ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

কক্সবাজারে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২২:০৮

কক্সবাজারে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি

টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নতুন গঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এ ছাড়া জেলা সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।

এর মধ্যে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে চকরিয়া উপজেলায় বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে ১২ বছরের এক মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরইতলী ইউনিয়নের রাসুলাবাদ এলাকায় নৌকায় করে বন্যার পানি পার হওয়ার সময় তিন বোন পানিতে পড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার লাশ উদ্ধার করা হয়।

তার দুই বোন সাওরিন মনি ও জেরিনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান ইউএনও।

চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীর শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় হাসপাতালে যেতে পারছেন না অনেক রোগী।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক মাছের ঘেরের কারণে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যে পেকুয়ার সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় বেড়ি বাঁধের দুটি অংশ ধসে যায়। এতে জোয়ারের পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

পেকুয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আনসারী বলেন, বুধবার রাতেই স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি ও জোয়ারের চাপে ভোরের আগে বাঁধ ভেঙে যায়।

চকরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, মাতামুহুরী নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়ি বাঁধজুড়ে শতাধিক স্থানে অবৈধ মাছ ধরার ফাঁদ বসানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্লুইস গেইটও বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

তবে ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নামাতে স্লুইস গেইটগুলো সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

তিনি বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। সেখানে শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

গত দুই দিনে এ দুই উপজেলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে পাহাড় ধসে দুজন এবং বন্যার পানিতে ভেসে দুজন মারা গেছেন।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, তার উপজেলায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনও গুরুতর। অনেক বাড়িঘরে পানি রয়েছে। পানি বাড়ছে না, তবে নামছেও ধীরে। বৃষ্টি কমে গেলে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমবে।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা সপ্তম দিনের মত টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। সেইসঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌরুটেও যান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন।

উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বৃষ্টির তীব্রতা কমায় পানি কিছুটা নেমেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার একাধিক ক্যাম্পের মাঝি (নেতা)।

তবে পাহাড় ধসের ঝুঁকি থাকায় ক্যাম্পের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ বহাল রয়েছে বলে জানান এই আবহাওয়াবিদ।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেছেন, বান্দরবান শহর থেকে পানি নামতে শুরু করায় মাতামুহুরি নদীর পানিও বেড়েছে। তাই চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত