চট্টগ্রামে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:৫২ আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ২১:৩৪

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর পানি নামতে শুরু করলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
শুক্রবার(১০ জুলাই) বিকালে চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় যে তথ্য দিয়েছে, তাতে বিভিন্ন উপজেলার সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার(৯ জুলাই) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছিলেন, প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন লোক বন্যা আক্রান্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মোট ১০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তরফে জানানো হয়েছে।
সাতকানিয়া
চট্টগ্রাম বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে সাতকানিয়া উপজেলা সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হওয়ার কথা বলেছেন জেলা প্রশাসক।
এ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রত্যেকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ইউএনও মাহমুদুল গণমাধ্যমকে বলেন, সাতকানিয়া উপজেলার পৌরসভার পানি নামতে শুরু করেছে।
“তবে পৌরসভাসহ বিভিন্ন দিক থেকে পানি নামলেও সেগুলো অন্যদিকে গিয়ে পড়ছে। যার কারণে পরিস্থিতিটি অনেকটা জটিল।”
সাতকানিয়ার বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাতকানিয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে পাহাড়ে বৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। সাঙ্গু নদী, ডলু ও হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে উজানের দিকে। বান্দরবানের দিকে বৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়বে সাতকানিয়া অঞ্চলে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ তথ্য মতে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বৃহস্পতিবার ছিল ১৪ সেন্টিমিটার।
পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় সড়কে পানি উঠে চট্টগ্রামের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ তৃতীয় দিনের মত বন্ধ আছে।
কেউচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন সড়ক ও গ্রামের পানি নামতে শুরু করেছে। তবে তা তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে। বান্দরবান সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু গ্রামে ও সড়কে পানি নামতে শুরু করায় মানুষ পায়ে হেঁটে ও ভ্যানে চলাচল করতে পারছে। তবে তেমুহুনি, ঢেমশা, নলুয়া ও সাতকানিয়া সদর এলাকায় মানুষের চলাচলের অন্যতম বাহন হয়ে উঠেছে নৌকা।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান নাজিম।
সাতকানিয়া তেমুহুনি এলাকার বাসিন্দা মো. নবাব মিয়া কাজ করেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের চট্টগ্রাম অফিসের ভিডিওগ্রাফার হিসেবে।
বৃহস্পতিবার রাতের নিজের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, “২০২৩ সালেও পাহাড়ি ঢলে আমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম। বাড়ির আশেপাশে পানি উঠে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার বাড়ি গিয়েছিলাম। রাতে প্রবল বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পানিও বাড়তে শুরু করেছিল।
“রাত ১২টার দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য টিউবের ভেলা তৈরি করে পাশের একটি দুই তলা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম স্ত্রী ও দুই বছর বয়েসী ছেলেকে। এসময় পানির স্রোতে টিউব উল্টে যাওয়ায় পানিতে পড়ে যায় স্ত্রী-সন্তান। কোনোভাবে তাদের উদ্ধার করতে পারলেও সাথে রাখা জিনিসপত্রগুলো পানিতে তলিয়ে যায়।”
নবাব জানালেন, রাতে পানি বাড়লেও সকাল থেকে ধীরগতিতে পানি নামা শুরু হয়েছে।
সাতকানিয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কে ঝামেলা
স্থানীয়রা জানান, বুধবার বিকাল থেকে বিভিন্ন গ্রাম বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু স্থানে বিদ্যুৎ এলেও অনেক স্থানে নেই। সবমিলিয়ে বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মধ্যে রয়েছে। পাশাপশি ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কও পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউএনও মাহমুদুল বলেন, বিদ্যুতের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে। অনেকের মোবাইলে চার্জ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে।
মোবাইল নেট ওয়ার্কের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “উপজেলার পৌরসভার দিক থেকে পানি নামা শুরু করলেও সেগুলো আবার বিভিন্ন গ্রামের দিকে বাড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্কও সমস্যা করছে। তাই আমাদের প্রকৃত তথ্য পেতেও একটু সমস্যা হচ্ছে।
“তবে শনিবার সকালের মধ্যে এর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।”
গত রোববার থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে। এ সময়ে ১ হাজার ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানানো হয়।
শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের খবর শোনা গেলেও শহরে তেমন হয়নি।
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা কর্মচারির ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বাঁশখালী
বাঁশখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে জানান, বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দিয়ে পানি সরানোর হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে কমবেশি সবগুলো ইউনিয়নের লোকজন পানিবন্দি হয়েছে। দুপুরের পর থেকে পানি কমতে শুরু করেছে।
বাহারছড়া, সরল, শেখের খিল, বৈলছড়ি ও কাথারিয়া ইউনিয়নের এখনও পানি রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন বলেন, গতরাতে বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় আবার পানি বেড়েছে। যার কারণে অনেকেই আবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত অন্তত ৫৫ হাজার লোক উপজেলাটিতে পানিবন্দি হয়েছেন বলে জানান সহকারী কমিশনার আঁকন, যা বৃহস্পতিবার ছিল ৩৮ হাজারের মত।
এদিকে দুর্যোগ মোকবেলিয়া ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়।
বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি










