যশোরে অর্ধশত হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ভয়ে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও বাড়ির কয়েকজন মালিক বলেন, গতকাল বিকেলে কয়েক শ লোক বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া বাজারের অন্তত ২৫টি দোকানে হামলা চালায়। এর মধ্যে ২০টি দোকানের মালিক হিন্দু। হামলাকারীরা দোকান ভাঙচুর করে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এরপর রাতে ১০ থেকে ১২ জন রামদা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের লিটন কুন্ডুর বাড়িতে ঢোকে। তারা অস্ত্রের মুখে বাড়ির লোকজনদের জিম্মি করে তিন ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ দুই হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে যায়। আজ সকালে একই গ্রামের শিমুল সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় তারা বাড়ির লোকজনের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরে নারিকেলবাড়িয়া বাজারে গিয়ে হিন্দুদের অন্তত তিনটি দোকান ভাঙচুর করে।
নারিকেলবাড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহা বলেন, হামলাকারীরা বাজারে আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় বাজারের অন্তত ২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করা হয়। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন।
নোয়াখালী: নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় কয়েকটি স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিনটি বাড়িতে ও চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উপজেলার সোনাদিয়ায় উপজেলা হিন্দু পরিষদের সভাপতি সহদেব সাহার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি নারীদের মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্যাতনের শিকার পরিবারের পক্ষ থেকে হাতিয়া থানায় ও কোস্টগার্ডকে ফোনে জানানো হলেও কেউ ঘটনাস্থলে যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তমরুদ্দি বাজার সংলগ্ন গ্রামের সাহাপাড়ার দিলীপ সাহার বাড়ি, লোকেশ সাহার বাড়ি এবং সোনাদিয়া ইউনিয়নের উপজেলা হিন্দু পরিষদের সভাপতি সহদেব সাহার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় একদল দুর্বৃত্ত। এরপর তারা তমরুদ্দি বাজারে আশোক সাহার দোকান, পার্থ সাহার দোকানসহ তিনটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। হামলাকারীরা স্থানীয়ভাবে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
উপজেলা হিন্দু পরিষদের সভাপতি সহদেব সাহা বলেন, তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছে স্থানীয় বিএনপির কর্মী মুন্না ও রাজুর নেতৃত্বে। বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি তাঁর মাকেও মারধর করা হয়। একই হামলাকারীরা চর চেঙ্গা বাজারে তাঁর দোকানে হামলা-ভাঙচুর চালায় এবং মালামাল ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, কিছু কিছু জায়গায় আওয়ামী লীগের লোকজন হিন্দুদের বাড়ি ঘরে হামলা চালিয়ে বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে। তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলবেন।
ঢাকার ধামরাই: ঢাকার ধামরাইয়ের গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বারবাড়িয়া এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে স্থানীয় মীনা রানি দাসের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়ির লোহার মূল ফটক ভাঙচুর করেন। টিনের ঘরে ঢোকার ফটকটি ভাঙেন। বাড়ির বারান্দার পাশে থাকা তিনটি কক্ষের তিনটি জানালার কাচ, দুর্গা মন্দিরের সামনে কয়েকটি চেয়ার আর বাড়ির বাইরে থাকা গ্যারেজের দুটি প্রাইভেট কারের সব কাচ ভেঙে ফেলে হামলাকারীরা।
এ বিষয়ে মীনা রানি দাস বলেন, হঠাৎ করে ১০০ থেকে ১৫০ জন লোক আসলো। আইসাই ভাঙচুর শুরু করল। ভয়ে চুপ করে অন্য ঘরে ছিলাম। অনেক গালাগালি করছে। মন্দিরের সামনে গিয়ে মন্দির ভাঙার চেষ্টা করছে। কিন্তু তালা ভাঙতে পারেনি।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা: পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অনন্ত মুখার্জির বাসভবন এবং পাশের এলাকায় থাকা মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অনন্ত মুখার্জির অভিযোগ, সরকারের পদত্যাগের খবর শুনে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা কুয়াকাটা পৌরসভায় একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি আমার বাসার দিকে আসে। একপর্যায়ে মিছিল থেকে লোকজন আমার বাসায় হামলা চালায়। হামলাকারীদের অনেকে আমার বাসায় ঢুকে পড়ে। বাসার প্রতিটি জিনিস ভেঙে চুরমার করেছে। আমার বাসার কোনো কিছুই রক্ষা হয়নি। এরপর হামলাকারীরা আমার বাসার পাশের মন্দিরটিতে হামলা চালায়। এতে মন্দিরের দরজা-জানালার ক্ষতি হয়েছে।
নাটোর: নাটোরের লালপুরে পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতির বাড়িসহ ছয়টি বাড়ি ও একটি মন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।
উপজেলার জোতদৈবকী শিব ও কালীমন্দির কমিটি সূত্রে জানা যায়, একদল লোক উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও মন্দিরটির সভাপতি স্কুলশিক্ষক দ্বীপেন্দ্রনাথ সাহার বাড়িতে হামলা করে। তারা তাঁর বাড়ির একটি ফটক ভেঙে ফেলে। তবে দ্বিতীয় ফটকটি ভাঙতে না পারায় বাইরে থেকে জানালা ভেঙে ফেলে। এরপর তাঁর ভাই নরেশ চন্দ্র সাহা ও প্রতিবেশী শিমুল সরকারের বাড়িতে হামলা করা হয়। তারা দরজা ভেঙে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
নরেশ চন্দ্রের দাবি, দুর্বৃত্তরা তাঁর বাড়ি থেকে লক্ষাধিক টাকা, চার ভরি স্বর্ণের গয়না, ল্যাপটপ, মুঠোফোন, চালের বস্তা লুট করে নিয়ে যায়।
মেহেরপুর: মেহেরপুরে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িসহ হিন্দুদের ৯টি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার দুপুর থেকে এসব ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার সকালে দেখা যায়, পৌর শহরের হোটেল বাজার এলাকার বাসিন্দা ও জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক পল্লব ভট্টাচার্যের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। তাঁর দোতলা বাড়ির নিচতলা একেবারে পুড়ে গেছে। সেখান থেকে বই, আসবাব থেকে পোড়ার গন্ধ বের হচ্ছে।
এ সময় পল্লব ভট্টাচার্যের চাচাতো ভাই অঞ্চল ভট্টাচার্য বলেন, ‘দাদা মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি। তাঁর বড় মেয়ে প্রিয়া ভট্টাচার্য সপরিবার জাপানে থাকেন। নবজাতক নাতিকে দেখতে তিনি জাপানে গেছেন। যখন দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়, তখন বাড়িতে কেউ ছিলেন না।’
একই সময়ে বড় বাজার এলাকার চিত্ত সাহার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। ওই দোকান থেকে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
দিনাজপুর: দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার ঈশানিয়া ইউনিয়নের চৌরঙ্গী বাজারে সংখ্যালঘুদের অন্তত ৪০টি দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে অন্তত ১০০ জন দলবদ্ধ হয়ে বাজারে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালিয়েছেন। পরে বাজারসংলগ্ন সহসপুর গ্রামের দিকে অগ্রসর হলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের বাধা দেন। পরে বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়ে তারা চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী সহসপুর গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় রায় বলেন, ‘বাজারে ঢুকেই ভাঙচুর শুরু করে হামলাকারীরা। বেছে বেছে আমাদের দোকানগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলাকারীদের হাতে লাঠি ও ধারালো অস্ত্র ছিল। দোকান ছেড়ে পালিয়েছি। পরে চোখের সামনে মালামালগুলো লুট করে নিয়ে গেছে। গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় আমরা পাড়ার সবাই সামনে দাঁড়ালে ওরা চলে যায়।’
এদিকে দিনাজপুর সদর উপজেলায় ফুলতলা শ্মশানঘাট এলাকায় মাঠে নির্মাণাধীন হরিসভা ঘর, দুর্গামন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে।
খুলনা: খুলনার দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কমপক্ষে ১১টি হিন্দু বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার শিকার বেশির ভাগ বাড়ির মালিক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
উপজেলার বাণীশান্তা ইউপির চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায়, ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও আমতলা গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্ত কুমার গাইন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক পূর্ব খেজুরিয়া গ্রামের সঞ্জীব মণ্ডলের বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর করা হয়। সঞ্জীব মণ্ডল বলেন, আমার বাড়িতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এরপর চেয়ারম্যান বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
কৈলাসগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান রামনগর গ্রামের বাসিন্দা মিহির কুমার মণ্ডলের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই ইউনিয়নের ধোপাদী মধ্যপাড়ার বিধান মণ্ডলের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়েছে।
রংপুর: রংপুরের তারাগঞ্জে সোমবার রাত আটটার দিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। প্রাচীর ভেঙে ইটও খুলে নেয় হামলাকারীরা।
প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও তাঁর দেশ ছাড়ার খবরে আনন্দমিছিল বের হয়। সেখান থেকে নানা স্থানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। উপজেলা পরিষদের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পরিষদ চত্বরের ভেতরে থাকা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুর করা হয়। এরপর উপজেলা পরিষদের পাশে থাকা মুক্তিযোদ্ধা ভবনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়।
বাংলাদেশ জার্নাল/আরএইচ










