ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০১৯, ১৭:১৬

প্রিন্ট

সাক্ষাৎকারে জাফরুল্লাহ চৌধুরী

খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়ার কারণ তারেক?

খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়ার কারণ তারেক?
কিরণ সেখ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তিনি একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। এর বাইরে তিনি বিএনপিপন্থী একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পেছনে তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটিও একজন প্রভাবশালী সদস্য। গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচন এবং জামায়াতসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা বলেছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কিরণ সেখ

বাংলাদেশ জার্নাল: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবির পেছনে কি কি কারণ দেখছেন আপনি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: একাদশ জাতীয় সংসদ যে নির্বাচনটা, সেটা ভরাডুবি না বলে, বলা যেতে পারে ভোট ডাকাতির কি কি পদ্ধতি- সে বিষয়ে আমাদের আলোচনা করা উচিত। কি করে এ ঘটনাটা ঘটানো হলো? স্বৈরশাসকরা, যারা গণতন্ত্রের নামেও স্বৈরশাসক হয়-বাকশাল। অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ, আমাদের সকলের প্রাণের একজন মানুষ। যিনি সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন। তিনি হঠাৎ সবার কথা অগ্রাহ্য করে বাকশাল করলেন। বড় মানুষের পিছনেও একটা ছোট মানুষ লুকিয়ে থাকে। তাই তাজউদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ সবার কথা অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধু বাকশাল করে বসলেন। সেই দিনের কথা আপনাদের স্মরণ থাকা উচিত, তখন এমন একটি কষ্ঠ রোধ অবস্থা হয়ে যায় যে, সব পত্রিকা বন্ধ করা থেকে শুরু করে...। মাত্র দু'জন ব্যক্তি ১০ মিনিটের মধ্যে সংসদে পদত্যাগ করেন। এখনো ঠিক তাই। গণতান্ত্রিক ভোট হয়। তবে এবারের ভোটটা একবারে অদ্ভুত ম্যাজিক দেখানোর মতো ঘটনা। লুণ্ঠন পদ্ধতিটা এতো চমক ও অভিনব ছিল যে, কেউ ভাবতেই পারেনি কি করে হলো। রাতে বেলাই আমলা ও পুলিশ ভোটের বাক্সে ভরে দিয়েছেন। পরে দিন কিছুটা লোক দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, এদেরও (বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) ভুল কিছুটা যে ছিল না, তা নয়। উনাদের ধারনা ছিল যেভাবে দেশে হাওয়া বইছে, এই ঝড়ে নৌকা ডুবে যাবে। কিন্তু নৌকার মাঝি যে নৌকাকে নদীতে না ভাসিয়েও ডাঙায় রেখে নৌকা চালাতে পারেন, সেটাই দেখিয়েছেন। সেটা উনারা উপলব্ধি করেন নাই। দ্বিতীয় ভুল ছিল, আমরা সবাই প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু উনি যা কথা দিয়েছিলেন, তার একটা কথাও রাখেননি। এছাড়া বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট থেকে অনেক আসনে সঠিক প্রার্থীকে না দিয়ে ভুল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয় ভুল হলো, আমাদের এসব দলের মধ্যেও কিছুটা সমস্যা আছে। প্রত্যেকটা দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা নাই। দেশে গণতন্ত্র না থাকলে গণতন্ত্রের উদ্ভবও হয় না। দলে হয় পরিবার তন্ত্র, হয় স্বৈরতন্ত্র, আত্মীয়-স্বজন... এসব সমস্যা।

বাংলাদেশ জার্নাল: সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: সিদ্ধান্তটা সঠিক হয়েছে। কারণ আমাদের দলীয় সরকাররা এতো স্বৈরতান্ত্রিক থাকে, এতে নির্বাচন হয় না। আর সংসদ নির্বাচনে বিএনপির একটা লাভ হয়েছে, তারা হেরে গেলেও তারা প্রমাণ করেছে, তাদের নেত্রী (বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া) ২০১৪ সালে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। সুতরাং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বাংলাদেশে কখনো সুষ্ঠু হবে না। আর এতো দুর্বল নির্বাচন কমিশন...!

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে ও পরে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন যে, ফ্রন্টের সাথে তারেক রহমানের কোন সম্পৃক্তা থাকবে না। তবে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, এটা কি নির্বাচনের ওপরে কোন প্রভাব পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তারেক রহমান বিএনপির নেতা। তবে ঐক্যফ্রন্টে তার প্রতিনিধি ছিল। আর বিএনপি কাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, সেটা বিএনপির ব্যাপার। কিন্তু বিএনপির এটা নিয়ে কিছু কিছু প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ২২ জন জামায়াতের নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। তবে এবিষয়টি ফ্রন্টের জানা ছিল না। কিন্তু নির্বাচন তো হয়নি। সুতরাং এটার প্রভাব কি হয়েছে, সেটার আলোচনা রাখে না।

বাংলাদেশ জার্নাল: নির্বাচনে জামায়াতের ২২ জন নেতাকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: এটা অহেতুক ও ভুল কাজ ছিল। কিন্তু নির্বাচন হয়নি। তাই এটা বলা যাবে না।

বাংলাদেশ জার্নাল: নির্বাচনের পরে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতারা বলছেন, ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনে সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অর্বাচীন কিছু ব্যক্তি লুকিয়ে থেকে এধরণের কথা বলেন। সুতরাং এ বিষয়ে কোন আলাপ করা যাবে না। আর এটা একটা আজগুবি কথা। আমার নিজের মহাসচিব সম্পর্কে...! কিন্তু তারা (বিএনপির সিনিয়র নেতা) কেউ মাঠে নামেন না। সিনিয়র নেতাদের চেহারা দেখা যায় না। নিজেদের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের জন্য পয়সা খরচ করেন না, হালুয়া, রুটি খেয়ে ব্যাংক নিয়ে এই করেছেন, ওই করেছেন। এটা তো অর্বাচীন উক্তি।

বাংলাদেশ জার্নাল: ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ফ্রন্টের ব্যানারে কোন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। বিএনপির নেতারা ফ্রন্টের ব্যানারে বেগম জিয়ার মুক্তির কর্মসূচির দাবি জানিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্ট কি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কোন কর্মসূচি ঘোষণা করবে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: বেগম জিয়া তো এক ব্যক্তি। আর তাকে অন্যায়ভাবে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা করা হয়েছে। আর ঐক্যফ্রন্টের যে কয়েকটি মিটিং করা হয়েছে, সেগুলোতে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তো উঠেছে। এছাড়া এজন্য ঐক্যফ্রন্ট যেটুকু না করতে পারে তার চেয়ে বেশি করতে পারবে বিএনপি। কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপির মায়া কান্না আছে, কিন্তু কঠিন কোন পদক্ষেপ নেই। সুতরাং আমার জন্য আমার লোকেরা যদি না দাঁড়ায়...। তবে আমরা তো বিএনপির পাশে আছি। তাই এজন্য বিএনপিকে আরো সক্রিয় হওয়া দরকার। এছাড়া আরো শক্তিশালী হতে হলে তারেক জিয়াকে নিজের রোলটা নিজেকেই ভালো করে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এটা না হওয়ার জন্য, সে (তারেক রহমান) একটা কারণ কি না? এটার সুরহা না হলে এবং বিএনপি সক্রিয় না হলে বেগম জিয়ার মুক্তিটা কবে হবে- সেটা বলাটা মুশকিল।

বাংলাদেশ জার্নাল: ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতারা মধ্যবর্তী নির্বাচনে দাবি জানাচ্ছেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর এখন দুটি কাজ করা উচিত। প্রথমত, একটা সংলাপ করা উচিত। যদিও উনি সংলাপে চালাকি করেন। কিন্তু এবার খোলা মনে করতে হবে। কারণ উনি তো অর্জন করে ফেলেছেন। তাই সংলাপ করে গায়েবি ও আজগুবি যত মামলাগুলো উনি করেছেন, সেগুলো প্রত্যাহার করে নিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ছেড়ে দেওয়া। আর দেশকে স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়া। এছাড়া যে ৮ জন (বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত প্রার্থী) তাদের সংসদে নিয়ে যাওয়ার পথটাকে সুগম করা। তাহলে সংলাপের পরে উনারা যোগদান করতে পারবেন। একইভাবে বেগম জিয়াকে জামিন দেওয়া উচিত, আমার মতে। দ্বিতীয়ত, ঐক্যফ্রন্টের ৩০০ জন, বাম ফ্রন্টের ১০০ জন এবং ইসলামিক আন্দোলনের ৩০০ জনসহ প্রত্যেক প্রার্থী বলছেন যে, এটা নির্বাচন হয় নাই। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর উচিত হবে একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা। এটা করে একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশ জার্নাল: সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত প্রার্থীদের শপথ গ্রহণ করা উচিত কি না, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: এমনি গিয়ে লাভটা কি। আর সংলাপ ছাড়া তাদের যাওয়ার কোন সুযোগ আছে বলে বলে আমি মনে করি না।

বাংলাদেশ জার্নাল: ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি মনে করি, ঐক্যফ্রন্টের টিকে থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিভিন্ন জেলায় সভা করার জন্য আমাদের আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জার্নাল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আপনাকে ও বাংলাদেশ জার্নাল পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেএস/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close