কানে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪৩ আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:১০

যখন কোন ব্যক্তি বাইরের কোন উৎস থেকে উৎপাদিত শব্দ ছাড়াই কানে শোঁ শোঁ শব্দ অথবা যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ শুনতে পান। কানের এ ধরনের সমস্যাকে চিকিৎসা বিদ্যায় ‘টিনিটাস’ বলা হয়।
যেকোন বয়সেই এ সমস্যাটি হতে পারে। শব্দটি শোঁ শোঁ বাদেও বাঁশির শব্দ, ঝি ঝি পোকা ডাকার শব্দ, বাতাস প্রবাহের শব্দ অথবা গুণ গুন শব্দও হতে পারে। সাধারণত রোগী থেমে থেমে অথবা অনবরত এ শব্দ শুনতে পান।
কানে শব্দ শোনার এ রোগটি তিন ধরনের হয়ে থাকে:
সাবজেকটিভ/বিষয়ী: এ ধরনের অস্বাভাবিক শব্দ রোগী বাইরের কোন কোলাহল ছাড়াই শুনতে পান। শব্দটির তীব্রতা নানা রকম হতে পারে। কেউ জোরে শোনেন, কেউ আস্তে। কেউ কেউ সারাদিনই একটানা শব্দ শোনেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময় পরপর শুনতে পান। এ ধরনের শব্দের কারণে রোগী ঘুমাতে পারেন না এবং দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা হতে পারে।
অবজেক্টিভ/বস্তুগত: এ ধরনের অস্বাভাবিক শব্দ রোগীর নিজের শরীর থেকেই উৎপাদিত হয় বলে মনে করা হয়। যেমন-বাতাস প্রবাহের মতো শব্দ, ঘূর্ণায়মান রক্তের প্রবাহ, মাথার মাংসপেশির সংকোচন, কানের ভেতর মাংসপেশির সংকোচন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজেও স্টেথোস্কোপের মাধ্যমে শব্দটি শুনতে পান।
অডিটরি হেলুসিনেশন/শোনার ভ্রম: এ ধরনের শব্দ রোগী কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে শুনে থাকেন। যেমন সিজোফ্রেনিয়া। এক্ষেত্রে রোগী গানের আওয়াজ অথবা কারো কথা বলার আওয়াজ শুনতে পান। অনেক সময় যে কোন অপারেশন পরবর্তী সময়েও কোন ঔষধের (কেটামিন) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা মাদকাসক্তি যেমন হিরোইন, গাজা সেবনের ফলেও এ ধরনের আওয়াজ শুনতে পান।
টিনিটাসের কারণসমূহ:
* বহির্কর্ণের সমস্যা: কানে ময়লা জমে যাওয়া, কোন কিছু আটকে যাওয়া। * মধ্যকর্ণের সমস্যা: অটোস্ক্লেরোসিস, কানের পর্দার রোগ, কানের ইনফেকশন, পর্দা ফেটে যাওয়া। * দাঁত ও চোয়ালের জয়েন্টে সমস্যা।
* কানে আঘাত পাওয়া বা আকস্মিকভাবে জোরে বাতাস প্রবেশ করা।
* উচ্চ রক্তচাপ।
* ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন থেরাপির প্রয়োগ।
* কানে পানি জমে যাওয়া।
* মাইগ্রেন।
* শারীরিক অন্যান্য কিছু অসুখ, যেমন-অ্যাকুয়াস্টিক নিউরোমা, রক্তশূন্যতা, ল্যাবিরিন্থাইটিস, মিনিয়ার্স ডিজিজ, অস্টিওস্ক্লেরোসিস, থাইরয়েডজনিত অসুখ ইত্যাদি।
* রক্তনালীর কিছু সমস্যা, যেমন- ক্যারোটিড অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হলে।
* কিছু ওষুধ সেবন যেমন-অ্যাসপিরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক।
* অতিরিক্ত মোবাইল ফোন বা হেড ফোন ব্যবহার করা।
* অন্যান্য কারণসমূহ।ঘরের চিকিৎসা:
* ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়, যেমন কফি পান করা এড়িয়ে চলতে হবে।
* মদ্য পান পরিহার করতে হবে।
* অ্যাসপিরিন ও ব্যথানাশক ওষুধ যথাসম্ভব কম সেবন করতে হবে।
* নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।। ব্যায়ামে রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বাড়ে। এতে টিনিটাসের প্রকোপ কমে। তবে সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম এ সময় না করা ভালো।
* ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ নিকোটিন কানের ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালী সরু করে রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে টিনিটাসের প্রকোপ বাড়ে।
* উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলতে হবে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা, অনেক সময় ধরে মোবাইল ফোনে কথা বলা পরিহার করতে হবে।
* কারো কারো ক্ষেত্রে ঘরে মৃদুস্বরে গান বাজালে টিনিটাস কম হতে দেখা যায়।কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
* ঘন ঘন কানে শোঁ শোঁ বা টিনিটাস হলে।
* এক সপ্তাহের বেশি সময় টিনিটাস থাকলে।
* কানে শুনতে অসুবিধা হলে বা কানে না শুনতে পেলে।
* ভার্টিগো বা মাথাঘোরার সমস্যা হলে।
* শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা হলে।
* বমি হলে অথবা বমি বমি ভাব হলে।প্রতিকারের উপায়:
* শব্দদূষণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
* উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে কাজ বা বসবাস করা যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে। এ রকম পরিস্থিতিতে শব্দ কম শুনতে এয়ার প্লাগ ব্যবহার করা উচিত।
* হেডফোনে উচ্চৈঃস্বরে ও বেশী সময় গান শুনবেন না।
* ওজন কমিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।।
* কটন বাড দিয়ে কান না চুলকানো ভাল। এতে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে কানে শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে।
* কানে ময়লা জমলে তা বের করতে কটন বাড ব্যবহার না করে অলিভ অয়েল ব্যবহার করতে হবে। এতে কানের ময়লাও বের হবে এবং পর্দাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বেশী (সমস্যা হলে নিকটস্থ নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ দেখাবেন)
* টিনিটাসের চিকিৎসার জন্য আপনার ইএনটি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।লেখক: ডা. নিলয় আনন্দ শীল, মেডিকেল অফিসার, ইএনটি, আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ ও অধ্যাপক ডা. এম. আলমগীর চৌধুরী, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইএনটি, আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ










