চট্টগ্রাম সিএমএম কার্যালয়ে দুর্নীতি অভিযোগের নতুন ব্যবস্থা
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১০:৩০

পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট কীংবা আদালতের পরোয়ানা পাঠানো বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবিসহ যে কোনো সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) কাছে সরাসরি দাখিল করা যাবে।
এজন্য খোলা হয়েছে একটি ই-মেইল, সিএমএম এর দপ্তরের বাইরে বসানো হয়েছে স্বচ্ছ অভিযোগ বক্স।
সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেআইনি কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণের জন্য ‘সিএমএম, চট্টগ্রাম সমীপে’ নামে এই অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে এ বিষয়ে সোমবার একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অনিয়ম বা হয়রানিমূলক আচরণ প্রতিরোধে ‘জাস্টিস অব দ্যা পিস’ হিসেবে ওই প্রশাসনিক আদেশটি জারি করেছেন চট্টগ্রামের সিএমএম এ জি এম মনিরুল হাসান সরকার।
‘জাস্টিস অব পিস’ হলেন হলেন এমন একজন ব্যক্তি বা কর্মকর্তা যিনি তার অধিক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য দায়িত্ব ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
পদাধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এবং জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে ‘জাস্টিস অব পিস’ হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
চট্টগ্রামের সিএমএম এর জারি করা আট দফার ওই প্রশাসনিক আদেশে বলা হয়, সিএমএম এর এজলাস কক্ষের বাইরের দেয়ালে সহজে দৃষ্টিগোচর এবং প্রবেশযোগ্য স্থানে ‘সিএমএম, চট্টগ্রাম সমীপে’নামে একটি সুরক্ষিত ও সিলগালা করা তথ্য ও অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া তথ্য-উপাত্ত ও অপরাধের সংবাদ বা অভিযোগ সিএমএম এর অফিসিয়াল ইমেইল ঠিকানায় অথবা [email protected] ঠিকানায় পাঠানো যাবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার যে কোনো সংক্ষুব্ধ নাগরিক, বিচারপ্রার্থী, সরকারি সেবাগ্রহীতা অথবা আইনজীবী কয়েকটি বিষয়ে লিখিত তথ্য, অভিযোগ, উপাত্ত বা প্রমাণাদি ওই বক্সে বা ইমেইলে পাঠাতে পারবেন।
যেসব বিষয়ে অভিযোগ পাঠানো যাবে
যেসব বিষয়ে অভিযোগ পাঠানো যাবে তার তালিকা দেওয়া হয়েছে সিএমএম এর ওই প্রশাসনিক আদেশে। এর মধ্যে রয়েছে-
(ক) পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট বা অন্য কোনো সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ, অবৈধ আর্থিক সুবিধা বা অনৈতিক দাবি।
(খ) মেট্রোপলিটন এলাকার সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অনিয়ম বা হয়রানিমূলক আচরণ।
(গ) আদালত, বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা এই ম্যাজিস্ট্রেসির কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম, পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, প্রভাব বিস্তার বা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা।
(ঘ) আদালতের নকলখানা থেকে সার্টিফিকেট কপি প্রাপ্তি, এফিডেভিট, জিআরও শাখা বা বিভিন্ন বিভাগের ফাইল এন্ট্রি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আদালতের পরোয়ানা প্রেরণ বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে (রিকল) কৃত্রিম বিলম্ব বা অনৈতিক দাবি।
(ঙ) জামিননামা দাখিল, জামিনদার যাচাই এবং কারাগারে আসামি মুক্তির রিলিজ অর্ডার পাঠানোর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কোনো ধরণের অনৈতিক লেনদেন বা হয়রানি অথবা আদালতের কার্যক্রম বা বিচারিক ফলাফল প্রভাবিত করার নামে কোনো অনৈতিক ও বেআইনি দাবি।
(চ) মালখানা থেকে আদালতের আদেশে জব্দ করা আলামত বা যানবহাহন জিম্মায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বেআইনি ও অনৈতিক দাবি বা কালক্ষেপণ।
(ছ) বিচার প্রশাসন, পরিবেশ, জননিরাপত্তা, জনস্বার্থ বা নাগারিক সেবার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বেআইনি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
(জ) সরকারি সেবা গ্রহণে বৈষম্য, অযৌক্তিক হয়রানি, অনৈতিক চাপ প্রয়োগ বা নাগরিক অধিকার ব্যহতকারী কর্মকাণ্ড।
লিখিত অভিযোগের সাথে প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক দলিল, ছবি, অডিও-ভিডিও, ইলেকট্রনিক তথ্য, প্রিন্টকৃত নথি বা অন্য কোনো সহায়ক তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করা যাবে।
ওই অভিযোগ বক্সের চাবি সিএমএম এর নিজস্ব হেফাজতে থাকবে। তথ্যদাতা বা অভিযোগকারীর জানমালের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তার পরিচয় ও প্রদত্ত তথ্যের গোপনীয়তা প্রচলিত আইন এবং বাস্তবসম্মত প্রশাসনিক সীমার মধ্যে কঠোরভাবে রক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে ওই প্রশাসনিক আদেশে।
যেভাবে কাজ করবে এই উদ্যোগ
এই বিশেষ প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়মিত আইনগত অভিযোগ দায়ের পদ্ধতির বিকল্প, প্রতিস্থাপক বা সমপর্যায়ের আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হবে না।
এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত কোনো তথ্য বা উপাত্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো ফৌজদারি মামলা রুজু বা অপরাধ আমলে নেওয়ারএকক বা চূড়ান্ত ভিত্তি বলেও বিবেচিত হবে না।
এসব তথ্য বা অভিযোগ পাওয়ার পর তথ্যের প্রকৃতি, গুরুত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রাসঙ্গিকতা ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় সিএমএম কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।
প্রশাসনিক আদেশে বলা হয়েছে, ‘প্রযোজ্য ক্ষেত্রে’ প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়াও সিএমএম কয়েক রকম ব্যবস্থা নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে-
(ক) সিএমএম সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পাঠাতে পারেন।
(খ) অভ্যন্তরীণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রশাসনিক তথ্য যাচাই বা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিতে পারেন।
(গ) পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অন্য কোনো উপযুক্ত আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানাতে পারেন।
আদেশে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত শত্রুতা, বিদ্বেষবশত, অসৎ উদ্দেশ্যে বা জ্ঞাতসারে মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ দিলে তার আইনগত দায় সৃষ্টি হবে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
আওতাবহির্ভূত বিষয় যেগুলো
জমিজমা নিয়ে বিরোধ, ফৌজদারি যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে থানা বা আদালতে নিয়মিত মামলার সুযোগ রয়েছে এমন বিষয়গুলো এই অভিযোগবক্সের আওতার বাইরে থাকবে।
প্রশাসনিক আদেশে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য যেহেতু কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানি প্রতিরোধ, সেহেতু কিছু বিষয় এ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হবে না।
(ক) কোনো ব্যক্তিগত দেওয়ানি বিরোধ, যেমন: জমিজমা, স্বত্ব বা মালিকানা, দখল-বেদখল, উত্তরাধিকার, চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা, দেনা-পাওনা, পারিবারিক বা বৈবাহিক বিরোধ।
(খ) কোনো ব্যক্তিগত সাধারণ ফৌজদারি বিরোধ বা অপরাধ, যার প্রতিকারের জন্য প্রচলিত আইনে সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার দায়ের কিংবা আদালতে নালিশি মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে।
(গ) যে কোনো বিচারাধীন মামলা, আপিল, রিভিশন, রেফারেন্স বা অন্য কোনো চলমান বিচারিক কার্যক্রমের মেরিট বা ফলাফলকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে করা আবেদন।
(ঘ) কোনো উপযুক্ত আদালত বা ট্রাইব্যুনালের বিচারিক আদেশ, রায়, ডিক্রি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রতিকার বা পুনর্বিবেচনার প্রার্থনা, যার জন্য আইন দ্বারা পৃথক আপিল বা রিভিশনের ফোরাম নির্ধারিত রয়েছে।
আদেশের অনুলিপি চট্টগ্রাাম মেট্রোপলিটনের পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক, জেলা বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও দেওয়া হয়েছে।
সিএমপি কমিশনারের অধীনের সকল থানা, গোয়েন্দা শাখা এবং ভেরিফিকেশন শাখাকে এই আদেশের মর্ম পরিপালন এবং কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যেন এ ধরনের কোন অভিযোগ না আসে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










