ঢাকা, বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ২৩ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২১, ১৭:৩৯

প্রিন্ট

নতুন শঙ্কায় দেশের রপ্তানি খাত

নতুন শঙ্কায় দেশের রপ্তানি খাত

সৈয়দ মিজানুর রহমান

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তৈরি ও নিট পোশাকসহ গোটা রপ্তানি খাতে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানির গন্তব্যগুলোতে আবারো করোনার প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর ফলে অনেকেই অর্ডার স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর করোনার সংক্রমণ ছিল অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। সে কারণে ২০২০ সালে দেশটিতে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। তবে করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আবারও দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কিছুটা বাড়ে। তবে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ায় দেশটিতে পোশাক রপ্তানি নিয়ে আবারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) এর তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান গত বছর ৬ হাজার ৪০৭ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করে। ২০১৯ সালের চেয়ে এই আমদানি ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। তবে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৯১ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে দেশটির ব্যবসায়ীরা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম।

অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ১০০ কোটি ডলার বা সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করেছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ কম। এই বাজারে চীন ও ভিয়েতনামের পর বাংলাদেশ তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।

গত বছর একপর্যায়ে চীনকে ছাড়িয়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক হলেও পরিস্থিতি আবার বদলেছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে চীন ২৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ২২ শতাংশ কম। অন্যদিকে ভিয়েতনাম গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ২০৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের প্রথম দুই মাসে দেশটি ২৩৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। সেই হিসাবে চলতি বছর তাদের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

শীর্ষ তিন রপ্তানিকারক দেশের মতোই ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানিও কমেছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ভারত ৫৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করলেও গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চতুর্থ সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি করেছে ৫৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। তাদের রপ্তানি কমে গেছে ২৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) থেকে পাওয়া তথ্য মতে ২০২০-২১ অর্থবছরে জুলাই থেকে মার্চ এ ৯ মাসে রপ্তানি আয়ের লক্ষমাত্রা ও প্রবৃদ্ধি কোনোটাই অর্জন হয়নি। বরং ঘাটতির মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৯৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে ১৩৪ কোটি ৭ লাখ ডলার বা ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

এছাড়া গত অর্থবছরের একই সময় রপ্তানি আয় হয়েছিল ২ হাজার ৮৯৭ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। সেক্ষেত্রেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ।

এদিকে একক মাস হিসাবে মার্চেও রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। এ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ৩০৭ কোটি ৬০ ডলার। সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারিতেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আয় হয়েছিল ৩১৯ কোটি ডলার। এক মাসে আয় কমেছে ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার প্রভাবে গত বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তখন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কার্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া অন্যান্য রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এমনকি তৈরি পণ্যও বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। এসব কারণে তখন রপ্তানি আয় ভয়াবহভাবে কমেছে। গত বছরের এপ্রিলে রপ্তানি আয় কমেছিল ৮৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এর আগের অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি আয় কম হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। স্মরণকালের মধ্যে তখন রপ্তানি আয়ে এত বড় পতন দেখা যায়নি।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে তৈরি পোশাকের অবদান প্রায় ৮৪ শতাংশ। রপ্তানি আয় তৈরি পোশাক শিল্প খাত নির্ভর বলে এ খাতে আয় সামান্য কমে গেলেই পুরো খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় কমেছে তৈরি পোশাক খাতে। এ সময় তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ২ হাজার ৩৪৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে একই সময় আয় হয়েছিল ২ হাজার ৪১০ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সে ক্ষেত্রে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সূত্র জানায়, রপ্তানি খাতে আরও একটি ধাক্কা এগিয়ে আসছে। এ নিয়ে শঙ্কিত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, ইতালি, কানাডা, স্পেনে লকডাউন চলছে। যে কারণে রপ্তানি কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পোশাক শিল্পের ওপর।

বিকেএমইএ সূত্র জানায়, করোনার তৃতীয় ধাক্কায় এ খাতটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রপ্তানির কার্যাদেশ কমে গেছে। করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাক্কায় কিছু আদেশ স্থগিত হয়েছিল, কিন্তু পরে ক্রেতারা সেগুলো পুনরায় দেন। সেপ্টেম্বরের পর পরিস্থিতি আবার খারাপ হয়ে যায়। করোনার প্রভাবে বিক্রি না হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে আগের পণ্য মজুত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় আগামীতে রপ্তানি আদেশ আরও আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে।

এদিকে ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, তৈরি পোশাক ছাড়াও অন্য খাতগুলোতেও রপ্তানি আয় কমেছে। হিমায়িত খাদ্য খাতে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ৩৬ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। আয় কমেছে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

কৃষি পণ্য রপ্তানিতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭৯ কোটি ২ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ৭৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। উৎপাদিত পণ্য খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৯০৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৮২ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ আয় কমেছে।

আলোচ্য সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮৬ কোটি ১৮ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ৯৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। এ খাতে আয় বেশি হয়েছে ১০ শতাংশ।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬৭৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। আয় হয়েছে ৬৮ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। আয় বেশি হয়েছে শূন্য দশিক ৮ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে শূন্য দশিমক ৫৩ শতাংশ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বুধবারও ৭৮ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৯ শতাধিক মানুষ। বাংলাদেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। ফলে বাজারটিতে নতুন করে ক্রয়াদেশ কমার শঙ্কা রয়েছে। যদিও করোনার টিকা দেওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন বেশ এগিয়ে রয়েছে। আগামী মে মাসের মধ্যে ২০ কোটি জনগণকে টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

পোশাক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানি আয় এক বছর ধরেই খারাপ। সামনে আরো খারাপ হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সব ধরনের পোশাক নিলেও পরিমাণে কম। বিপুলসংখ্যক মানুষ টিকা নিলেও দেশটিতে নতুন করে আবার সংক্রমণ বাড়ছে। আসলে করোনার নিত্যনতুন ধরনের কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে আরও বেশি সময় লাগবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসএমআর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত