ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ৪ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৩৩

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে ডা. হারুন আল রশিদ

টিকা আনার প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি

টিকা আনার প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি
ছবি: হারুন আল রশিদ

কিরণ শেখ

হারুন আল রশিদ। বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি এবং হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান। নতুন ধরণের করোনা, দেশে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর হার এবং ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন কিরণ শেখ

বাংলাদেশ জার্নাল: নতুন ধরণের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী, এটা কি বেশী প্রাণঘাতী?

হারুন আল রশিদ: আমাদের দেশে এটা (নতুন করোনা) এখনো সেভাবে শনাক্ত হয়নি। আর এটা যেসব জায়গায় শনাক্ত হয়েছে, তাতে বুঝা যাচ্ছে যে- এটা অল্প সময়ে বেশি মাত্রায় মানুষকে সংক্রমিত করছে। কিন্তু সুখবর হচ্ছে, যেসব দেশে এই ভাইরাস ধরা পড়েছে তারা বলেছে- এটা আগের করোনার চেয়ে এত বেশি মরণঘাতি না। কিন্তু সংক্রমণের হার অনেক বেশি। সুতরাং এটা যদি আমাদের দেশে ঢুকে যায় তাহলে পরিবারের সদস্যরা বেশি সংক্রমিত হবে। তাই নতুন করোনা আসার আগেই সবকিছু বন্ধ করা উচিত।

বাংলাদেশ জার্নাল: বাংলাদেশেও নতুন ধরণের করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, এই ভাইরাস রোধে সরকারের কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

হারুন আল রশিদ: নতুন ধরণের করোনা যদি ঢুকে যায় তাহলে এটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর তখন সেটা কন্ট্রোল করা মুশকিল হবে। একারণে আমাদেরকে বাংলাদেশের প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিতে হবে। এই প্রবেশ পথগুলো যদি আমরা ভালোভাবে কন্ট্রোল করি তাহলে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। আর যারা দেশে আসছে, তাদেরকে অবশ্যই সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: দেশে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কমছে, এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

হারুন আল রশিদ: এটা তো প্রকৃতি চিত্র না। কারণ আমাদের দেশে করোনা পরীক্ষা নিয়ে প্রথম দিক থেকেই বিভ্রান্তি ছিলো। এখনও তাই আছে। প্রথম দিকে করোনা শনাক্তের কেন্দ্র স্বল্পতা ছিল। একটা সময় শুধু আমরা রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) গিয়েছি। এরপর আস্তে আস্তে এটাকে দুই থেকে তিন জায়গায় করা হলো। পরে বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলা হলো যে, প্রাইভেট জায়গাগুলোতেও করা যাবে। এরপর সরকার যখন আরো চাপের মুখে পড়লো তখন দেশের বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলাগুলো করোনা শনাক্তের জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপন করলো।

তিনি বলেন, করোনা টেস্টের ক্ষেত্রে এখনো সরকারের একটা নিয়ন্ত্রণ আছে। আপনি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান, সেখানে আপনি দেখবেন- করোনা পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন। এত দীর্ঘ কিন্তু হওয়ার কথা না। আর টেস্ট শুরু হবে সকাল ৯টায়, কিন্তু লাইন দিচ্ছে ভোর ৫টা কিংবা ৬টা থেকে! এটা কেনো? কারণ প্রথম ২’শ জনের টেস্ট হবে। আর বাকিদের টেস্ট হবে না। সুতরাং সরকারের যেসব জায়গায় টেস্ট করানো হচ্ছে, সেখানে নিম্নবিত্তদের টেস্ট করানোর কোন সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে যে সংখ্যক লোক টেস্ট করানোর কথা ছিল, সেই সংখ্যক লোক টেস্ট করাতে পারছে না। আবার উচ্চবিত্তদের জন্য প্রাইভেট হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে পরীক্ষা করতে লাগে ৪ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা! পরীক্ষার হার কমার এটাও একটা বাধা। আরেকটি বাধা আমি করি, পরীক্ষার পরে ভুয়া রেজাল্ট। এ কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে টেস্ট কম হচ্ছে। আর টেস্ট না করালে শনাক্ত হবে কীভাবে? ফলে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশী থাকলেও শনাক্তের হার কম। আর সবমিলিয়ে দেশে করোনা পরীক্ষার কৃত্রিম একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: নতুন ধরণের করোনা আসার পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তৈরি ভ্যাকসিন কতটুকু কার্যকর হবে?

হারুন আল রশিদ: করোনা যে রূপ পরিবর্তন করছে, এজন্য ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা খুব একটা কমে যাব; সেটা আমার মনে হয় না। আর বৈজ্ঞানিকভাবেও সেটা মনে হয় না। আশা করা যায়, যেগুলো ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, সেগুলো কার্যকরী হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: যেসব দেশ ভ্যাকসিন তৈরি করেছে, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি চুক্তি না করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে টিকা আনার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

হারুন আল রশিদ: বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, এটা তারাই একটি অংশ। এখানের মানুষের জীবন যেহেতু জড়িত, সেখানে সরকারের অত্যন্ত তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এটা ঠিক আছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাটা যাতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয় সেটা দেখাও অত্যন্ত জরুরি। তবে যেটা আমরা দেখলাম, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে; এখানে সাধারণত জিটুজি পদ্ধতিতে হয়। কিন্তু যদি জিটুজি না হয়…। সরকার এবং প্রস্তুতকারক কোম্পানি- এটা হতে পারে। আর এখানে আরেকজন তৃতীয় পক্ষের প্রবেশের কারণ হলো, মুনাফা লাভের ব্যাপার। এই লাভটা কিন্তু জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে যাবে। এখন আমি অন্য কাউকে কেনো লাভ দেবে, কী উদ্দেশ্য এবং কেনো দেবো? এটারও একটা স্বচ্ছতা থাকা উচিত।

আর আমার কাছে মনে হয়, এই প্রক্রিয়াটা সঠিক হয়নি। এখানে জনগণের টাকা অহেতুক একটা ব্যয় বৃদ্ধি হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: দেশে করোনা টিকা কীভাবে বণ্টন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

হারুন আল রশিদ: করোনার টিকা দেয়ার পলিসি আগে থেকে ঠিক করতে হবে। এটা না হলে কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে দুর্নীতি ঢুকে যাবে। আর বাংলাদেশে তিন কোটি ডোজ টিকা আসবে, কিন্তু আমার দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। সুতরাং এখানে এই বিষয়টি অবশ্যই প্রায়োরিটি দিতে হবে। এটা না হলে, যারা চিকিৎসক, নার্স, যারা করোনা যুদ্ধা, বৃদ্ধ ও অসুস্থ; তারা টিকা পাবেন না। অন্যদিকে দেখা যাবে, যারা সুস্থ সবল তারা টিকা নিয়ে বসে আছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত