শিশু নির্যাতনের তদন্তে এসে নারী সাংবাদিক খুন
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১৯:৫২

গত বছর নেটফ্লিক্সে এসেছিল সাইফ আলী খান অভিনীত সিনেমা ‘জুয়েল থিফ: দ্য হেইস্ট বিগিনস’। প্ল্যাটফর্মটির টপ চার্টে রাজত্ব করলেও সিনেমাটি ঠিক পাতে দেওয়ার মতো ছিল না। বিরতির পর আবার নেটফ্লিক্সে ফিরলেন সাইফ, নতুন সিনেমা ‘কর্তব্য’ নিয়ে। এবার কি তিনি পারলেন ‘কর্তব্য’ পালন করতে?
ছোট শহরের এক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প নিয়েই ‘কর্তব্য’। পরিচালক পুলকিতের এই রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ এবং কারিগরিভাবে পরিণত ক্রাইম থ্রিলারে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ। তাঁর অভিনয়ে ক্ষোভ, হতাশা আর প্রতিরোধের যে মিশ্র প্রকাশ দেখা যায়, সেটিই সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
সিনেমার শুরুতেই দেখা যায়, ৪০তম জন্মদিনেও দায়িত্বে ব্যস্ত থানার কর্মকর্তা পবন (সাইফ আলী খান)। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এক নারী সাংবাদিক ও তার টিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার। ওই সাংবাদিক শহরের প্রভাবশালী ধর্মগুরু আনন্দ শ্রীর (সৌরভ দ্বিবেদী) বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে এসেছে। কিন্তু সাধারণ দায়িত্ব মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়, আর পবনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী অশোক (সঞ্জয় মিশ্র) গুলিবিদ্ধ হয়। হামলাকারী একজন কিশোর। এরপরই বিপাকে পড়ে পবন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (মনীশ চৌধুরী) তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে চায়। নিজের সম্মান বাঁচাতে পবন এক সপ্তাহ সময় চায়। তদন্ত শুরু করার আগেই সে জানতে পারে, তার ছোট ভাই নিখোঁজ! ধারণা করা হচ্ছে, অন্য জাতের এক মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে সে! দুটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পবন আবিষ্কার করে, এই লড়াইয়ে তিনি একেবারেই একা।
শাহরুখ খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে পুলকিতের আগের নেটফ্লিক্স চলচ্চিত্র ‘ভক্ষক’–এর সঙ্গে ‘কর্তব্য’–এর একধরনের আত্মীয়তা রয়েছে। ‘ভক্ষক’–এ ভূমি পেড়নেকর অভিনয় করেছিলেন এক সাহসী নারী সাংবাদিকের চরিত্রে, যে একটি ছোট শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে চলা যৌন নির্যাতনের চক্র ফাঁস করতে গিয়ে ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি হয়। ‘কর্তব্য’ যেন সেই গল্পের আরেক পাশ। এখানে শুরুতেই খুন হয় এক নারী সাংবাদিক, যে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর আড়ালে চলা শিশু নির্যাতনের ঘটনা অনুসন্ধান করতে এসেছিল।
এই হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থতার পরই পবনের বিবেক জাগ্রত হয়। যে কাজটি একজন সাংবাদিকের করার কথা ছিল, সেটাই এবার করতে বাধ্য হয় এক পুলিশ কর্মকর্তা। ফলে ‘কর্তব্য’ শুধু একটি তদন্তভিত্তিক থ্রিলার নয়; বরং এটি এমন এক গল্প, যেখানে চাকরির দায়িত্ব আর নৈতিক দায়িত্ব একসময় আলাদা হয়ে যায়। দুটি ছবির আরও একটি মিল হলো—রাতের অন্ধকার যেন এখানে আলাদা এক চরিত্র। আর দুটিতেই অনবদ্য অভিনয় করেছেন সঞ্জয় মিশ্র, বিশ্বস্ত সহকর্মীর ভূমিকায়।
হিন্দি সিনেমায় ‘কর্তব্য’ শব্দটি সাধারণত প্রতিশোধ, পারিবারিক সম্মান বা পুরোনো মূল্যবোধ রক্ষার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু পুলকিত এই ধারণাকে উল্টে দিয়েছেন। এখানে চল্লিশোর্ধ্ব নায়ক পবন লড়াই করে পরিবারতন্ত্র, সামাজিক রক্ষণশীলতা আর সেকেলে প্রথার বিরুদ্ধে। এই ছবিতে প্রতিশোধ মানে অতীত রক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের সূত্র তৈরি করে সিনেমাটি দেখায়, সমাজে ট্রিগার টানা মানুষটির বিচার হয়, কিন্তু বন্দুকের মালিকেরা থেকে যায় ধরা–ছোঁয়ার বাইরে।
এ ধরনের গল্পে প্রায়ই দেখা যায়, নায়ক হঠাৎ করে বিবেকবান হয়ে ওঠে—কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বা অতীতের আঘাতে। কিন্তু ‘কর্তব্য’ বিষয়টিকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। স্ত্রী বর্ষার (রসিকা দুগ্গল) সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পবন বুঝতে শেখে, তার মতো মানুষেরা নীরব থেকে, চোখ বন্ধ করে থেকেই একসময় ফ্যাসিবাদকে নিজেদের দরজায় ডেকে আনে।
এই রাজনৈতিক উপলব্ধির সমান্তরালে আছে পবনের ছোট ভাইয়ের প্রেম করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা। অন্য জাতের মেয়েকে বিয়ে করা পবনের ভাইকেও পঞ্চায়েত আর কট্টরপন্থী বাবার হাত থেকে বাঁচাতে হয় পবনকে। জাকির হুসেন অভিনীত পবনের বাবার পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র সমাজের পুরোনো মানসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
পবন নামের অর্থ ‘বাতাস’, আর সে যেন পরিবর্তনের হাওয়া নিয়েই আসে। কিন্তু তাকে চালিত করে কেবল পুলিশি দায়িত্ব নয়; বরং সে একজন বাবা, যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে চায়। সে চায় না, তার সন্তান এমন একটি সমাজে বড় হোক, যেখানে ঘৃণা ও সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ছবির এক পর্যায়ে তার সন্তান একটি কটু শব্দ ব্যবহার করে, যা সে শুনেছে পঞ্চায়েতের বৈঠকে। এই মুহূর্তই দেখিয়ে দেয়—বিষাক্ত সমাজের প্রভাব কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পবন বুঝতে পারে না, কীভাবে মানুষ নিজের রক্তের সম্পর্কের চেয়েও সামাজিক সম্মান বা পূর্বপুরুষদের মতাদর্শকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
পুলকিত এখানে এমন এক সামাজিক গল্প বলতে চেয়েছেন, যা অনেকটা সুধীর মিশ্র বা অনুরাগ কাশ্যপের রাজনৈতিক সিনেমার ধাঁচের। তবে এটি কেবল তদন্তমূলক থ্রিলার নয়। কারণ, দর্শক শুরু থেকেই জানে যে ক্ষমতার শিকড় কোথায়। বরং এটি এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে নির্লিপ্ত মানুষদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। পবনও প্রথমে উদাসীন ছিল—যতক্ষণ না ঘটনাগুলো তার নিজের জীবনে আঘাত হানে।
চিত্রনাট্যের সূক্ষ্মতা ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যদিও মাঝেমধ্যে ভয়েসওভার বা অতিরিক্ত সংলাপের মতো ওটিটি-ধর্মী কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তবু লেখার বুদ্ধিদীপ্ততা চোখে পড়ে। এক দৃশ্যে পবন তার ভাইকে বকছে—‘সব প্রেমের সিনেমা দেখে নিজেকে শাহরুখ খান ভাবছ!’ এরপর নিজের রক্ষণশীল বাবাকে তুলনা করে অমরিশ পুরির খল চরিত্রগুলোর সঙ্গে। এটি শুধু প্রযোজক শাহরুখ খানকে ঘিরে আত্মবিদ্রূপ নয়, বরং বলিউডি প্রেমের গল্পের বাস্তবতা নিয়েও একধরনের স্বীকারোক্তি। বাস্তব জীবনে সেই প্রেম টিকিয়ে রাখতে পবনের মতো ‘সহায়ক চরিত্র’দের সাহস দরকার হয়। সিনেমায় পবনের সাদা স্নিকার্স পরার অভ্যাসও একটি মজার ইঙ্গিত—সে যেন ‘রাব নে বানা দে জোড়ি’–এর শাহরুখ খানের বিকল্প বাস্তবতার সংস্করণ; মধ্যবয়সী, অনাড়ম্বর, নিজের পরিচয় আর সমাজের প্রত্যাশার মধ্যে আটকে থাকা এক মানুষ।
পবনকে আবার গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী হিসেবেও দেখানো হয়েছে। সে শিবভক্ত, প্রায়ই মহাভারতের উদাহরণ টানে। মজার বিষয় হলো, ছবির বিশ্বাসঘাতকদের একজন আবার নাস্তিক। এখানেই ‘কর্তব্য’ আলাদা। এটি একদিকে অন্ধভক্তি ও ধর্মীয় উন্মাদনার সমালোচনা করে, কিন্তু অন্যদিকে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতাকে পুরোপুরি বাতিলও করে না; বরং পবনের মতো চরিত্রের মাধ্যমে ছবিটি দেখাতে চায়, ধর্মের প্রকৃত অর্থ মানবতা, যাকে ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সিনেমাটি যেন বলতে চায়—মানবতা যখন বিপন্ন, তখন ডান-বাম বিভাজনের চেয়ে মানুষ হয়ে ওঠাই বেশি জরুরি।
কারিগরি দিক থেকেও ‘কর্তব্য’ শক্তিশালী। কাল্পনিক শহর ঝামলি যেন ভারতেরই প্রতিচ্ছবি—অশুভ আত্মা নয়, বরং প্রতিদিনের ভয় আর অন্ধকারে ঘেরা এক সমাজ। পবনের নৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভূমিকায় মনীশ চৌধুরী দুর্দান্ত। ইয়ুধবীর আহলাওয়াত নজর কাড়েন সেই কিশোর চরিত্রে, যাকে ঘিরেই শুরু হয় পুরো তাড়া। তার মুখে একই সঙ্গে ফুটে ওঠে নিষ্পাপ ভাব আর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের ছাপ। সঞ্জয় মিশ্র আবারও প্রমাণ করেন, কেন তিনি এ ধরনের চরিত্রে অনন্য। আর জাকির হুসেনের কট্টরপন্থী বাবার চরিত্র সত্যিই অস্বস্তিকর। তবে ভারতের আলোচিত সাংবাদিক সৌরভ দ্বিবেদীকে ভণ্ড গডম্যানের চরিত্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সফল হয়নি।
সাইফ আলী খান বরাবরের মতোই আকর্ষণীয়। এটাই প্রথমবার নয় যে সাইফ উত্তর ভারতের রুক্ষ বাস্তবতায় অভিনয় করলেন। ‘ওমকারা’-তে তাঁর ল্যাংড়া ত্যাগী চরিত্র আজও সিনেমাভক্তদের মনে থাকার কথা। সেই চরিত্রের আঞ্চলিক ভাষা, শরীরী ভঙ্গি এবং নির্মমতা ছিল থিয়েট্রিক্যাল–জগতের ভেতরেও বিশ্বাসযোগ্য। একইভাবে ‘স্যাক্রেড গেমস’ সিরিজেও পুলিশের চরিত্রেও দুর্দান্ত করেছিলেন।
‘কর্তব্য’ সিনেমায় সাইফের সংলাপের টানে কখনো অতিরিক্ত পুরুষালি ভঙ্গি এলেও চরিত্রটির ভেতরের অস্থিরতা তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পবন চরিত্রটি যেন ভেতরে–ভেতরে ফুটতে থাকা এক আগ্নেয়গিরি। তার রাগ, হতাশা আর পিতৃত্ববোধ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক নায়ক, যে একই সঙ্গে ভঙ্গুর ও ভয়ংকর। এই চরিত্র কিছুটা মনে করিয়ে দেয় কিছুদিন আগেই অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পাওয়া ‘সুবেদার’ সিনেমার অনিল কাপুরকে—যে ছোট শহরের রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে একা লড়েছিল। তবে অনিল কাপুর যেখানে মাথা উঁচু করে বাঁচার দাবি তুলেছিলেন, সেখানে সাইফ আলী খানের পবন যেন অন্য কথা বলে—আবার সত্যিকারের বাঁচতে হলে আগে কিছুটা মরতে জানতে হবে।
‘হরপাল’ চরিত্রে চমকে দিয়েছেন যুধবীর আহালওয়াত। হরপালের অসহায়ত্ব, ভয়, ক্ষোভ ও মানসিক ভাঙন নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যুধবীর।
কিন্তু অভিনয়ে সৌরভ দ্বিবেদী দুর্বল। জনপ্রিয় মুখ হিসেবে তিনি দর্শকের আগ্রহ টানতে পারেন, কিন্তু ক্যামেরার সামনে অভিনয় শুধু হাত নেড়ে কথা বলা বা কণ্ঠস্বর বদলানোর বিষয় নয়। এটি পুরো শরীর ও অনুভূতির সমন্বয়। গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে পরিচালক তাঁকে আড়াল করতে ক্যামেরা পেছনে সরিয়ে নেন, কিন্তু সেই কৌশল স্পষ্ট ধরা পড়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাঁর চরিত্রটিকে পূর্ণতা দেওয়া হয়নি। শিশুদের ব্যবহার করে ভয়ংকর অপরাধ চক্র চালানো একজন ধর্মগুরুর ভেতরের জগৎ বা উদ্দেশ্য কখনোই গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। সেই কারণেই সিনেমায় সাইফের সামনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দাঁড়ায় না।
আর সে কারণেই ‘কর্তব্য’ শেষ পর্যন্ত ভালো কিন্তু ‘ওয়াও’ হয়ে ওঠে না।
সূত্র:প্রথম আলো
বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি










