ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

ভারত ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ চীনা কূটনীতিকের

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ২২:৩৭

ভারত ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ চীনা কূটনীতিকের

বর্তমান শতাব্দীকে অর্থনৈতিকভাবে এশীয়দের জন্য সফল শতাব্দীতে পরিণত করতে দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন কলকাতায় চীনের কনসাল জেনারেল জু উই।

এমন এক সময় চীনের এই কূটনীতিকে এ আহ্বান এল, যখন দুই দেশের সম্পর্ক এক ‘জটিল ও বহুমাত্রিক’ পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে দুই দেশের মধ্যে শীতলতা যেমন রয়েছে, তেমনি বিপুল অংকের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক ফোরামে সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিদ্যমান।

গত ২৬ জুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে জু উই লেখেন, বর্তমান বিশ্ব এক অশান্ত ও জটিল সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। আধিপত্যবাদ এবং সংরক্ষণবাদ বিশ্বজুড়ে শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসনের ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বে ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যার দুই দেশ হিসেবে ভারত-চীনের মধ্যকার সম্পর্কের জটিলতা অবশ্যই অতুলনায় আসা উচিৎ। কারণ বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এশিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল দ্বিপক্ষীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

তিনি লিখেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দুই দেশের যৌথ অবদান ৪০ শতাংশের বেশি, যা আমাদের বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন চীন ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলে প্রাচ্যের এই দুই প্রাচীন পিঠস্থানকে বিশ্বের একটি অন্যতম স্থিতিশীল শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

জু উই বলছেন, চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই’ বা বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের লক্ষ্য হল, উন্নয়নকে বৈশ্বিক এজেন্ডার শীর্ষে নিয়ে আসা; যাতে কোনো দেশই পিছিয়ে না থাকে।

তার ভাষ্য, চীনের এ প্রস্তাব ভারতের ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যের সঙ্গেও পুরোপুরি মিলে যায়; কারণ উভয় দেশই মনে করে, উন্নয়ন হল সব মানুষের একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া সুবিধা নয়।

নিবন্ধে বলা হয়, জিডিআই মূলত ‘উন্মুক্ত, পরিবেশবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রবৃদ্ধির কথা বলে, যা ‘জিরো-সাম’ (এক পক্ষ জিতলে অন্য পক্ষ হারবে) প্রতিযোগিতার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান করে।

জু উই বলেন, আধুনিকায়নের সুফল যেন সবাই পায়, উন্নয়নের এই ধারাগুলোকে সমন্বিত করার মাধ্যমে আমরা তা নিশ্চিত করতে পারি।

দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও মত দেন কলকাতায় চীনের কনসাল জেনারেল।

তিনি বলেন, চীনের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ-জিএসআই বা বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ মূলত সাধারণ, ব্যাপক, সহযোগিতামূলক এবং টেকসই নিরাপত্তার পক্ষে কথা বলে। এর মূল নীতিগুলো- সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, জাতিসংঘ সনদের নীতিগুলোর প্রতি আনুগত্য এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের নিষ্পত্তি ও সরাসরি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতির কথা বলে। এই ধারণা কয়েক দশক আগে ভারত ও চীন যৌথভাবে বিশ্বের সামনে এনেছিল। আমরা দুই প্রতিবেশী একটি বিশাল সীমান্ত ভাগাভাগি করি। ফলে দুই দেশের জন্যই জিএসআই একটি সময়োপযোগী স্মারক। কারণ অন্য দেশের ক্ষতি করে কোনো একক দেশ প্রকৃত নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না। পারস্পরিক মতপার্থক্য দূর করতে পারস্পরিক বিশ্বাসই এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

চীনের ‘গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ’-জিসিআই বা বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ বিশ্বের সভ্যতার বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সমতা, পারস্পরিক শিক্ষা, সংলাপ এবং অন্তর্ভুক্তির প্রসার ঘটায়। এটি ভারতের মূল দর্শন ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ অর্থাৎ ‘সমগ্র বিশ্বই একটি পরিবার’ ধারণার সঙ্গে ‘গভীরভাবে মিলে যায়’ বলে মন্তব্য করেন জু উই।

তিনি বলেন, হাজার হাজার বছর ধরে মানব ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করা দুটি প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে আমরা এই প্রজ্ঞা ধারণ করি যে, কোনো একক সংস্কৃতি সত্যের একচেটিয়া মালিক হতে পারে না। সভ্যতার এই মেলবন্ধন ও পারস্পরিক শিক্ষার মাধ্যমে আমরা দূরত্ব কাটিয়ে উঠতে পারি।

চীনের ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’ (জিজিআই) বা বৈশ্বিক সুশাসন উদ্যোগ প্রসঙ্গে জু উই বলেন, এর লক্ষ্য একটি ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মূল কাজ জাতিসংঘের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা এবং বড় দেশগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। এছাড়াও সবচেয়ে জরুরি কাজ হল শান্তি ও উন্নয়নের চলমান ঘাটতিগুলো পূরণ করা।

তিনি বলেন, সব দেশকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমান আলোচনায় অংশ নিতে হবে। কোনো দেশই যেমন নিজেকে বৈশ্বিক সুশাসন ব্যবস্থার বাইরে রেখে উন্নয়ন করতে পারে না, তেমনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়াও কেউ নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে না। কৃত্রিমভাবে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা কেবল সংঘাতেরই জন্ম দেয়।

এশিয়ার প্রধান দুটি দেশ হিসেবে এ মহাদেশের শান্তি, সহযোগিতা এবং সংহতি রক্ষা করার বড় দায়িত্ব চীন ও ভারতের কাঁধে বলে মনে করেন এই কূটনীতিক।

তিনি বলেন, আমাদের একে অপরের মূল স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা, সমর্থন রাখতে হবে। যতদিন আমরা একসঙ্গে সফল হব, ততদিন বৈশ্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক শক্তি জোগাতে পারব। আমরা একসঙ্গে মিলেই এই ‘এশীয় শতাব্দী’-কে সবার জন্য একটি বাস্তব পরিস্থিতিতে রূপান্তর করতে পারি।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত