ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৯, ১৫:৫৮

প্রিন্ট

নেশা ছাড়া মনের ব্যাপার

নেশা ছাড়া মনের ব্যাপার
এহসানুল হক মিথুন

নেশা হচ্ছে এমন একটি ব্যাপার যা মানুষের মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশ মাদক দ্রব্যের উৎপাদক ও নয়, বিক্রেতা ও নয়, কিন্তু প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মাদক দ্রব্য এদেশে আসে। সাধারণত যাদের মধ্যে সচেতনতা কম বা সুশিক্ষার হার কম সে সব পরিবারের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা লক্ষণীয়। যেসব দেশ মাদক দ্রব্য উৎপাদন বা বিক্রি করে তারা কিন্তু নিজেরা নেশা করে না। আবার ব্যাপারটা হয়তো এমন যে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অন্য কোনো দেশ বা রাষ্ট্র বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য বাংলাদেশে মাদক দ্রব্য ঢুকিয়ে দিচ্ছে, এক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য এধরনের নীরব যুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

এক শ্রেণীর ক্ষুদ্র স্বার্থলোভী লোকের হীনমন্যতার কারণে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এদেশে মাদক দ্রব্য প্রবেশ করে, যেসব বড় বড় মাফিয়াদের মাধ্যমে মাদক দ্রব্য এদেশে প্রবেশ করে, মূলত তারা কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ধরা পড়লে যারা মাঠকর্মী তারাই ধরা পরে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের কারাদণ্ড হয়, আর না হয় ক্রসফায়ার। এবার আসা যাক যারা নেশা করে তাদের কথায়, মূলত যুবসমাজের মধ্যেই নেশা করার প্রবণতা বেশি। নেশাখোরদের পারিবারিক শিক্ষা কম থাকে, আর এসব পরিবার সাধারণত সচেতন নয়, তাছাড়া এমনও পরিবার রয়েছে যেসব পরিবারের লোকজন তাদের তরুণ ছেলে-মেয়ে বা ভাই-বোনদের তেমন সময় দিতে পারে না, বিধায় তাদের মধ্যে নৈকট্য ও পারস্পারিক বোঝাপড়া কম, দূরত্ব কেবল বাড়ে, আর এই দূরত্বের সুযোগে এসব পরিবারের তরুণ-তরুণীরা মাদকের দিকে ধাবিত হয়। নেশা করার কারণে তারা নিজেরা ধ্বংস হয়, তাদের পরিবারও ধ্বংস হয়, সমাজে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়।

সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষ হচ্ছে শিকলের এক একটি রিঙ, যেখানে একটি রিঙ যদি ভেঙ্গে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে সম্পূর্ণ শিকলে অর্থাৎ গোটা সমাজেই তার প্রভাব পরে। মাদকের প্রভাবে সমাজে রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, খুন, নারী নির্যাতন প্রভৃতি ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। কিন্তু এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা ঘটনার প্রভাব কেবল এখানেই থেমে থাকে না, যারা মাদক গ্রহণ করে পরবর্তীতে তাদের সন্তানের মধ্যেও জেনেটিক্যালি এসবের প্রভাব রয়ে যায়। তাদের মধ্যেও নেশা করার প্রবণতা থাকে কিংবা জেনেটিক্যালি তারাও অপরাধী মনোভাব নিয়ে জন্মায়। অর্থাৎ মাদকের কুপ্রভাব থেকে সহজে এ সমাজ, পরিবার ও জনগণ রক্ষা পায় না। তাছাড়া দেশের অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে মাদক বাধা হয়ে দাড়ায়। এদেশের প্রতিটি মানুষ হচ্ছে দেশের জনশক্তি বা মানবসম্পদ। যারা মাদক গ্রহণ করে তাদের বেশিরভাগই স্বাবলম্বী নয় বা কাজ-কর্মে তেমন সক্রিয় নয়, তারা পরিবারের উপর নির্ভরশীল।

আবার মাদক ব্যবসায় বা মাদকাসক্ত হয়ে যারা জেলে যান ও যারা সাজা প্রাপ্ত হয়নি, জেলের মধ্যে সেসব বেকারদের অন্ন যোগাতে সরকারের প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় হয়। তাই ক্রসফায়ার বা জেল মাদকের সুনিশ্চিত সমাধান নয়। এদেশের জনশক্তির একটি অংশ মাদকের কুপ্রভাবে বেকার অবস্থায় পরে থাকে। এসব বেকারদের কারণে দেশের নীট উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়। অথচ সঠিক সচেতনতায় ও পারিবারিক পরিচর্যায় প্রতিটি মানুষ হয়ে উঠতে পারে দেশের এক একটি মূল্যবান জনসম্পদ।

যেসব মাফিয়াচক্রের কারণে দেশে মাদক প্রবেশ করছে ও সারা দেশে ছড়িয়ে পরছে শুধু একা তাদের দোষ না দিয়ে প্রত্যেকটি পরিবারের উচিত নিজেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, বাল্যকাল থেকেই সন্তানকে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, নৈতিক শিক্ষা দেয়া। কর্তৃপক্ষের উচিত মাদকের কুপ্রভাব সম্পর্কে মিডিয়াতে প্রচার করা, প্রয়োজনে এব্যাপারে নাটক, চলচ্চিত্র, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমে মাদকের কুপ্রভাব সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করা, আরো মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা। মাদক নিরাময়ের জন্য প্রয়োজনে বাইরের দেশ হতে উন্নতমানের ও নির্ভেজাল ঔষধ ক্রয় করা যেতে পারে। আর প্রতিটি পরিবারের উচিত যদি সেই পরিবারে মাদকাসক্ত কেউ থেকে থাকে তাহলে জরুরীভিত্তিতে চিকিৎসা সেবা দেয়া। নেশা যেহেতু মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাপার, এক্ষেত্রে হয়তো এলোপ্যাথিক ঔষধের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক ঔষধও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে, তাছাড়া হোমিওপ্যাথিক ঔষধে ব্যয়ও কম। ১৯৭১ এ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি, কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছরে আমরা কতটুকু স্বাধীন হতে পেরেছি, আমরা নিজেদেরকে কতটুকু মাদকমুক্ত রাখতে পেরেছি?

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close