ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ১৯ মিনিট আগে
শিরোনাম

‘ড্রাগনের মা’–এর চমকে দেওয়া গল্প

  বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৬:৪২

‘ড্রাগনের মা’–এর চমকে দেওয়া গল্প
‘গেম অব থ্রোনস’–এ এমিলিয়া ক্লার্ক। ছবি: সংগৃহীত

এমিলিয়া ক্লার্ককে বিশ্বের কোটি দর্শক চেনেন ‘ড্রাগনের মা’ হিসেবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি ছিল না কোনো কাল্পনিক রাজ্যের জন্য। সেটি ছিল নিজের জীবন বাঁচানোর লড়াই। মাত্র ২২ বছর বয়সে, যখন তাঁর অভিনীত ‘গেম অব থ্রোনস’ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলতে শুরু করেছে, তখনই আচমকা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে (ব্রেন হেমারেজ) আক্রান্ত হন তিনি। এরপর আবার ২৪ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো একই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। আজ, প্রায় ১৫ বছর পর, এমিলিয়া ক্লার্ক বলছেন ‘বেঁচে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, সুস্থ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

খ্যাতির শিখরে ওঠার আগেই মৃত্যুর মুখোমুখি

২০১১ সাল। সদ্য সম্প্রচার শুরু হয়েছে ‘গেম অব থ্রোনস’-এর প্রথম মৌসুম। অজানা এক তরুণী অভিনেত্রী রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হচ্ছেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়েই একদিন জিমে ব্যায়াম করার সময় অসহনীয় মাথাব্যথা অনুভব করেন এমিলিয়া। পরে হাসপাতালে জানা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম ফেটে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না। অস্ত্রোপচার সফল হলেও সামনে অপেক্ষা করছিল দীর্ঘ পুনর্বাসন। স্মৃতিশক্তি হারানোর ভয়, কথা বলতে না পারার আতঙ্ক সবকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আবার ক্যামেরার সামনে ফিরে যান। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল সব ঠিক আছে। কিন্তু সত্যিটা ছিল ভিন্ন।

‘আমি ভাবতাম মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছি’

সম্প্রতি লন্ডনে ‘পাওয়ার অব উইমেন’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এমিলিয়া বলেন, বহু বছর ধরে তার মনে হতো তিনি যেন মৃত্যুকে প্রতারণা করে বেঁচে আছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি মনে করতাম, আমার এখানে থাকার কথা নয়। মনে হতো আমি যেন কোনো ভুল করেছি, আর মৃত্যু একদিন এসে আমাকে নিয়ে যাবে।’ এই মানসিক চাপ তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে।

অনেক সময় তিনি অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করতেন। উদ্বেগে ভুগতেন। শরীরের নানা সমস্যাকে কাজের চাপ বলে এড়িয়ে যেতেন। এমনকি মস্তিষ্কের আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তিনি বুঝতে পারেননি। কারণ, চিকিৎসকেরাও তখন তাঁকে ‘সুস্থ’ বলেই ধরে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়বারের আঘাত

প্রথম বিপর্যয়ের তিন বছর পর, ২০১৪ সালে আবারও ব্রেন হেমারেজে আক্রান্ত হন এমিলিয়া। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল ছিল। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারও করতে হয়। একদিকে বিশ্বখ্যাত সিরিজের চাপ, অন্যদিকে মৃত্যুভয়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। তবু তিনি কাজ থামাননি। অসংখ্য দর্শক যখন এমিলিয়াকে শক্তিশালী ডেনেরিস টারগারিয়েন চরিত্রে দেখেছেন, তখন কেউ জানতেন না ক্যামেরার বাইরে তিনি কী ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধে লড়ছেন।

কেন চুপ ছিলেন

আজকের দিনে তারকারা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সহজেই শেয়ার করেন। কিন্তু এমিলিয়া দীর্ঘদিন নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশ করেননি। কারণ, তিনি লজ্জা পেতেন। তিনি বলেছিলেন, রোগটি সম্পর্কে তিনি নিজেই ঠিকমতো বুঝতেন না। ভয় ছিল, মানুষ তাঁকে দুর্বল ভাববে। এমনকি এইচবিওকেও প্রথম দিকে বিষয়টি জানানো হয়নি। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হওয়ার পর যে তিনি বেঁচে থাকবেন, তখন বিষয়টি জানানো হয়।

নিজের যন্ত্রণা থেকে অন্যদের জন্য লড়াই

২০১৯ সালে অবশেষে এমিলিয়া প্রকাশ্যে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। এরপর তিনি এবং তাঁর মা জেনি ক্লার্ক প্রতিষ্ঠা করেন ‘সেম ইউ’ নামের একটি দাতব্য সংস্থা। সংস্থাটির লক্ষ্য হলো মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়া রোগীদের পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা। এমিলিয়ার মতে, চিকিৎসাব্যবস্থা মানুষের জীবন বাঁচাতে অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু বেঁচে যাওয়ার পর যে দীর্ঘ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেখানে এখনো বিশাল ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘হাসপাতালে আপনার জীবন বাঁচানো হয়। কিন্তু এরপর কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই নেই।’

‘তুমি দেখতে তো ঠিকই আছ’

মস্তিষ্কজনিত আঘাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এর অনেক লক্ষণ বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মানুষ দেখে রোগী হাঁটতে পারছে, কথা বলতে পারছে। ফলে ধরে নেয় সব ঠিক আছে। এমিলিয়া বলেন, ‘যখন সবাই আপনাকে স্বাভাবিক মনে করে, তখন আপনিও নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেন।’ কিন্তু বাস্তবে উদ্বেগ, স্মৃতিজনিত সমস্যা, মানসিক ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের সংকট—এসব অনেক বছর ধরে থেকে যেতে পারে।

‘গেম অব থ্রোনস’ থেকে বাস্তবের নায়িকা

পর্দায় ড্রাগনের রানি হয়ে যুদ্ধজয়ের গল্প দর্শক বহুবার দেখেছেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে এমিলিয়া ক্লার্কের গল্প আরও নাটকীয়। তিনি কোনো কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েননি। লড়েছেন নিজের শরীরের বিরুদ্ধে। দুবার মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। বিশ্বজোড়া খ্যাতির চাপ সামলেছেন। এরপর নিজের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেছেন অন্যদের সাহায্য করার জন্য। আজ তিনি শুধু একজন সফল অভিনেত্রী নন; তিনি হাজারো ব্রেন ইনজুরি সারভাইভারের কণ্ঠস্বর।

বেঁচে থাকা নয়, ফিরে পাওয়া

এমিলিয়া ক্লার্কের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এটিই ‘রিকভারি ইজ অ্যাজ ইমপর্ট্যান্ট অ্যাজ সারভাইভাল।’ অর্থাৎ শুধু বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। একজন মানুষকে তাঁর জীবন, আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও পরিচয় ফিরে পাওয়ার সুযোগও দিতে হবে। ১৫ বছর আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা সেই তরুণী হয়তো ভাবতেও পারেননি যে একদিন তিনি লাখো মানুষের প্রেরণা হয়ে উঠবেন।

সূত্র: ভ্যারাইটি

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত