ঢাকা, শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২২:০০

প্রিন্ট

কিয়াস আহমেদের একগুচ্ছ কবিতা

কিয়াস আহমেদের একগুচ্ছ কবিতা
শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক

(অপবাদ)

১ আমি বাদে, আমার সাতজন বন্ধু, একটা সাপ মেরে ফেলেছে, মরা সাপটাকে পানিতে ফেলে দেবার আগে, তারা ভাবছে, সাপটা আবার বেঁচে যেতে পারে, তাই, তারা সবাই মিলে, জ্বালানি কাঠে আগুন জ্বালিয়ে, সাপটাকে পুড়িয়ে ফেলছে, পোড়া সাপটার চারপাশে দাঁড়িয়ে, উল্লাস করছে।

আমি বাদে, আমার সাতজন বন্ধু, ওরা কেউ জানে না, সাপটা আমি, আমাকে অন্যকেউ, সাপের রূপ দিয়েছে।

২ অন্যের অপবাদ মাথায় নিয়ে, বহুবার মানুষের পোশাক হারিয়ে ফেলেছি, মানুষের কাছে গিয়ে, বহুবার মার খেয়েছি, মার খেয়ে বেশ কয়েকবার মরেও গিয়েছি, কিন্ত, কিচ্ছু বলিনি।

এই তো কয়েকদিন আগে, সোনালি একটা কুকুরের পোশাক পরে, যেই ক্রাউন বাজারে গিয়েছি, ওমনি কয়েকজন সমাজসেবী এসে, আমাকে মেরে ফেলেছে, কিন্তু আমি, কিচ্ছু বলিনি।

কেনো বলনো? কুকুর হয়ে রাস্তায় গেলেই, আমাকে কেনো মারতে হবে?

৩ মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে, বেঁচে থাকার জন্যে, আপনি একটা সাপ হয়ে, সুন্দর একটা জীবন কাটাতে পারেন, চলে যেতে পারেন, মানুষের শহর ছেড়ে অনেক দূরে, সুন্দর একটা বনে। যেই বনে পাহাড় আছে, ঝর্ণা আছে, বড়-বড় অনেক গাছ আছে। আপনার মতো আরও অনেকরকম সাপ আছে।

আপনি একটা গাছের ছায়ায়, মন উদাস করা দুপুরে, ঝর্ণার কলকল জলের শব্দে, ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, কাটিয়ে দিতে পারেন, সুন্দর একটা জীবন-

যদি না, আপনার চেয়ে বড় একটা সাপ এসে, আপনাকে আস্ত গিলে ফেলে।

(বাবার সাথে ফেরা)

বৃদ্ধ বাবা যাদের নাম ভুলে গেছেন, আমি তাদের একজন, আমি আমার বাবার সেই সন্তান, যাকে বাবা নিজ হাতে কর্মস্থলে রেখে গেছেন, আর কোনোদিন নিতে আসেননি,

আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করি, আর ঘুমোতে যাবার আগে চিন্তা করি, আমার কথা বাবার একদিন মনে পড়বে, মনে পড়বে তার এক ছেলে আছে, যাকে কর্মস্থলে রেখে এসেছে, আর কোনোদিন নিতে আসেনি,

বৃদ্ধ বাবার একদিন মনে পড়বে আমার কথা, তখন হয়তো শীতের রাত, অথবা বাহিরে খুব বৃষ্টি হবে, বৃষ্টিতে ভিজে বাবা আমাকে নিতে আসবে, দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দেবে, খোকা আমি তোকে নিতে এসেছি, বাড়িতে তোর মা খুব কাঁদছে,

তুই জীবন থেকে বেরিয়ে আয়।

(অজানা ভয়)

আমি ফুঁ দিলে একটা কাক হঠাৎ ময়ূর হয়ে উড়ে যায়। আর তুমি একটা উড়ে যাওয়া ময়ূর দেখে হাত বাড়িয়ে দিলে, সাথে সাথে সেটা পঙ্খিরাজ হয়ে যায়,

কিন্ত আমরা কেউই বিষয়টা জানি না, তাই আমি কখনও কাক দেখে ফু্ঁ দেই না, আর তুমি কখনও ময়ূর দেখে হাত বাড়িয়ে দাও না।

তবুও আমার মাঝেমধ্যেই মনে হয়, হাত বাড়িয়ে দিতে তোমার এতো কীসের ভয়?

(ভাঙা সংসারের আয়না)

'খারাপের কোনো শেষ নেই' যেমন 'ভালোর কোনো শেষ নেই' ভালো ঘর, ভালো খাট - ভালো আলমারি- আলনা আয়না ইত্যাদি' যদিও ভালোর কোনো শেষ নেই' তাই বউ বললো, আর একটু ভালো ঘর হলে সংসার করা যেতো, এই বলে বউ চলে গেলো, ভালো ঘর বলতে বউ কী বোঝাতে চেয়েছিলো? বন্ধুরা বললো, হয়তো আর একটু ভালো খাট, বা ভালো আলমারি- আলনা, অথবা ওই আয়নাটাই অলক্ষ্মী,

একদিন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজেকে দেখতে গেলাম, কিন্ত কিছুই দেখতে পেলাম না, আমিও জানি, অন্ধকারে আয়নায় কিছুই দেখা যায় না, তবুও আমি কিছুটা ভয় পেলাম, ভয়ে - ভয়ে আলমারির কাছে গেলাম, দেখলাম, আলমারিটা বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে, আমি আলনার কাছে গেলাম, দেখলাম, আলনাটা বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে, আমি বিছানা খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্ত খুঁজে পেলাম না, আমার সামনে ঝুলে রইলো আয়না, সেই আয়নাও বউ সেজে খিলখিল করে হাসছে, তখন বন্ধুদের কথা মনে পড়লো, হয় তো ওই আয়নাটাই অলক্ষ্মী।

পরেরদিন সকালে আয়নাটা বেচার জন্য বাজারে গেলাম, অনেকক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকার পর একজন নারী আয়নাটা হাতে নিলো, আমি তাকে চিনতে পারলাম, সে তার ব্লাউজের ভিতর থেকে টাকা বের করে আমাকে দিয়ে বললো, এই টাকায় হবে তো? আমি টাকা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম, সে আমার বউ, আমার কাছ থেকে আমার ঘরের আয়না কিনছে! আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বউ আবার বললো, এই টাকায় হবে? আমি বললাম হ্যাঁ হবে,

বউ বললো এই আয়নাটার মায়া ছাড়তে পারছিলাম না বলে, তোমার ঘরে ফিরে যাচ্ছিলাম, আর তুমি কিনা এই আয়নাটাই বেচে দিতে এলে!

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত