ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ১৯ মিনিট আগে

নয়া বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস ও কিছু কথা

নয়া বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস ও কিছু কথা
আনোয়ারুল কবির। ফাইল ফটো
অনলাইন ডেস্ক

আজ রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন লিজ ট্রাস। স্কটল্যান্ডের বন্দরনগরী এবারডীন-এর নিকট দূরত্বের বালমোরাল দুর্গে বৃটিশ মহামহিম রাণীর উপস্থিতিতে তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গ্রেট ব্রিটেনে গত ছয় বছরে চতুর্থবারের মতো সরকারপ্রধানের পদে পরিবর্তন এলো; বিবিধ ঘটনা-দুর্ঘটনার জের ধরে একে একে বিদায় নিলেন একই (টোরি) দলের ডেভিড ক্যামেরুন, টেরেসা মে ও বরিস জনসন।

একদা বলা হতো, ‘বৃটিশ সাম্রাজ্যে’ সূর্যাস্ত যায় না। কালের থাবায় সে সাম্রাজ্য আজ ইংল্যান্ড, ওয়েলস, ও স্কটল্যান্ডে এসে ঠেকেছে। পুরো যুক্তরাজ্যকে বিবেচনায় নিলে বাকি রইলো উত্তর আয়ারল্যান্ড আর পশ্চিম গোলার্ধের ফকল্যান্ড দীপপুঞ্জ।

এ রাজ্যগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যের রাণী হলো স্কটল্যান্ড। পাহাড়, ঝর্ণা, লেক, সাগরের অপরূপ মেলবন্ধনে বিধাতা সাজিয়েছেন স্কটল্যান্ডকে। তাই এ দেশকে দখলে আগ্রহী ছিলেন বিভিন্ন যুগের ক্ষমতাধর নৃপতিগণ। এদের ঠেকাতে প্রতিরক্ষা ব্যুহ হিসেবে স্কটল্যান্ডের বড় শহরগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে দুর্ভেদ্য দুর্গ। এদের মধ্যে আমার এডিনবরা, সেন্ট এন্ড্রুজ ক্যাসেল দেখার সুযোগ হয়েছিলো।

আজ লিজ ট্রাস যে দুর্গে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, সেই 'Balmoral Castle' ঘিরে রয়েছে বিতর্কের ইতিহাস। ১৮৫২ সালে বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়ায় স্বামী ফার্গুহাসন পরিবার থেকে এ দুর্গটি খরিদ করেন। এর খরিদমূল্য ছিলো বত্রিশ হাজার বৃটিশ পাউন্ড। অপার সৌন্দর্য ছাড়াও তুলনামূলক কম তাপমাত্রার কারণে অবকাশ যাপনে রাজপরিবারের প্রথম পছন্দ ছিলো স্কটল্যান্ড। পশ্চিম এবারডিনের ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের দুর্গটি খরিদ করার পর আলবার্ট অনুধাবন করেন যে এর কক্ষসংখ্যা অপ্রতুল এবং এর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অপরিহার্য। এ কাজে তিনি নিয়োগ দিলেন সে সময়ের প্রখ্যাত (রাজ অনুগতও বটে) স্থপতি উইলিয়াম স্মিথকে। উইলিয়ামের বাবা স্থপতি জন (John Smith) ১৮৩০ সালে এ দুর্গের নকশা তৈরি করেন। দুঃখের বিষয় উইলিয়াম স্মিথের নকশাটি প্রিন্স আলবার্টের পুরোপুরি মনমতো হলো না। তিনি এর জানালাসহ কিছু কিছু এলাকায় পরিবর্তন আনলেন। ১৮৫৩ সালে এর নতুন করে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং মূলত গ্রানাইট ও শ্লেটে তৈরি এ দুর্গের নির্মাণকাজ ১৮৫৬ সালে শেষ হয়। এ সময়ে প্রিন্স আলবার্ট স্থপতি উইলিয়ামকে এবারডিনের 'সিটি আর্কিটেক্ট'-এর পদটি তোফা হিসেবে দান করেন।

এতে সংক্ষুদ্ধ হন এবারডিন নগরীর আরেক বিশিষ্ঠ স্থপতি জন বার্নস (John Burns)। তিনি অভিযোগ করলেন, বালমোর দুর্গের নকশাটি মূলত তার। উইলিয়াম চৌর্যবৃত্তির (plagiarism) আশ্রয় নিয়ে নকশাটি তৈরি করেছেন । সেকালেতো বটেই একালেও রাজপরিবারের অনুকম্পা প্রার্থী শিল্পী, পেশাজীবীদের কমতি নেই। অভিযোগ প্রমাণ করে নগর স্থপতির পদটি বাগানোর দুরভিসন্ধি ছিলো তার। রাণীপতি আলবার্ট সে অভিযোগকে আমলে নিলেন না। উইলিয়াম তার পদে অধিষ্ঠিত রইলেন।

এ প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটি অনাহূত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি। ২০০৮ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার গবেষণা নির্দেশক প্রফেসর আ্যলিস বেলচারের আনুকূল্যে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের ছাত্রদের ফাইনাল টার্ম পরীক্ষার হল পর্যবেক্ষণের কাজ পাই। এ কাজ সাধারণত শিক্ষক না করে উচ্চতর শ্রেণীর ছাত্ররাই করে থাকেন। এর জন্য ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিক ছিলো সাড়ে সাত পাউন্ড। নবীন পর্যবেক্ষকদের হল পর্যবেক্ষণের আগে এক্সাম অফিসের ম্যানেজারের কাছে যেতে হলো। হল পর্যবেক্ষণের নিয়ম-নীতি তার কাছ থেকে তালিম নিতে হবে। তিনি প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে আমাদের একের পর এক নিয়ম বর্ণনা করতে লাগলেন। এর একটি ছিলো, ‘কোনো ছাত্র পরীক্ষাকালীন সময়ে ওয়াশরুমে গেলে পুরুষ পর্যবেক্ষক তাকে অনুসরণ করবেন। ছাত্রীর ক্ষেত্রে নারী পর্যবেক্ষকের তাই কর্তব্য।’

উত্তেজনাবশত আমি দাঁড়িয়ে বললাম, ‘এটি কি কোনো সভ্য নিয়ম হলো?’ তিনি তার প্রশান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছো। শুরুতে এ অদ্ভুত নিয়ম আমাদের নীতি-সংহিতায় ছিলো না। তবে অনিবার্য কারণে এটি আমাদের নীতি-সংহিতায় যোগ করতে হয়েছে।’ তার মুচকি হাসি বলে দিলো তার কথার তীর এশিয়ানদের প্রতি। চাকরিদাতার সাথে চাকরিপ্রার্থীর বচসা চলে না। তাই কথা না বাড়িয়ে নিবিষ্ট মনে তার বাকি কথা শুনলাম।

লিজ ট্রাসকে অভিনন্দন। চ্যালেঞ্জার ঋষি সুনাককে এর জন্য রইলো গভীর সহানুভূতি। তার টোরি পার্টির সাংসদদের ভোটে তিনি লিজকে ১৩৭-১১৩ ব্যাবধানে হারিয়েও দলের ডেলিগেটদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেন না। ডেলিগেটদের আশীর্বাদ পেলে তিনি হতেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। অতিধনী- অতি তামাটে (Too Rich Too Brown) বৃত্তবন্দি হওয়ায় এবার তার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়লো না। তার কোটিপতি স্ত্রী ইনফসিসের বিলিনয়ার মালিক নারায়ণা মূর্তির কন্যা অক্ষত মূর্তির (Akshata Murthy) অতিরিক্ত ধন-সম্পদ তার জন্য কাল হলো। কোন সন্দেহ নেই যে স্বামীর প্রধানমন্ত্রী হবার পথে কাঁটা হওয়া এ নারীর নাম ইতিহাসে অমর-অক্ষয় হয়ে থাকবে।

বিদায় বরিস জনসন। ২০০৮ সালে যখন আপনি লন্ডনের মেয়র পদে দাঁড়ালেন, তখন জনগণ আপনার অতিরিক্ত মদাসক্তি নিয়ে কথা তুলেছিলো। আপনি কথা দিয়েছিলেন, আপনি পরিমিত মদ্যপান করবেন। জনগণ বিশ্বাস করে শুধু আপনাকে মেয়ব নয়, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রীর আবাস আপনাকে উপহার দিয়েছিলো। স্বয়ং ইশ্বর অতিমারী করোনার সময় আপনাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি বদলালেন না। এবার আর রাষ্ট্রীয় আচারের বাধা নেই। তবে পরমায়ু লাভ যদি আপনার এ মুহূর্তের লক্ষ্য হয়, তবে আপনাকে বদলাতে হবে।

লেখক: আনোয়ারুল কবির, উপাচার্য, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এসইউবি)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত