একশো বছরে ‘কবর’: যে কবিতা জসীম উদ্দীনকে অমর করল
সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৫, ১৫:১৫

জসীম উদ্দীন (১৯০৪–১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক গুণী কবি, যিনি গ্রামীণ জীবন ও লোক ঐতিহ্যকে সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘কবর’ কবিতা ১৯২৫ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর শতবর্ষ পার করলো কবিতাটি। এ কবিতার মধ্য দিয়ে কবি চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের বুকে। দাদার বয়ানে পরিবারের করুণ মৃত্যুকথা বর্ণনা করা কবিতাটি যেন এক গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্রপট।
জসীম উদ্দীনের সাহিত্যে গ্রামীণ মানুষের হৃদয়ের ভাষা, মাটির গন্ধ, লোকজ উপকরণ ও সহজ অথচ গভীর জীবনবোধ—সবকিছুই রয়েছে। তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে রাখাল ছেলের বাঁশি, বাঙালি সধবার কপালের টিপ, মেঠোপথ, ক্ষেতের ধান, পুঁথিপাঠ, জারি গান ইত্যাদি। এই উপকরণই তাঁকে আলাদা করে তোলে।
কবিতাটিকে ঘিরে ড. দীনেশচন্দ্র সেন-এর ভূয়সী প্রশংসা, ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা এবং এটি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া—সব মিলে কবির সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা পেতে মূল অবদান ছিল এই ‘কবর’। কবি নিজেই লিখেছেন, ‘‘তোমার কবিতা পড়ে আমি অনেক চোখের জল ফেলেছি… তোমার কবিতাটি ম্যাট্রিক ক্লাসের পাঠ্য হয়েছে। আমার যতদূর জানা আছে, পৃথিবীর কোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রের লেখা এ পর্যন্ত পাঠ্য হয় নাই।’’
এই কবিতায় দাদা একে একে বর্ণনা করেন স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূ, নাতনি এবং পুত্রের মৃত্যু। সে বর্ণনায় গ্রামীণ জীবনের সহজ সরল বাস্তবতা, পারিবারিক আবেগ, শোকের গাঢ় ছায়া আর নিঃশেষ একা হয়ে যাওয়ার কষ্ট একত্রে ধরা পড়ে। কবিতায় উঠে আসে: ‘‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’’
কবিতাটি কেবল শোকের নয়, বরং এই মাটির মানুষের জীবনের সত্য, সংগ্রাম ও সম্পর্কের অন্তরঙ্গ কাব্যিক রূপ। কবির মাটির প্রতি, মা-মাটির প্রতি প্রেম তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। একমাত্র গ্রামীণ বাস্তবতাই নয়, মৃত্যুর দার্শনিকতা, স্মৃতির মর্ম, ভালোবাসার গাঢ়তা, জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব এই কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
সমালোচকেরা তাঁকে ‘আঞ্চলিক’ বলে দূরে রাখতে চাইলেও বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় তাঁর অবস্থান প্রশ্নাতীত। কবির ভাষায়, ‘‘আমাদের যা আছে তার উপরই নতুন সৃষ্টি করিতে হইবে… পুরাতনের ভিতর যে মণি মাণিক্য আছে তাহা ঘসিয়া মাজিয়া লোকচক্ষুর গোচর করিতে হইবে।’’
আজ শতবর্ষ পরেও ‘কবর’ কবিতাটি আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে, চোখ ভিজিয়ে দেয়। পল্লীর সহজ সত্যরূপকে শিল্পের উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেওয়ার এই সাফল্যই জসীম উদ্দীনকে দিয়েছে অমরত্ব।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










