ঢাকা, রোববার, ১৬ মে ২০২১, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ আপডেট : ৪১ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০১ মে ২০২১, ১০:৩৮

প্রিন্ট

বিশেষ সাক্ষাৎকারে কৃষি বিজ্ঞানী এনায়েত

ভেষজেই করোনা জয়!

ভেষজেই করোনা জয়!
কৃষি বিজ্ঞানী ড. এনায়েত আলী প্রামানিক।

মোস্তাফিজুর রহমান

মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর একটি ভেষজ উদ্ভিদের সন্ধান দিয়ে দেশজুড়ে হইছই ফেলে দিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানী ড. এনায়েত আলী প্রামানিক। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০০৫ সালে কীটতত্ত্ব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। পরবর্তিতে ২০১৯ সালে চীনের চাইনিজ একাডেমি অব সাইন্স থেকে পিএইচডি করেন। তার পিএইচডির বিষয় ছিল মলিকুলার ট্যাক্সোনমি। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের (রাজশাহী, বরেন্দ্র কেন্দ্র) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।

করোনায় কার্যকর ভেষজ উদ্ভিদের সন্ধান, এর প্রয়োগ এবং সাফল্যের পেছনের নানা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা বলেছেন কৃষি বিজ্ঞানী ড. এনায়েত আলী প্রামানিক। যার চুম্বক অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

ড. এনায়েত আলী প্রামানিক জানান, শুধু একটি ভেষজ উদ্ভিদই নয়, তার কাছে আরো চার/পাচঁটি ভেষজ উদ্ভিদের সন্ধান রয়েছে। এসব উদ্ভিদ বিভিন্ন জটিল রোগে ব্যবহার যোগ্য। তবে সব উদ্ভিদ নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া উচিত। এজন্য সরকারের সহযোগীতা চেয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনি দাবি করেছেন ‘মনসাসিজ’ নামে একটি ভেষজ উদ্ভিদের পাতা ব্যবহারে শতভাগ সাফল্য পেয়েছেন। উদ্ভিদটির বিষয়ে শুরুর গল্পটা একটু বলুন?

ড. এনায়েত আলী: আমি শুরু থেকেই বলছি। ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে চীনে থাকাকালীন অনেক কাজ করেছি। পিএইচডি শেষে চীন থেকে ২০২০ সালে ৩০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসি। এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো করোনা। পরবর্তিতে বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। আমি ভাইরাসের ধরণ বিশ্লেষণ করে ‘মনসাসিজ’ নামে গ্রাম অঞ্চলে ‘দুধস্বর’ নামে পরিচিত উদ্ভিদটি সন্ধান করি।

বাংলাদেশ জার্নাল: করোনায় উদ্ভিদটি কার্যকর কিভাবে বুঝলেন?

ড. এনায়েত আলী: কারণ করোনা ভাইরাসের S প্রোটিন ফুসফুসের কোষের এনজিওটেনসিং হিউমান কনভারটিং এনজাইম রিসেপটর-২ এর মাধ্যমে ভিফিউশন পদ্ধতিতে কোষে প্রবেশ করে। এরপর মেসেঞ্জার আরএনএ (RNA) এর দুটি সাব-ইউনিট ৪০s এবং ৬০s এর মধ্যে ৪০s সাবইউনিটের সাথে কমপ্লেক্স তৈরি করে জেনোমিক ভাইরাল আরএনএ সিনথেসিস শুরু করে। এ অবস্থায় আক্রান্ত রোগী যদি এই উদ্ভিদের পাতার রস খাওয়া শুরু করে তাহলে এটি প্রত্যক্ষভাবে ভাইরাল প্রোটিন সিনথেসিসে বাধা প্রদান করবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: কিভাবে উদ্ভিদটি প্রয়োগ শুরু করলেন?

ড. এনায়েত আলী: উদ্ভিদটি ব্যবহার কতটা কার্যকর হবে সেটি তখনও ধারণা ছিল না। পরবর্তিতে আমার দুই ভাই করোনায় আক্রান্ত হোন। এর পরপরই এ উদ্ভিদ প্রথম প্রয়োগ করি। আমার দুই ভাই উদ্ভিদটির পাতা ব্যবহার করে রোগমুক্তি লাভ করেন। তখনই মনে হলো উদ্ভিদটি কার্যকর। উদ্ভিদটির পাতার রস এ্যাজমা, নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিস রোগের প্রতিষেধক হিসাবেও কাজ করে।

বাংলাদেশ জার্নাল: উদ্ভিদটিতে এমন কি উপাদান আছে যার ফলে করোনায় আক্রান্তরা সাফল্য পেলেন?

ড. এনায়েত আলী: ড. এনায়েত আলী: এ উদ্ভিদে প্রায় ২৩ প্রকারের ডাই-টারফিনয়েড ও এক ধরনের গ্লাইকোসাইড রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি ডাইটারপিনয়েডসের এন্টি করোনাল প্রভাব রয়েছে৷ যাতে ৩ বেটা ফ্রাইডেনানল সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। এ উদ্ভিদের কিছু টারফিনয়েড HIV NL4 ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত কোষের প্রতিকারে সাফল্যজনকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: কিভাবে ব্যাপক হারে উদ্ভিদটি প্রয়োগ করলেন?

ড. এনায়েত আলী: আমার দুই ভাই ভালো হওয়ার পর আমার এক মামাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই গাছের পাতা খেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হোন। আমিসহ আমার মেয়ের কাশির সমস্যা ছিলো, এটি ব্যবহারে দ্রুত ভালো হয়ে যায়। এরপর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং একজন ব্যাংকারকে উদ্ভিদটি ব্যবহার করতে বলি। ওনারাও ব্যবহার করে সাফল্য পান।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দুই হাজার মানুষের উপর প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছেন। এটি কিভাবে করলেন?

ড. এনায়েত আলী: প্রথমে আমার পরিবার ও পরিচিতজনরা এই উদ্ভিদের পাতা ব্যবহার করে সাফল্য পান। তারপর এটি আমার এলাকায় (বরেন্দ্র) প্রচার করি। আমার এলাকায় যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তারা সবাই এসে এ উদ্ভিদের পাতা সংগহ করে ব্যবহার করেন। এবং রোগমুক্তি লাভ করেন। তাদের সংখ্যাটা দুই হাজারের কম হবে না। আর এটি ব্যবহার করেছেন কত জন, সেটি যদি বলি তাহলে আরো অনেক হবে। আমি শুধু জানা মানুষদের বিষয়টিই বলছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এতো মানুষের জন্য অনেক উদ্ভিদ লাগার কথা। আপনার কাছে কত সংগ্রহ আছে?

ড. এনায়েত আলী: আমার কাছে বেশকিছু সংগ্রহে ছিলো। যখন সবাই জানলো, আসলেই উদ্ভিদটি করোনায় কাজ করছে। তখন আমার কাছ থেকে অনেকে উদ্ভিদটির পাতা সংগ্রহ করছেন। এছাড়া রাজশাহীতে এ উদ্ভিদের অনেক গাছ রয়েছে বরেন্দ্র এলাকাতেও রয়েছে ৷ যেখান থেকে লোকজন এখন পাতা সংগ্রহ করছে ৷

বাংলাদেশ জার্নাল: এখন এই উদ্ভিদ কোথা থেকে সংগ্রহ করা যাবে। এটি সব জায়গায় পাওয়া যায় কি?

ড. এনায়েত আলী: জ্বি, এটি বাংলাদেশের সব জায়গায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় ব্যাপকহারে পাওয়া যায়। আমি চাচ্ছি, আমাদের কাছে যেগুলো সংগ্রহ আছে সেগুলো নিয়ে সবাই যেন উৎপাদন করে। সবাই উদ্ভিদটি লাগালে আর এটির অভাব থাকবে না।

বাংলাদেশ জার্নাল: ‘মনসাসিজ’ উদ্ভিদটি কিভাবে চিনবে মানুষ?

ড. এনায়েত আলী: গাছটি দেখতে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো। এর কাটা যুক্ত কাণ্ড ট্রাংক এবং শাখা-প্রশাখা রুপান্তরের মাধ্যমে অনিয়মিত (৪-৫ টি ধার) আকার ধারন করে। এটি চেনার উপায় হচ্ছে পাতাটি ডিম্বাকৃতির এবং পাতার বোটার নিচে কাণ্ডের সঙ্গে দুটি কাঁটা থাকবে। সাধারণত গাছের অনুজ অংশ থেকে পাতা বের হয়। পাতা মাংশল প্রকৃতির এবং চিরসবুজ।

বাংলাদেশ জার্নাল: এখন আপনার ইচ্ছে কি?

ড. এনায়েত আলী: আমার একটাই ইচ্ছে উদ্ভিদটি সম্পর্কে সবাই জানুক। এটি ব্যবহার করে সবাই রোগমুক্তি লাভ করুক। এটি আমি চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল: উদ্ভিদটি অন্য কোনো উপায়ে ব্যবহার করা যাবে কি?

ড. এনায়েত আলী: হ্যাঁ, তবে এজন্য গবেষণা করতে হবে। এটি জুস আকারে ব্যবহার করা যাবে। এজন্য বাণ্যিজিক উদ্যোগ দরকার।

বাংলাদেশ জার্নাল: এক্ষেত্রে আপনি কি করছেন?

ড. এনায়েত আলী: আমি আপাতত এ উদ্ভিদটি নিয়ে পেপার্স তৈরি করছি। পেপার্স তৈরি করে প্রকাশ করবো। আর করোনায় আক্রান্ত সবাইকে উদ্ভিদটি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি। এর বাইরে এখনো কিছু করছি না। তবে আমি এখন চীনে থাকলে উদ্ভিদটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালাতে পারতাম। এই উদ্ভিদ ছাড়াও চার/পাচঁটি ভেষজ উদ্ভিদের সন্ধান রয়েছে। এসব উদ্ভিদ বিভিন্ন জটিল রোগে ব্যবহার যোগ্য। এসব নিয়ে গবেষণা করা দরকার। সহযোগীতা দরকার।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনার কেমন সহযোগীতা দরকার?

ড. এনায়েত আলী: প্রথমত গভেষণাগার লাগবে। এর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য গবেষক যারা আছেন তাদের সহযোগীতা লাগবে। এক্ষেত্রে গবেষকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করে দিলে অনেক ভালো হতো। কিন্তু এতো কিছু করা আমার একার পক্ষে সম্ভব না। এজন্য সরকারের সহযোগীতা দরকার।

আরো পড়ুন- করোনা চিকিৎসায় ভেষজ উদ্ভিদে শতভাগ সাফল্য

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত