ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৫৯

প্রিন্ট

আবারও কি ক্ষমতায় আসছেন জাস্টিন ট্রুডো?

আবারও কি ক্ষমতায় আসছেন জাস্টিন ট্রুডো?
অনলাইন ডেস্ক

কানাডায় চার বছর আগে ব্যাপক পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে বিশাল এক বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। দিন কয়েক পরেই ফের সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেশটিতে। লিবারেল পার্টির এই নেতা কানাডার জনগণের সমর্থন নিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসতে পারবেন কিনা তা নিয়েই চলছে জল্পনা কল্পনা।

ট্রুডো কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন চার বছর আগে। প্রথম দিনেই তিনি তার মন্ত্রিসভায় নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন। নিজের সেই পদক্ষেপের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন ‘কারণ এটা ২০১৫ সাল’। তখন তার মুখ থেকে উচ্চারিত ওই তিনটা শব্দ সারা বিশ্বে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

এরপর প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সেলফি তুলেছেন, ভোগ ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদনের বিষয় হয়েছেন, যেখানে তাকে কানাডার রাজনীতির নতুন তরুণ মুখ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দক্ষিণের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদে প্রত্যাশা করা হয় যে, মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতা হতে পারেন মি. ট্রুডো- যিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নতুন ধরণের জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে, জলবায়ু পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে জোরালো কণ্ঠ এবং সামাজিক নানা বিষয়, অভিবাসনের পক্ষে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ধারণ করেন।

কিন্তু এটা ২০১৯ সাল এবং এখনকার ভোটাররা ট্রুডোর লিবারেলকে আর চার বছর আগের মতো করে দেখেন না। কারণ তখন দেশটি গত প্রায় এক দশক ধরেপরিচালিত হচ্ছিলো রক্ষণশীল নেতা স্টিফেন হারপারের নেতৃত্বে। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারটা তার প্রতি অনেকটা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।

ক্ষমতায় আসার পর ট্রুডোর প্রথম ফেডারেল কর্মসূচি ছিল জোরালো প্রতিশ্রুতি- বিনোদনের জন্য গাজাকে বৈধতা দেয়া, ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজার সিরিয়ান শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া এবং কানাডার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর মতো পদক্ষেপ। ভোটাররা তার এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন জুগিয়েছে, যা ছিল আগের প্রধানমন্ত্রী হারপারের একেবারে বিপরীত।

এ সপ্তাহে ফেডারেল কর্মসূচি শুরুর সময়. ট্রুডো তার বিজয়ী রাতের বক্তব্যে আবার ফিরে যান এবং আবারো হারপারের সময় ফিরে আসার ব্যাপারে ভোটারদের সতর্ক করে দেন।

কানাডায় চার রাজনৈতিক দলের নেতা

তিনি নিজ দলের প্রশংসা করে বলেন. ‘কানাডার জনগণ একটি নতুন দলকে বাছাই করেছে, মানুষ এবং নিজেদের সমাজের পেছনে বিনিয়োগ করতে চাইছে, যে দল বুঝতে পারে যে, বিশ্বের সেরা দেশটিতে বসবাসের পাশাপাশি সেটিকে আরো সেরা করে তোলা যায়। যদিও এখনো আমাদের অনেক কাজ করার বাকি রয়েছে। তবে গত চারবছর ধরে আমরা সবকিছু আরো উন্নত করার চেষ্টা করেছি এবং সেটা প্রমাণ করার মতো তথ্য আমাদের রয়েছে।’

তবে ট্রুডো এসব দাবি করলেও তার সরকারের সময়কে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন স্টিফেনসন। গত বছরের এসএনসি- লাভালিনের নৈতিকতাজনিত কেলেঙ্কারির বড় প্রভাব পড়েছে তার সমর্থনের ওপর।

গত মাসে নৈতিকতা বিষয়ক একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা দেখতে পেয়েছে, কানাডার বৃহৎ প্রকৌশল কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের ফৌজদারি মামলার ব্যাপারে সাবেক একজন মন্ত্রীকে অন্যায্যভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। অগাস্ট মাসে অ্যাঙ্গুস রেইড ইন্সটিটিউট বলেছে, কানাডার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ তার এই কাজকে অনুমোদন দিয়েছে আর ৬০ শতাংশ অনুমোদন করেনি।

গত শরতে ওই ঘটনার সময় লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে পরে দলটি কিছুটা সমর্থন ফিরে পেয়েছে এবং এখন জাতীয় নির্বাচনে রক্ষণশীল দলের সঙ্গে বেশ শক্ত লড়াই শুরু করেছে। তার যেসব সিদ্ধান্তে প্রগতিশীলরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সেসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও ট্রুডোকে ব্যাখ্যা করতে হবে।

ট্রান্স মাউন্টেন ওয়েল পাইপলাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পে তার সমর্থন দেয়া এবং পাইপলাইন অবকাঠামো ক্রয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছে পরিবেশবাদীরা। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাস ২০০৫ মাত্রার নীচে নামিয়ে আনতে প্যারিস চুক্তিতে সম্মত হলেও, দেশটি সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো যথেষ্ট কাজ করতে পারেনি।

নির্বাচনী সংস্কারের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি শুরুর পরপরই বাতিল করা হয়, যা অনেক বাম ঘরানার ভোটারকে ক্ষুব্ধ করেছে, যারা আশা করছিলেন যে, বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে হাউজ অব কমন্সে নির্বাচিত হওয়ার রীতির বদল হবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে করা বিতর্কিত একটি অস্ত্র চুক্তি বাতিল না করার জন্যও সমালোচনার শিকার হয়েছেন ট্রুডো।

বিরোধী বামপন্থী দল এনডিপির নেতা জগমিৎ সিং মি. ট্রুডোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘তার মিষ্টি কথা থাকলেও কোন প্রতিশ্রুতি নেই।’

তবে সাবেক লিবারেল নেতা বব রে বলছেন, ট্রুডো অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজের এবং কানাডার একটি পরিচিতি তুলে ধরেছেন। অন্য দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বলা যেতে পারে যে, তিনি (জাস্টিন ট্রুডো) এটা বোঝাতে পেরেছেন যে, তিনি কে এবং তার দেশ কেমন? বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তুলনা করা যায়।’

তার সরকার বেশ কয়েকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। গাজাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, কানাডার মানবাধিকার আইনের ফলে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিষয় আলোচনায় আনলে, উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে কানাডা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাজারের ব্যাপারে রক্ষণশীল নীতি নেয়ার চেষ্টা করেছে। কানাডায় বেকারত্ব ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন কম।

এখন প্রশ্ন হলো, ট্রুডো কি মধ্য-বাম এবং বামপন্থী প্রগতিশীল ভোটারদের তার নিজের এবং লিবারেল পার্টির সমর্থনে নিয়ে আসতে পারবেন, যেমনটা হয়েছিল চার বছর আগে।

লিবারেল এবং কনজারভেটিভদের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য বোঝানোর জন্য ট্রুডো প্রতিটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি এনডিপি, গ্রিন পার্টি, ব্লক কুইবেকোসিস দলগুলোকে লিবারেল পার্টির ব্যানারে নিয়ে এসে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি তিনি এই চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছেন যেন, লিবারেল ভোটাররা অবশ্যই ভোটকেন্দ্রে আসে। যদি প্রগতিশীলদের ভোট ভাগ হয়ে যায়, তাহলে তার সুবিধা পাবে রক্ষণশীলরা।

কানাডার নির্বাচনের বাকি রয়েছে আর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। আগামী ২১ অক্টোবর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যার জন্য এখন উত্তেজনাকর প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে দলগুলো। আর প্রচারণায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ট্রুডো।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ভোটার সমৃদ্ধ কুইবেক ও অন্টারিও প্রদেশে এগিয়ে রয়েছেন লিবারেল প্রার্থীরা। হাউজ অব কমন্সের ৩৩৮টি আসনের মধ্যে ১৯৯টি আসন রয়েছে এই দুইটি প্রদেশে। আর কানাডার একটিা নিয়ম হচ্ছে কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ কোন সরকারকে এক মেয়াদের পরে ক্ষমতা থেকে সরতে হয় না। তাই ট্রাডোর ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে আশাবাদী তার ভক্ত ও সমর্থকরা। আর প্রধানমন্ত্রী নিজেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণাকে।

কেননা তিনি মনে করেন, ‘যারা এই নির্বাচনের প্রচারণায় অবহেলা করবে, তারা বড় ধরণের ভুল করবে।’

কানাডায় গাজার দোকান

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত