ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ আপডেট : ৫ মিনিট আগে

নকল করা দোষের না

  রহমান মৃধা

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২১, ২২:২১

নকল করা দোষের না
রহমান মৃধা

বর্তমান বিশ্বে চলছে চাহিদা ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন আজীবন চাকরি বলে কিছু নেই, চাকরি আছে ততদিন যতদিন কাজ আছে এবং কাজ আছে ততদিন যতদিন ডিমান্ড আছে।

শেয়ার মার্কেট নির্ধারণ করছে বর্তমান কর্মসংস্থান। শেয়ার হোল্ডার, রাজনীতি, ক্লাইমেট পরিস্থিতি, এসব বিশাল আকারে প্রভাব বিস্তার করছে শিল্প কারখানা এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে। শিক্ষা ও শিক্ষার মান নির্ভর করছে গ্লোবাল চাহিদার উপর এবং তাও হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট লেভেলে।

শেয়ার বাজার নির্ধারণ করছে চাকরি থাকবে কি থাকবে না। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত বলা কঠিন কী পড়লে সারাজীবন চাকরির গ্যারান্টি মিলবে। তবে সারা জীবন টেকসই ইন্ডাস্ট্রি প্রোভাইডার এবং যোগ্য নাগরিক হিসাবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার সময়োপযোগী সুশিক্ষা।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে সময় ও প্রয়োজনের সীমারেখা়। অগ্রণী চিন্তায় আমার পৃথিবী উদ্ভাসিত হবে আমার জ্ঞানের আলোকে! এই শিক্ষা হবে আমার উপার্জনের হাতিয়ার। বাংলাদেশ উন্নয়নের সড়কে উর্দ্ধমুখী এক দেশ। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সময়ের স্রোতে এ দেশের সব সেক্টরেই লেগেছে আজ ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। কিন্তু আমাদের ধ্যানে-জ্ঞানে এ ছোঁয়া আজও লাগেনি!

চাহিদা বলছে কী পড়তে হবে এবং কেন পড়তে হবে। এ সময়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং প্রত্যেকটি শিক্ষককে জানতে হবে চাহিদাগুলো কী এবং তার জন্য কী করা দরকার। ছাত্রছাত্রীরা নকল করছে, এ নিয়ে জাতি হতাশ। তাদের নকল করার পিছনে জড়িত রয়েছে হাজারো কারণ— নিম্ন মানের অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা, অসচেতন অভিভাবক, প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক, দুর্নীতি, ধর্ম, রাজনীতির প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। যখন চাহিদার সাথে সঙ্গতিহীন ও সমন্বয়হীন শিক্ষা চালু রয়েছে তখন মেধার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সাধারণ শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যা বা লৌকিকতার ওপর, তখনই জাতি অরাজকতা এবং অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নিজে কী চাই সেটার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে অন্যে কী চায় তার ওপর নজর বেশি বিধায় যেকোনো মূল্যে পাশ করতে হবে, এমন ধরনের “মাইন্ডসেট” তৈরি হচ্ছে। ফলে সর্বত্র নকল করার প্রবণতা বাড়ছে। নকল আজীবন ছিল এখনও রয়েছে। এটা শুধু ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা রয়েছে সর্বত্র, সব শ্রেণির মধ্যে এবং সারাবিশ্বে। মনে হয় বাবা-মা যা করতে ব্যর্থ হয়েছে সেটা তারা দেখতে চায় তাঁর সন্তানের মাঝে আর তা করতে যেকোনো মূল্যে সবকিছু বিসর্জন দিতে তারা রাজি। দুঃখের বিষয় সবাই ভুলে যাচ্ছে যে, তারা যে নোংরামি জমা করছে তা পরক্ষণেই ফিরে আসছে আরো দুর্গন্ধ হয়ে। সারাবিশ্ব যেখানে একে অপরের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে কেনাবেঁচার মধ্য দিয়ে, এমন একটি সময় বাংলাদেশ হতে চলছে নিঃসঙ্গ। কারণ তারা যা তৈরি করছে তা দেশের বাইরে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে– মাছ, শাক-সবজিসহ নানা খাবারে মেশানো হচ্ছে ফরমালিনের মতো এক বিষাক্ত কেমিক্যাল যার কারণে বিদেশে তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। সারাদেশে দুর্নীতি, ঘুষ, অবিচার দেদারসে চলছে। ছেলেমেয়ে যখন জানছে বাবার মাসিক বেতন ২০,০০০ টাকা অথচ ছেলেমেয়ের টিউশন ফি ১০,০০০ টাকা, বাড়িভাড়া ১০,০০০ টাকা, বাজার খরচসহ অন্যান্য খরচ ২০,০০০ টাকা, তখন নকল করা কি সমাজের চোখে অন্যায়?

মনুষ্যত্বের যখন মৃত্যু ঘটে তখন এমনটি হিসাব নিকাশের গড়মিল হওয়াটা জাতির জন্য একটি কঠিন কাজ বলে আমি মনে করি না। it’s like shit in shit out, it’s not unexpected it’s an expected outcome. এ দূরাবস্থার সময় স্বাভাবিকভাবেই ধর্ম প্রভাব বিস্তার করছে ভয়ংকর আকারে। কারণ ধর্মের আড়ালে সবকিছু লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। এটাই যদি সত্যি হয় তাহলে কী করে জাতি ফরমালিন থেকে শুরু করে দুর্নীতি, ঘুষ, নকল এসব থেকে মুক্ত থাকতে পারে?-

এখন প্রশ্ন নকল কী? কেন আমরা নকল করি? নকল না করলে এর বিপরীত কি অন্য কোনো সমাধান আছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করা কথাটি একটি প্রবাদ। কিন্তু সে জ্ঞান হতে পারে ‘কু’ বা ‘সু’ শিক্ষা। ইন্টারনেটের এই যুগে সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত৷ তাই কোনো কিছু উদ্ভাবন করে তা কপিরাইটের বন্ধনে বেঁধে রাখা কঠিন ব্যাপার। জন্মের শুরুতেই আমরা যা দেখছি বা শুনছি, তা-ই শিখছি বা অনুকরণ করছি, অন্যভাবে বলতে পারি, কপি করছি বা নকল করছি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। তাই বলা যেতে পারে, নকল করা বা কপি করা এটা কোনো নতুন সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, নকল যদি নিজের বা সমাজের জন্য কোনো ভালো ফল ফলাতে না পারে, তাহলে সে নকল অকল্যাণকর। নকল যদি নিম্ন মানসম্পন্ন হয়, তাহলে তার পরিণতি হবে বেকারত্ব আর জীবন হবে অন্ধকার। সময় এসেছে ভেবে দেখার যে নকল করা পণ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে দেশে সৃজনশীলতার নতুন এক ঢেউ ওঠানো যায় কি না! তাই নকলের ওপর কিছু আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। জীবনকে বড় করে ভাবতে এবং শিখতে হলে দরকার ভালোভাবে শেখা, আর তার জন্য দরকার সৃজনশীল উপায়ে নকল করা এবং শেখা। নকল বা কপি করার সঙ্গে শিক্ষার কী সম্পর্ক থাকতে পারে তার ওপর একটু গুরুত্ব দিতে চাই দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।

জাপানিরা খুব দেশ-বিদেশ ঘোরাঘুরি করে এবং তাদের সঙ্গে সব সময় ক্যামেরা থাকে, তারা যা দেখতে বা জানতে চায়, তার ওপর সব সময় ছবি তোলে। তারা বেশ কপি করতে পারদর্শী তা আমরা জানি। তবে তারা শুধু কপি নয়, সঙ্গে কিছু নতুনত্ব ও সংযোজন আনার চেষ্টাও করে। তাদের এই কপি করার মধ্যে রয়েছে জানার জন্য শেখা এবং তাদের থেকেই শেখা, যারা জানে। এখন এই জানা অজানার মাঝে আমার জীবনের নকলের বা কপি করার ওপর কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি।

২০০১-০২ সালে আমাকে জাপানে পাঠানো হয় দুটো কোম্পানি পরিদর্শন করতে। একটা তোশিবা কম্পিউটার কোম্পানি আরেকটি টয়োটা গাড়ি কোম্পানি; যদিও আমি কাজ করি ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির ওপর। কেন আমাকে পাঠানো হলো ওই দুটি ভিন্ন ধরনের কোম্পানিতে? কারণ ছিল একটাই, যারা জানে তাদের থেকে শেখা। মিস্টার টয়োটার সঙ্গে তাঁর প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি দেখা। কথা হতেই তিনি বলেছিলেন, ‘দয়া করে এখানে থাকুন আর ভালো করে দেখুন, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসিছ।’ তিনি পাঁচ মিনিট পরে ফিরেছিলেন এবং আমাকে সেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে যা আমি দেখেছিলাম, তার ওপর কথা বলেছিলেন দীর্ঘ তিন দিন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কী কী দেখলাম? কী না দেখলাম? যা দেখলাম তা কেন দেখলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি।

গাড়ির জগতে কম খরচে ভালো কোয়ালিটিসম্পন্ন গাড়ি তৈরি করা আবশ্যক। তাই ‘টয়োটা’ কাইজেন (Kaizen) তত্ত্বের আলোকে পর্যবেক্ষণ করে উৎপাদনের প্রতিটি পদক্ষেপ। কাইজেন হলো নিরন্তর উন্নতি করা, পদ্ধতিগতভাবে দীর্ঘ মেয়াদে কাজের এমন এক ধারা, যার মাধ্যমে কর্মপদ্ধতিতে সামান্য, খুঁটিনাটি পরিবর্তনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে দক্ষতা ও মানের উৎকর্ষ সাধন করা যায়। আমাকে পাঠানো হয়েছিল এই কাইজেন তত্ত্ব শিখে নকল বা কপি করে সেটাকে কাজে লাগানোর জন্য, ওষুধশিল্পে। তোশিবা থেকে শিখেছিলাম নকল, কপি করেছিলাম তাদের কার্যকর উপায় এবং সঙ্গে দক্ষ পরিচালনা।পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে পাঠানো হলো আমাকে হল্যান্ডে, কারণ ছিল একটাই, নকল বা কপি করা, জানতে গিয়েছিলাম মনুষ্যত্বের সঙ্গে তাদের শিল্প ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক। হল্যান্ড একটি মজার দেশ, যাঁদের নৈতিক মূল্যবোধ পৃথিবীর মধ্যে খুব উন্নতমানের। তাদের শিক্ষার হার শতভাগ। তাদের ভালো-মন্দের বেশির ভাগ দায়িত্ব তারা নিজেরাই বেশির ভাগ সময় নির্ধারণ করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তাদের অপরাধ থেকে শুরু করে সব ধরনের খারাপ অভ্যাসের পরিমাণ কম। যা শিখলাম, একেবারে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম, কোনো ফাঁকিজুকি নেই। কোনো গোপন সূত্র নয়, প্রস্তুতি ও পরিশ্রম এবং যারা শেখে, তাদের কাছ থেকে শেখাই তাদের চাবিকাঠি।

আমার শিক্ষা থেকে এটাই একজন পরামর্শক হিসেবে বলতে চাই যে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ধরনের আলোচনা হবে, যাতে করে একটি দুর্বল শিক্ষা প্রশাসনও ধীরে ধীরে সুশিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে পারে। শিক্ষাঙ্গনে সুইফট ম্যানেজমেন্ট আনতে পারলে বাংলাদেশে সুশিক্ষা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রেরণা, তত্ত্বাবধান। তা না হলে চলতে থাকবে যেমনটি চলছে। মাসে মাসে বেতন থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ তারা জানেন না কী করতে হবে বা কেন করতে হবে? অথবা আমি বলব, এর কারণ একটাই, তা হলো শিক্ষাপদ্ধতির দুর্বল ব্যবস্থাপনা। তাই আমি মনে করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রশাসনকে একত্রে করে শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট চালু করে সুশিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে। ফিরে পাব আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব এবং আমরা হব সুশিক্ষায় শিক্ষিত। নকলকে নিয়ে যেভাবে আলোচনা তৈরি হচ্ছে তেমন করে উপরের অন্য বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আলোচনা বা ডিবেট হচ্ছে না!

ছেলেমেয়েদের নৈতিক মূল্যবোধ দিনে দিনে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে যার ফলে নকল করা বা অপরাধ করা তেমন বিবেকহীন কাজ বলে নতুন প্রজন্মের কাছে মনে হচ্ছে না। এরূপ চিন্তাও তাদের মাথায় নেই। জনৈক বাংলাদেশী নকলের অভিশাপ থেকে জাতীকে রক্ষার উপায় আমার কাছে জানতে চেয়েছেন। যতোটুকু বুঝি ততোটুকু এখানে তুলে ধরলাম।

তাড়াহুড়ো করে,পড়াশুনোয় ফাঁকি দিয়ে এবং নকল করে পাশ করে বেকার থাকার চেয়ে ভালো হবে পড়াশুনো করে সুশিক্ষাটা অর্জন করে দেশে না হলেও অগত্যা বিদেশে চাকরির সুযোগটা গ্রহণ করার চেষ্টা করা। সেইক্ষেত্রে শেখার জন্য পড়াটা ভবিষ্যতের অন্ধকারকে আলোতে পরিণত করতে সাহায্য করবে।

“নকল” is a easy, effective and very creative way to find some short terms solution if no one can catch you. প্রতিফলনটি আমি মনে করি এমনটি হতে পারে। প্রশ্ন এমনভাবে করা উচিত যাতে ১টা প্রশ্ন করলে কমপক্ষে ৩ বা তার অধিক উত্তর হয়। আর সে উত্তর যদি তারা না জানে তাহলে নকল করতে গেলেও অংকের সমীকরণের মতো ভুল হবে, যদি সমীকরণের নীতি, পদ্ধতি না জানা থাকে।

শিক্ষা ও মনুষ্যত্বকে একসাথে গঠনমূলকভাবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে এবং এর ওপর জোর দিতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিকল্প নেই। এরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হবে শিক্ষা ও মনুষ্যত্বকে একত্র করে নতুন প্রজন্মকে “learning from learners” কনসেপ্ট ব্যবহার করে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সুশিক্ষা দান করা। এভাবে জাতির “মাইন্ডসেটে” পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই সম্ভব দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। একমাত্র সুশিক্ষা ও সুস্থ্য মন-মানসিকতাই পারে নকল, দুর্নীতি, ঘুষ ও অবিচার দূর করতে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন

বাংলাদেশ জার্নাল/একে/এমজে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত