স্পেসএক্সের আইপিও কেন ক্রিপ্টো বাজারের জন্য নতুন ধাক্কা?
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ১৬:১৭

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির এ নতুন ও আকর্ষণীয় শেয়ারের দিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকে পড়ায় বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার বাজার।
রয়টার্স লিখেছে, মহাকাশ জয়ের পাশাপাশি এআই পাওয়ারহাউস হয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে আসা স্পেসএক্সের এই ব্লকবাস্টার আইপিও একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজি টেনে নিচ্ছে। ফলে বিটকয়েনসহ সার্বিক ক্রিপ্টো বাজারে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে।
মার্কিন ধনকুবের মাস্কের রকেট ও স্যাটেলাইট কোম্পানি স্পেসএক্স এ বছরের শুরুতে তারই এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’-এর সঙ্গে একীভূত হয়েছে। আইপিও’র পর কোম্পানিটির মোট বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা এরইমধ্যে ওয়াল স্ট্রিট ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় তৈরি করেছে।
সাধারণত বড় আইপিওগুলোতে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরই আধিপত্য থাকে। তবে রয়টার্স ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, স্পেসএক্স এবার ব্যতিক্রমী ও বিরল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বা প্রায় ২২৫০ কোটি ডলারের শেয়ার বরাদ্দ রেখেছে।
বাজার বিশ্লেষক ও ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, “স্পেসএক্সের এ আকর্ষণীয় শেয়ার কেনার জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে নিজেদের পুঁজি তুলে নিচ্ছেন।”
এক্ষেত্রে কেবল স্পেসএক্সই নয়, এ বছরেই ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানির শেয়ারও বাজারে আসছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ‘নগদ অর্থ হাতের কাছে জমিয়ে রাখতে ক্রিপ্টো বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন’, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ডিজিটাল মুদ্রার দামের ওপর।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের কাছাকাছি মূল্যে কেনাবেচা হচ্ছে, যা গেল অক্টোবরের রেকর্ড সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৬ হাজার ২২৩ ডলারের চেয়ে প্রায় ৫২ শতাংশ কম।
ক্রিপ্টো ট্রেডিং ও নগদ অর্থ সরবরাহক কোম্পানি ‘জিএসআর’-এর গ্লোবাল হেড অফ ওভার-দ্য-কাউন্টার ট্রেডিং স্পেন্সার হ্যালার্ন বলেছেন, “এ ধরনের বড় বিনিয়োগের জন্য ক্রিপ্টো একটি তহবিল বা ফান্ডিং কারেন্সি হিসেবে কাজ করছে। এ আইপিও’র জন্য ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের সংস্থান করতে হবে এবং সেই অর্থ নিশ্চিতভাবেই কোথাও না কোথাও থেকে আসতে হবে।”
স্পেসএক্সের মাধ্যমে মাস্ক মহাকাশ ভ্রমণকে পুনরায় ফিরিয়ে আনছেন এবং মহাজাগতিক অনুসন্ধানকে লাভজনক এক ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন।
তবে কোম্পানিটি এখন বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এআই তৈরির ক্ষেত্রে আরও বড় সুযোগ খুঁজছে। স্পেসএক্সের আইপিও নথির তথ্য অনুসারে, কোম্পানিটি সার্বিকভাবে এখনও কোনো মুনাফা করতে পারেনি। তাদের এ বড় বাজারমূল্যের পেছনে মূল ভিত্তি মঙ্গল গ্রহ মিশন ও মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার চালুর মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা।
পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় এক ‘এআই পাওয়ারহাউস’ বা এআইয়ের মূল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা, যা আগামী বছরগুলোতে কোম্পানিটিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এনে দেবে।
ক্রিপ্টোনির্বাহীরা বলছেন, এ দূরদর্শী পরিকল্পনাই স্পেসএক্সকে এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ ও জল্পনাকল্পনা নির্ভর এআই বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিণত করেছে। যারা ক্রিপ্টো বাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, এ বিনিয়োগ সম্ভাবনা ঠিক সেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে।
ক্রিপ্টো ট্রেডিং কোম্পানি ‘ইন্ডিগো’র প্রধান নির্বাহী টমাস পুয়েচ বলেছেন, “স্পেসএক্স আইপিও ক্রিপ্টো বাজার থেকে বেশ কিছু পুঁজি টেনে নেবে, অন্তত প্রাথমিক দিনগুলোতে তো বটেই। কারণ উভয় ক্ষেত্রই একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজির বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। ক্রিপ্টোর তুলনায় এআই এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় ব্যবসা।”
ক্রিপ্টো বাজারের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়
শুক্রবার স্পেসএক্সের সম্ভাব্য নাসডাক অভিষেক ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্য এর চেয়ে খারাপ সময়ে আর হতে পারত না। গেল সপ্তাহেই বিটকয়েনের দাম ১৫ শতাংশ কমেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘এফটিএক্স’ ধসে পড়ার পর সবচেয়ে বড় দরপতন।
এ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে মাইকেল স্যালরের কোম্পানি ‘মাইক্রোস্ট্র্যাটেজি’। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কর্পোরেট বিটকয়েনধারী হিসেবে যারা বছরের পর বছর ধরে এ টোকেনটির প্রতি অন্ধ সমর্থন দেখিয়ে আসছিল তারাও গেল সপ্তাহে প্রকাশ করেছে, ২০২২ সালের পর এই প্রথম তারা নিজেদের হোল্ডিংয়ের কিছু অংশ বিক্রি করে দিয়েছে।
‘ট্রেড নেশন’-এর সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট ডেভিড মরিসন নিজের এক গবেষণা নোটে বলেছেন, “বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্রিপ্টো সত্যিই এখন গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।
“অনেক বিনিয়োগকারীর কাছেই বিটকয়েন তার আগের চকমক ও নতুনত্ব হারিয়েছে এবং স্পেসএক্স আইপিওর উন্মাদনাও ক্রিপ্টো বাজারের এ পরিস্থিতিকে কোনো সাহায্য করতে পারছে না।”
আমেরিকার ক্রিপ্টোবান্ধব ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা নেওয়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে ব্যাপক জোয়ার এসেছিল। তবে গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর থেকেই এর দাম হু হু করে কমতে শুরু করে এবং এরপর থেকে বাজারটি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।
অন্যদিকে, একই সময়ে আমেরিকার সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ খাতের বিভিন্ন শেয়ারের দাম প্রায় ১৭০ শতাংশ বেড়েছে।
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ থেকে পুঁজি প্রত্যাহারের পরিমাণও বেড়েছে, যা গত মে মাসেই ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বেশ কয়েকটি ইটিএফ-এর ইনডেক্স সরবরাহকারী কোম্পানি ‘সিএফ বেঞ্চমার্কস’-এর প্রধান নির্বাহী সুই চ্যাং এ তথ্য জানিয়েছেন।
২০২৪ সালে এসব আর্থিক পণ্য প্রথম বাজারে আনার সময় তা ক্রিপ্টোর দাম বাড়াতে এবং এই বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এ পুঁজি সরে যাওয়ার বিষয়ে সুই চ্যাং বলেছেন, “ক্রিপ্টো বাজার থেকে যে অর্থ বেরিয়ে গেছে, তার একটি অংশ শেয়ার বাজারে গিয়ে ঢুকছে।”
তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই অর্থ সরাসরি স্পেসএক্সেই যাবে এমনটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই।
বাজার বিশ্লেষক স্পেন্সার হ্যালার্ন বলেছেন, একদিকে বাজারে যেমন আরও কিছু আকর্ষণীয় আইপিও আসার অপেক্ষায় রয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ এ বছরে সুদের হার আরও বাড়াতে পারে বলে বাজারে গুঞ্জনও জোরালো হচ্ছে।
সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ ও নিশ্চিত মুনাফা দেয় এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ জোড়া ধাক্কার কারণে অদূর ভবিষ্যতে ক্রিপ্টো বাজারের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলেই মনে করছেন সুই চ্যাং।
পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই মুহূর্তে ক্রিপ্টো বাজারের পক্ষে কাজ করবে এমন কোনো ইতিবাচক বা শক্তিশালী হাওয়া দেখা সত্যিই কঠিন।”
বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি










