ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ৩৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:২০

প্রিন্ট

করোনাকালে কেমন আছেন ইউরোপ প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা?

করোনাকালে কেমন আছেন ইউরোপ প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা?
রাকিব হাসান রাফি

কোভিড-১৯ নিঃসন্দেহে বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দুর্যোগের নাম। কোনো ধরণের অস্ত্র নয়, নয় কোনও ধরণের পারমাণবিক যুদ্ধ; সামান্য কয়েক ন্যানোমিটারের এক ক্ষুদ্র আলোক আণুবীক্ষণিক বস্তুর কাছে গোটা পৃথিবীর মানুষ আজ অসহায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গোটা বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে নিষ্ঠুর থাবা বসিয়েছে এ করোনা ভাইরাস। একদিকে প্রতিনিয়ত যেখানে নতুন করে গোটা পৃথিবীতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। এছাড়াও কোভিড-১৯ পরিস্থিতি গোটা পৃথিবীকে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে যা আগামী দিনগুলোতে আমাদের সকলের জন্য হতে চলেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

গত ৩১ জানুয়ারি ইউরোপে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। ইতালির রাজধানী রোমে সর্বপ্রথম এক চীনা পর্যটকের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। দুই মাসের ব্যবধানে পুরো ইতালির চিত্র সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় গোটা ইতালি এবং এক সময় প্রতিবেশি ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়াসহ ধীরে ধীরে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে ইউরোপে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও গত জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আবারো করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হতে থাকে। অনেকে একে করোনার ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, গ্রিস, মন্টিনিগ্রো, অস্ট্রিয়া এ সকল দেশ প্রথম ধাপে করোনা মোকাবেলায় যেখানে ছিলো অনেকটা সফল দ্বিতীয় ধাপে এ সকল দেশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।

ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থী। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি বলতে গেলে তাদের গলায় ফাঁসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও যারা বিভিন্ন স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অধীনে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করছেন, তারা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন।

প্রথমত করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করার জন্য ইউরোপের দেশগুলো লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা জারি করে যার পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক প্লেসগুলোতে মানুষের যাতায়াতের ওপর এক ধরণের বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশ নিজের খরচে পড়াশুনা করেন যাদেরকে আমরা সেলফ ফাইন্যান্সিং স্টুডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি। এদের অনেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করেন। মূলত নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানোর জন্য তারা অবসর সময়ে বিভিন্ন ধরণের পেশাভিত্তিক কাজের সন্ধান করে থাকেন ইউরোপে আসার পর। অনেকে আবার পার্টটাইম কাজের মাধ্যমে নিজেদের টিউশন ফি জোগাড়ের এক প্রচেষ্টা চালান। ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজের জন্য বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট কিংবা কফিশপ অথবা পানশালাকে বেছে নেন। কেননা রেস্টুরেন্ট কিংবা কফিশপ অথবা পানশালায় কাজ করতে হলে তেমন কোনও শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে না এবং ওয়েটার ছাড়া অন্য কোনও পদে কাজ করতে হলে স্থানীয় ভাষা কিংবা বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না।

লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থার কারণে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্ট, কফিশপ এবং পানশালাগুলো বন্ধ থাকায় তাদের অনেকে বলতে গেলে একটা দীর্ঘ সময় কর্মহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেছেন। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে ইউরোপের অনেক দেশের সরকার ঘোষণা দেয় যাদের বৈধ ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে এবং কোনও একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধভাবে যারা কাজ করেন তাদেরকে এ লক ডাউন পরিস্থিতির মাঝেও বেতনের একটা নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধ করার জন্য যদিও সে সময় কারো কাজ না থাকে। তবে তা শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন একটা আশার খবর বয়ে আনতে পারেনি কেননা তারা কেউই ফুলটাইম ওয়ার্কার না এবং বেশিরভাগ দেশগুলোতে তাই এরা কোনও ধরণের চুক্তি ছাড়াই কাজ করে থাকে।

ইউরোপের কিছু দেশ সরকারিভাবে সে দেশে অবস্থানরত সকল শিক্ষার্থীদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু সেটা উল্লেখযোগ্য কোনো কিছু নয় সে অর্থে। যেমন- স্লোভেনিয়ার বর্তমান সরকার করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সে দেশে বসবাসরত শিক্ষার্থী যাদের স্লোভেনিয়ার পার্মানেন্ট রেডিসেন্ট কার্ড রয়েছে তাদের সবাইকে এপ্রিল এবং মে এ দুই মাস ১৫০ ইউরো করে আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দেয় কিন্তু ১৫০ ইউরো বলতে গেলে স্লোভেনিয়াতে কারও এক মাস চলার জন্য খুব একটি বড় অ্যামাউন্ট না। অনেক দেশের সরকারের পক্ষ থেকে সে দেশের স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন সে রকম আর্থিক সহায়তা ছিলো না বললেই চলে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো একককালীন যে অর্থ সহায়তা প্রদান করে সেটাও তেমনভাবে উল্লেখ করার মতো কোনো বড় একটি অ্যামাউন্ট ছিলো না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাকিং পলিসির কারণে সরাসরি বিদেশ থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো সম্ভব হলেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চাইলে কেউ টাকা পাঠাতে পারেন না। তাই এ পরিস্থিতিতে অনেকে বাধ্য হয়ে হুন্ডির আশ্রয় নেন। সেক্ষেত্রে যে বিষয়টি উঠে আসে তা হলো নিকটস্থ কারও সন্ধান করা যিনি বাংলাদেশে টাকা পাঠাবেন। তিনি সে টাকা বাংলাদেশে না পাঠিয়ে সরাসরি তার হাতে তুলে দেন এবং বাংলাদেশে থেকে তার পরিবারের কোনও সদস্য ঐ লোকের বিশ্বস্ত কারও কাছে এর সমপরিমাণ অর্থ (বাংলাদেশের টাকায় যেটা হয় তা) পৌঁছে দেন। এতে সরকারের রেমিট্যান্স প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যেহেতু দীর্ঘদিন অনেকের কাজ ছিলো না এবং একই সাথে আমাদের দেশের ব্যাংকিং পলিসির কারণে অনেকের পক্ষে বাংলাদেশ থেকে টাকা আনা সম্ভব হয়নি। অনেকের পরিবারের আবার সে সামর্থ্যটুকু নেই।

এখন ইউরোপে গ্রীষ্মকাল চলছে। ইউরোপের অর্থনীতির একটা বড় অংশ আসে ট্যুরিজম থেকে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ইউরোপে এ সময় ট্যুরিজম সেক্টরটি সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা থাকে। তবে এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, ফলে লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার পরও অনেকে কাজে ফিরতে পারছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন একটা পরিস্থিতির মাঝখানে যখন আমরা দাঁড়িয়ে তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় ধাপে করোনার সংক্রমণ যেনও মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

আগামী সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে চলেছে। যেহেতু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফের করোনার আঘাত এসেছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মনে একটা প্রশ্ন আগামী সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রমও কী অনলাইনে পরিচালিত হবে? যদি গেলো সেমিস্টারের মতো আগামী সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হয় সে ক্ষেত্রে তাহলে বিদেশে অবস্থান করার যৌক্তিকতা কতোটুকু? কিংবা সে ক্ষেত্রে কেন বা পুরো টিউশন ফি প্রদান করতে হবে? কিংবা করোনা পরিস্থিতিতে যে কোনও সময় যদি কোনও দেশের দরকার বলে বসে এখনই সে দেশে অবস্থানরত বিদেশি শিক্ষার্থীদেরকে সে দেশ থেকে চলে যেতে হবে?

জেরিন ফাতেমা, একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যিনি বর্তমানে হাঙ্গেরিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ডেব্রেসেন থেকে ডেটা সায়েন্সের ওপর ব্যাচেলর সম্পন্ন করছেন। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি অন্যান্য অনেকের মতো তার জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। ইউনিভার্সিটিকে তিনি আবেদনে জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে যেনও টিউশন ফি এর ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু ইউনিভার্সিটি তার এ আবেদনে সাড়া দেয়নি। ফলে এক ধরণের হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি।

ইকরাম হোসাইন একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যিনি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি দি লিব্রে ব্রাসেলস থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করছেন মাইগ্রেশন, রাইটস অ্যান্ড পলিসি বিষয়ে। তার সাথে কথা বলে জানা গেলো যে, বেলজিয়ামের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করতে হলে কোনও ধরণের টিউশন ফি প্রদান করতে হয় না। তবে প্রত্যেক বছর টেম্পোরারি রেসিডেন্ট রিনিউ করার ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের কোনো ব্যাংকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করতে হয়, যেটাকে আমরা অনেকে সচরাচর ব্লক অ্যাকাউন্ট বলে থাকি।

করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন তিনি কাজে যেতে পারেন নি, এমনকি এখনও যে তিনি স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসতে পেরেছেন এমনটি নয়। অন্যদিকে, এ মুহূর্তে তার পরিবারের অবস্থা তেমন একটা আশানুরূপ নয়। ফলে ব্লক অ্যাকাউন্টের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেটা জোগাড় করতে এখন তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট রিনিউ করতে পারার বিষয়টি নিয়ে তিনি এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

জেরিন ফাতেমা এবং ইকরাম হোসাইনের মতো অনিশ্চয়তায় ইউরোপে বসবাসরত অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যারা মূলত নিজ খরচে পড়াশুনা করার জন্য ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কেউ রীতিমতো চিন্তিত পরবর্তী সেমিস্টারের টিউশন ফি পরিশোধ নিয়ে, কেউবা আবার চিন্তিত টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট রিনিউ করা নিয়ে। আবার যেহেতু এখনও অনেকে পুরোভাবে পার্টটাইম চাকরিতে ফিরতে পারেননি এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং পলিসির কারণে দেশের থেকেও সেভাবে টাকা আনা সম্ভব হয় না, তাই অনেকে অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।

ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ইউরোপে তাদের টিকে থাকা। কেউ আবার দেশে ফিরে যেতে চাইছেন। এ অবস্থায় অনেকে আমাদের দেশের সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাতে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এ সকল বিষয়ে একটা কার্যকরী সমাধানের পথ বের করতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত