ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ৪ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ২২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৯

প্রিন্ট

গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারে তোফায়েল আহমেদ

১০ জানুয়ারি বাংলার স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করেছিল

১০ জানুয়ারি বাংলার স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করেছিল
ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সংগ্রামী জীবনে সততা, মেধা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও বাগ্মিতার কারণে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জনকল্যাণমূলক রাজনীতির অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তবে রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক সংগ্রাম ও বিস্তর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।

কলেজ জীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪তে ইকবাল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫তে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭তে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন।

১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর জুনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনার সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন; দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১২ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাকে প্রথমে গৃহবন্দি ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তাকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি সফলভাবে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বমোট ৮ বার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯২তে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯৬-এ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গণ রায়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর মহান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে’ তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। অর্পিত দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করে দেশ-বিদেশে রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে একটি বিশেষ সাক্ষাতকার দেন তোফায়েল আহমেদ। স্বাক্ষাতকারটি বাংলাদেশ জার্নালের পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেই উপলব্ধি করেছিলেন, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রতা বাঙালিদের হতে হবে। সে লক্ষ্য সামনে নিয়ে তিনি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ এবং ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিলেন। ধীরে ধীরে জীবনের তেরোটি মূল্যবান বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়ে বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে তিনি তার লক্ষ্য পূরণ করেছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দিলেন, তাকে ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমরা ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর, ডঃ শামসুজ্জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হকের রক্তের বিনিময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেছি। সত্তরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সরোয়ারদী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। সত্তরের নির্বাচন হয়েছে, তিনি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন। নির্বাচনের পরেই শপথ নিয়েছিলেন একাত্তরের তেশরা জানুয়ারি। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছিলেন, যে ছয় দফা গণভোটের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে, সেই ছয় দফা দাবির সাথে আমি আপস করব না।

২৫ শে মার্চ শেষ প্রহরে অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা যখন শুরু হয় তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের মেজর সিদ্দিক সালেকের লেখা বই ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’- সেই বইতে তিনি লিখেছেন, ‘প্রথম গুলির পরেই আমরা রেডিওতে শেখ মুজিবের কণ্ঠ শুনতে পাই। সেখানে তিনি বলেছেন এটি হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ এই ঘোষণার পরেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের লায়ালপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিচার শুরু হয়। বিচার যখন শুরু হয় বঙ্গবন্ধু সেখানে উপস্থিত। বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন কিনা, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এদের আমাকে বিচার করার কোন অধিকার নেই। কারণ আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। শুধু আমি না, আমার কেনো বাংলার মানুষের বিচার করার অধিকার এই বিচারকদের নেই।

তেসরা ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। সেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য লায়ালপুর কারাগার থেকে মিয়ানওয়ালি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্টে দণ্ডিত করার জন্য কবর খোঁড়া হয়। বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমার সেলের পাশে কবর করা হয়েছিল। পাকিস্তানের একজন লেখক আহমদ সালিম তার ‘পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিব’ বইয়ের ৫৮ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন, একদিন জেলখানার সুপার ৭ জন কয়েদিকে বেছে কবর খোঁড়ার নির্দেশ দেন‌। ৮ ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত এবং চার ফুট গভীর সেই কবর খোঁড়া হয়। সেই কবর খোঁড়ার পরে হঠাৎ সেই রায় কার্যকর করা হয় নাই। এভাবে তিনবার বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়ার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল।

সে সময় ভুট্টো ইয়াহিয়াকে বুঝিয়েছিল আমরা যদি শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেই তাহলে পূর্বাঞ্চলে আমাদের যে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং নিম্ন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাসহ সকলের বিপদ আসবে। কেউ দেশে ফিরতে পারবে না। ইয়াহিয়া খান শুধু বলেছিলেন আমার জীবনের একটা সাধ অপূর্ণই রয়ে গেছে। সেটি হলো শেখ মুজিবকে ফাঁসির কাষ্ঠে না ঝুলানো। আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে আমাকে এ কাজটি করার সুযোগ দাও। তখনই ভুট্টো ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করে মিয়ানওয়ালি কারাগারের জেল সুপার হাবিব হাবিব আলী তাকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অন্য জায়গায় হাবিব আলীর বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে দুইদিন রেখে শাহুল্লায় (পিণ্ডির কাছে একটি স্থান) বঙ্গবন্ধুকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ভুট্টো এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। এবং বিভিন্নভাবে অনুনয়-বিনয় করে একটা বন্ধনের কথা বলার পরে বঙ্গবন্ধু সেটা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বলেছিলেন ‘টেল মি ভুট্টো, হোয়েদার আই এম অ্যা ফ্রিম্যান অর প্রিজনার?’ তখন ভুট্টো স্বীকার করেছে- ‘নাউ ইউ আর এ ফ্রিম্যান।' 'তাহলে আমাকে যাবার ব্যবস্থা করো।’

যেহেতু পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানের বিমান ভারতের উপর দিয়ে আসলো না সেজন্য বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন তিনি লন্ডন হয়ে বাংলাদেশে আসবেন। ৮ তারিখে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে গেলেন। সেদিন প্রথমে হোটেল ক্লারিজে বৃটেনের বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হেরাল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারপরে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট এডোয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে খুব গভীরভাবে অভ্যর্থনা জানান। এবং একটা নিয়ম তিনি বরখেলাপ করেন এডওয়ার্ড হিথ। বঙ্গবন্ধু যখন গাড়িতে উঠেন তখন গাড়ির দরজা খুলে বঙ্গবন্ধুকে ভিতরে প্রবেশ করান। যার জন্য এডোয়ার্ড হিথের খুব সমালোচনা হয়েছিল পার্লামেন্টে। তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি যাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছি তিনি একজন বীর। তিনি একজন রাষ্ট্রের স্রষ্টা। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে পেরে আমরা নিজেরাই গর্বিত হয়েছি।’ তারপরে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান কমেটে করে বঙ্গবন্ধু প্রথমে দিল্লি তারপরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

দিল্লিতে বিরাট সংবর্ধনা বঙ্গবন্ধুকে দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট ভিভি গীরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি যাবার পথে ভেবেছি যে ভারত আমারে দুর্দিনে মুক্তিযুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সাথে দেখা করে আমি আমার দেশে যাব। এমন একটা আবেগ ময় বক্তৃতা করেছিলেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কে বলেছিলেন, তিনি মানবতার প্রতীক তিনি বিশ্বনেত্রী। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু কে বলেছিলেন, আমরা আপনাকে পেয়ে গর্বিত। আমরা ধন্য। আপনি একটি দেশ সৃষ্টি করেছেন। আপনার তুলনা আপনি নিজেই।

এরমধ্যে ইন্দ্রাগান্ধির সাথে বঙ্গবন্ধুর যখন একান্তে কথা হয় তখন বলেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি বলুন কখন আপনি আপনার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়ে আসবেন? তারপর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে আসেন। রাজকীয় বিমান কমেন্ট ১টা ৫১ মিনিটে দেশে অবতরণ করে। সেখান থেকে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুকে নিতে সময় লেগেছে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সেখানে নিতে প্রায় সাড়ে চারটা বাজে। নামার পরেও মাঝখানে আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে। সেই ট্রাকে ছিলেন আমাদের জাতীয় চার নেতা, মুজিব বাহিনীর চারজন মনি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমি। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, আ.স.ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ সিকদার, আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ। তারপরে বিদেশী কূটনীতিক বৃন্দ সবাই বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা দেয়ার পরে বঙ্গবন্ধু সেই ট্রাকে ওঠেন। সেই ট্রাকে করে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে সাড়ে চারটের সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি চোখ মুছলেন। চতুর্দিকে তাকালেন তারপর ভাইয়েরা বলে বক্তৃতা শুরু করলেন। আজ আমি আনন্দিত, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। একটা বড় বক্তৃতা করেছেন ঐতিহাসিক বক্তৃতা। যে বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি বলেছেন আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি সেই বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। তারপর তিনি আরও বলেছিলেন আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম প্রধান দেশ। শেষ করার আগে তিনি কবিগুরুর সেই বিখ্যাত কবিতা থেকে বলেছিলেন সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি। কবিগুরু আপনি দেখে যান আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।

তারপর তিনি সেখান থেকে ১৮ নম্বর রোডে যেখানে বঙ্গমাতা, আজকের আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ছোট ভাই শেখ রাসেল তাদেরকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখানে গিয়েছিলেন। সেই বাড়ির সামনে বঙ্গবন্ধুর আলাদা একটা বাসভবন ঠিক করে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ১১ তারিখ তিনি তাজউদ্দিন ভাইয়ের বাসভবনে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক করে ১২ তারিখ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেবেন। মোট কথা হল যে আমরা ১৬ই ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়েছিলাম, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ফল বাংলার মানুষ ভোগ করতে পারেনি। স্বাধীনতা পূর্ণ হয়নি। কিন্তু ১০ই জানুয়ারি যেদিন তিনি স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বাংলার মাটি স্পর্শ করেছিলেন সেদিনই বাংলার স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করেছিল।

বঙ্গবন্ধু দুটি স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। একটি বাংলার স্বাধীনতা এবং অপরটি দেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত দেশে রূপান্তরিত। একটি তিনি করে গেছেন। আরেকটি করার জন্য তিনি যখন প্রস্তুতি নিয়েছেন তখনই জাতির পিতার সপরিবারে বঙ্গমাতাসহ হত্যা করা হয়। দুই কন্যা তখন বিদেশে ছিলেন। পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে আমরা আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছিলাম। সেই পতাকা হাতে নিয়ে তিনি আজকে নিষ্ঠার সাথে দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

গত ৬ তারিখে আমাদের একযুগ পূর্ণ হল। তার আগে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ ধ্বংস করেছিল সেটি আমরা পুনর্নির্মাণ করেছি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ প্রশস্ত করেছি, স্বাধীনতার বিরোধীদের বিচারের কাজ আমরা করেছি। তারপরে আন্তর্জাতিক বিশ্বে আজকে আমরা মর্যাদাশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছি। একদিন বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা বলতেন বাংলাদেশ হবে দরিদ্র দেশের মডেল, এখন তারাই বলেন বিস্ময়কর উত্থান হয়েছে বাংলাদেশের। সুতরাং আজকের দিনে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ একটি দিনই পূরণ করে গিয়েছিলেন স্বাধীনতা। আরেকটি পূরণ করতে পারেন নাই। সেই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিষ্ঠার সাথে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত