ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭ আপডেট : ৫৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২০, ২০:০১

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে বিদিশা (পর্ব-২)

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিতর্কিত

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিতর্কিত
শেখ তৌফিকুর রহমান

দেশের রাজনীতিতে আলোচিত চরিত্র বিদিশা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী হিসেবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এক সময় চমক হয়ে এসেছিলেন। তার কথায় জাতীয় পার্টির কার্যক্রম চলতো। রাজনীতিতে বেশ এগিয়ে ছিলেন তিনি, কিন্তু হঠাৎ সব কিছু থেমে যায়। শুধু রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েননি, তাকে তালাক দেন এরশাদ। মোবাইল চুরির মামলায় বিদিশাকে যেতে হয় জেলে। তার জেল-হাজতবাস এবং এরশাদের সঙ্গে সংসার করা নিয়ে করে ‘শত্রুর সঙ্গে বসবাস’ নামে একটি বই লেখেন, যেখানে তার প্রতি এরশাদ এবং তখনকার হাজতবাসের নির্যাতনের করুণ কাহিনী উঠে এসেছে।

এরশাদ-বিদিশার এক সন্তান রয়েছে, নাম এরিক এরশাদ। এই সন্তানের সূত্র ধরে পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে কম-বেশি কথাবার্তা হতো। তবে বিদিশা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। মৃত্যুর আগে ট্রাস্ট করে এরিকের নামে সম্পত্তি রেখে যান সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ। এরিক থাকেন রাজধানীর বারিধারার কূটনীতিকপাড়ার ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’-এ। সেই সূত্র ধরে সেখানে বিদিশার বসবাস। দীর্ঘ দিন জাতীয় পার্টিতে নিস্ক্রিয় থাকার পর রাজনীতিতে আবারো সক্রিয় হতে চান তিনি। অংশ নিতে চান ঢাকা ১৮ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে।

রাজনীতিতে আবারো সক্রিয়তা, সন্তান এরিকের সঙ্গে বসবাস, তার বিরুদ্ধে এরশাদসহ অনেকের করা বিভিন্ন অভিযোগের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন বিদিশা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বাসভবনে বিদিশার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশ জার্নালের নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ তৌফিকুর রহমান। দুই পর্বের স্বাক্ষাতকারের দ্বিতীয় পর্ব আজ পাঠকের মাঝে তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কি চান যে আপনি রাজনীতিতে আসেন?

বিদিশা: জাতীয় পার্টির কোন নেতা চাইলো আর কোন নেতা চাইলো না এটা বিষয় নয়। আর জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানই বিতর্কিত। তার নামেই হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সেটা এখনো ফয়সালা হয়নি। সেটা বিচারের অপেক্ষায় আছে যে, তিনি বৈধ চেয়ারম্যান নাকি অবৈধ চেয়ারম্যান। সম্প্রতি তিনি মন্তব্য করেছেন যে জাতীয় পার্টিতে আমার নাকি প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন আছে কি নেই সেটা সময়ই বলে দেবে। সেটা জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলে দেবে, রংপুরের মানুষ বলে দেবে, জনগণ বলবে। জরিপ করা হোক উনার জনপ্রিয়তা আর আমার জনপ্রিয়তা।

বাংলাদেশ জার্নাল: যদি চেয়ারম্যান হিসেবে তার (জিএম কাদের) বিষয়টি বিচারাধীন হয়, তাহলে তিনি কিভাবে সাইনিং পাওয়ারটা পেলেন? কিভাবে তিনি মসিউর রহমান রাঙ্গা সাহেবকে পদচ্যুত করলেন?

বিদিশা: কোনো সাইনিং পাওয়ার কেউ তাকে দেয়নি। তিনি যেটা করবেন সবই অবৈধ।

বাংলাদেশ জার্নাল: জিএম কাদের সাহেবের কর্মকাণ্ড যদি অবৈধ হয়, তাহলে কেন আপনারা প্রতিবাদ করছেন না?

বিদিশা: এটা নিশ্চয় হবে, কেন হবে না? পার্টিতে একটা বড় রেভ্যুলেশন আসছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি রাজনৈতিক দলে রেভ্যুলেশন আসা মানে সেই দল খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়া। তাহলে কি জাতীয় পার্টিতে আবারো বিভক্তি আসছে, অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে দলটি?

বিদিশা: মূল ধারার জাতীয় পার্টি, এরশাদের আদর্শের জাতীয় পার্টি থাকবে। এই উপমহাদেশে কখনো দেখা যায়নি যে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতির হাল কখনো ভায়েরা ধরে। সন্তানরা ধরে থাকে বলে আমরা দেখে আসছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীও ধরে থাকেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনি কি তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেস কফারেন্স করে রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন? নাকি আসন্ন উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সক্রিয় হবেন?

বিদিশা: দেখা যাক। সময়ই বলে দেবে, কোন সময় কী করবো। আমি যে এখন ইন্টারভিউ দিচ্ছি সেই ডিসিশন গতকাল রাতে হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনার বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের ৪ জুন মিথ্যা চুরি ও প্রতারণার মামলা দায়ের করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেব। এখন কি উনার নামেই রাজনীতি করবেন নাকি অন্যভাবে?

বিদিশা: উনি নিজে সেটা করেননি। উনার কিছু লোকজন আমার নামে মোবাইল চুরির অভিযোগ করাতে বাধ্য করিয়েছেন। রাজনীতিতে তো হাড়িপাতিল চুরির অভিযোগেও মামলা হয়েছে। এরপরেও তো রাজনীতি হয়েছে। রাজনীতিতে আমার আসা এরশাদ সাহেবের হাত ধরেই। আমাদের রাজনীতির অভিভাবক উনি। বিভিন্ন জনসভা বা কর্মসূচিতে উনি আমাকে নিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: মামলাটা কি তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো?

বিদিশা: হ্যা অবশ্যই। আমাদের ব্রেকআপটাও রাজনৈতিকভাবেই ছিলো। কিন্তু শেষের দিকে আমাদের কিন্তু খুবই ভালো সম্পর্ক হয়েছিলো।

বাংলাদেশ জার্নাল: রাজনীতিতে আপনি নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করতে চান?

বিদিশা: একদম স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতিতে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাই। জনগণের কাছে আমি স্বচ্ছ থাকবো। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে আমার ব্যক্তি সম্পদ কী আছে তারা দেখুক, আর বিদায় নেয়ার পরে কী থাকে সেটাও তারা দেখবে বলে আশা রাখি। এই মুহূর্তে নতুন করে কোনো সম্পদ গড়ার চাহিদা আমার নেই। এখন আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। রাজনীতির পাশাপাশি আমি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনি আর কী ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত?

বিদিশা: দুর্নীতিমুক্ত দেশের উন্নয়নই আমার লক্ষ্য। তরুণদের শক্তি এবং অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই। আমি দেশের বাইরে থেকে পড়াশোনা করে এসেছি। যে কারণে একটু অন্যভাবে চিন্তা করি। পরিবেশবান্ধব সবকিছু করতে চাই। দেশের জলবায়ু এবং পরিবেশ রক্ষায় গাছ রোপণ, বৃষ্টির পানিকে সর্বত্র কাজে লাগাতে চাই। যেমন- ভারতের সিকিমে ঝরণার ও বৃষ্টির পানিকে কাজে লাগিয়ে খাওয়া-গোসল সবকিছুই করছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: ভবিষ্যতে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব আপনার কাছে এলে আপনি সফল হবেন বলে মনে করেন?

বিদিশা: আমি মনে করি নেতৃত্বে না এসেই আমি সফল। দেশের মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছে। রাজনৈতিবিদ হিসেবে, সমাজকর্মী হিসেবে সব ক্ষেত্রেই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এরশাদ সাহেব আমাকে নিজে রাজনীতিতে এনেছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছেন। আমাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতীয় পার্টিকে রিপ্রেজেন্ট করেছি। জাতীয় পার্টির ফরেন পলিসি বলতে যা বুঝায় আর কি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এখন জাতীয় পার্টির ফরেন পলিসি কেমন?

বিদিশা: জাতীয় পার্টি বলতে গেলে তো নাই, তার আবার ফরেন পলিসি। এরশাদ সাহেব মারা যওয়ার পরে জাতীয় পার্টি ঘুমিয়ে গেছে। এরশাদ সাহেব বেঁচে থাকতে জাতীয় পার্টির ঢেউ সচল ছিলো, বিভিন্ন দেশের এম্বেসেডররা আসছেন, কথা বলেছেন, হাই হ্যালো ছিলো। এখন আমি এগুলো দেখি না।

বাংলাদেশ জার্নাল: আপনি কি নতুনভাবে সেটা শুরু করবেন?

বিদিশা: আমার সাথে সবার যোগাযোগ রয়েছে। আমার তো বন্ধু-বান্ধব রয়েছে সেখানে। আমি সম্প্রতি মিলাদ দিয়েছি, সেখানে আমেরিকান এম্বেসি থেকে লোকজন এসেছে। সবাই দেখতে চায় আমি রাষ্ট্রের জন্য, আপামর জনসাধারণের জন্য কিছু করি।

বাংলাদেশ জার্নাল: ভবিষ্যত রাজনীতির নেতৃত্বে এলে কি লাভ হবে?

বিদিশা: আমাদের দেশের বড় অংশ অবহেলিত। আমি দেশের বেদে সম্প্রদায়, হিজড়া জনগোষ্ঠী এবং সেক্স ওয়ার্কারদের জন্য কাজ করি। এদের জন্য একটা রিপ্রেজেনটিভ প্রয়োজন। তাদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতীয় পার্টির ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়তা খুব কম। আপনি বিষয়টা কীভাবে দেখছেন।

বিদিশা: আমি নেতৃত্বে এলে অবশ্যই এই দিকটা বিবেচনা করবো। আমি কখনোই চাইবো না ছাত্ররা কোনো বাজে কাজে ব্যবহৃত হোক। তাদের দিয়ে মারামারি করানো, কোপাকোপি করানো, রগকাটা যেটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, সেগুলো হতে দেবো না। আমি মনে করি জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠনসহ সব সংগঠনের সক্রিয় থাকা উচিত। অবহেলিত মানুষের যাতে কথা বলার সুযোগ থাকে, যদিও এরশাদ সাহেব বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা তো আছেই, তারপরেও যেটা আছে, আমি প্রধানমন্ত্রীর যেটা সবচেয়ে প্রশংসা করি সব ধর্মের মানুষ এদেশে তাদের উৎসবটা পালন করতে পারে। তারা সেইফলি কাজ করতে পারেন, এই সরকার আসার পরে মানুষের প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছে। আমি উনাকে ফলো করি।

বাংলাদেশ জার্নাল: চেয়ারম্যান কেন আপনাকে জাতীয় পার্টিতে অন্তর্ভুক্তি করতে চাইছেন না?

বিদিশা: একটাই কারণ, সেটা আমার জনপ্রিয়তা। আমার যে এনার্জি, আমার যে স্পিড, সেটা তিনি আটকাতে পারবেন না। উনি আমাকে ভয় পান।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসটি/আরকে

আরো পড়ুন: জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের জন্য আমাকে প্রয়োজন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত