শাপলা চত্বরের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২:১৭ আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২:২৬

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
তাদের মধ্যে ‘পলাতক’ ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পাশাপাশি কারাগারে থাকা ১০ আসামিকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ সোমবার এ আদেশ দেয়। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “ট্রাইব্যুনাল ৪১ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আমলে নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হবে। ট্রাইব্যুনালের কাছে মামলাটির বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করার আবেদন জানানো হয়েছে।”
শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। সেদিন সেই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা আর তাণ্ডব চলে। পরে সেই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এর ভিত্তিতে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘‘শাপলা চত্বরের সেই ঘটনাপ্রবাহে মোট ৬১ জন নিহতের তথ্য পেয়েছে প্রসিকিউশনের তদন্ত দল, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।’’
“তদন্তে হেফাজতে ইসলামের নেতারা ও মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সহযোগিতা করেছে। অধিকারের প্রতিবেদনকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং নিজেদের তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগের আইনি ভিত্তি নিয়ে তিনি বলেন, “শাপলা চত্বরে ৩২ জন এবং ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আরও ২০ জনকে হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(সি) ধারার আওতায় উভয় ঘটনাকেই জেনোসাইড হিসেবে অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এখানে পলিটিক্যাল পারসিকিউশন, সিভিলিয়ান জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ এবং জেনোসাইড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।”
আমিনুল ইসলাম বলেন, “তদন্তে আসামিদের পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, সরাসরি অংশগ্রহণ এবং কিছু ক্ষেত্রে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কনফেশনও পাওয়া গেছে।”
আসামির তালিকায় যাদের নাম
১. শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী
২. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
৩. মো. শামসুল হক টুকু সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
৪. হাসানুল হক ইনু, তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী, জাসদ সভপতি
৫. শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মন্ত্রী
৬. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী
৭. মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক মন্ত্রী
৮. হাসান মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী
৯. আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক এমপি
১০. আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক মন্ত্রী
১১. মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক এমপি
১২. জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী
১৩. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী
১৪. মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক মন্ত্রী
১৫. ওমর ফারুক চৌধুরী, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান
১৬. সালাউদ্দিন মাহমুদ ওরফে এসএম জাহিদ, সাবেক এমপি
১৭. ইমরান এইচ সরকার, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র
১৮. শাহরিয়ার কবির, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি
১৯. মোজামেল বাবু, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক
২০. ফারজানা রুপা, সাংবাদিক, একাত্তর টিভি
২১. হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি
২২. এ কে এম শহীদুল হক, তৎকালীন আইজিপি
২৩, মোহাম্মদ জাবেদ পাটওয়ারী, সাবেক আইজিপি
২৪. বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি ও তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার
২৫. মো. মোখলেছুর রহমান, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক
২৬. জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক সেনাপ্রধান ও বিজিবির তৎকালীন ডিজি
২৭. জিয়াউল আহসান, সাবেক মেজর জেনারেল, এনটিএমসি প্রধান এবং তৎকালীন পরিচালক, র্যাব ইন্টেলিজেন্স
২৮. লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, তৎকালীন এডিজি (অপস), র্যাব
২৯. মোহা. আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক ডিআইজি, তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি
৩০. শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি; তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিবি
৩১. মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজি, এসবি; তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি, এসবি
৩২. মো. মনিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ; তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার, ডিবি
৩৩. মো. আনোয়ার হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজি; তৎকালীন উপ কমিশনার, ডিএমপি
৩৪. মহা. আশরাফুজ্জামান, সাবেক ডিআইজি; তৎকালীন উপ কমিশনর, ডিএমপি
৩৫. এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি; তৎকালীন এডিসি, মতিঝিল জোন, ডিএমপি
৩৬. মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি; তৎকালীন ডিসি, লালবাগ বিভাগ, ডিএমপি
৩৭. বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি; তৎকালীন ডিসি, তেজগাঁও বিভাগ, ডিএমপি
৩৮. সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি; তৎকালীন পুলিশ সুপার, নারায়ণগঞ্জ
৩৯. মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক পুলিশ সুপার; তৎকালীন এডিসি, মতিঝিল বিভাগ, ডিএমপি
৪০. এস এম শিবলী নোমান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার; তৎকালীন এসি, রমনা জোন, ডিএমপি
৪১. বি এম ফরমান আলী, পুলিশ পরিদর্শক; তৎকালীন ওসি, মতিঝিল থানা
এ মামলার আসামিদের মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন দীপু মনি, হাসানুল হক ইনু, আব্দুর রাজ্জাক, শামসুল হক টুকু, শাহরিয়ার কবির, জিয়াউল আহসান, এ কে এম শহীদুল হক, আবদুল জলিল মণ্ডল, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘‘এ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্য, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ‘সমীকরণ’ নামে একটি তথ্যচিত্র সম্প্রচারকে ‘অপরাধে সহায়তা (অ্যাবেটমেন্ট)’ বিবেচনা করে একাত্তর টেলিভিশনের তৎকালীন প্রধান মোজাম্মেল বাবুকে আসামি করা হয়েছে।
“সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনার মূল নায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। পরিকল্পনায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।”
আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শাপলা চত্বরের এই জেনোসাইডকে রাজনৈতিক সংগঠনের অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেই তদন্ত করছি।”
৪১ জনকে আসামি করার কারণ ব্যাখ্যা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নয়, যাদের সুপিরিয়র বা কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি ছিল, তাদের আসামি করা হয়েছে।”
তদন্তের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “অনেক ভুক্তভোগী পরে সামনে আসেননি বা তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে নিশ্চিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগ আনা হয়েছে।”
ওই ঘটনাকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যা দিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “জেনোসাইড প্রমাণের জন্য ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক উপাদান প্রয়োজন। আমাদের মতে, এই মামলার মূল বিষয়ই জেনোসাইড।”
আইসিটি আইনের ৩(২)(সি) ধারায় জেনোসাইডের বিচারের বিধান রয়েছে জানিয়ে তিনি দাবি করেন, “চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা পরিকল্পিত আক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার এবং পরে ঘটনাটি বিকৃতভাবে প্রচার করাও অভিযোগের অংশ।”
তিনজনের বিষয়ে বার্গম্যানের প্রশ্ন
ব্রিফিংয়ের একপর্যায়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান একাত্তর টেলিভিশনের মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা এবং শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করেন, “তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কীভাবে অভিযোগ আনছেন?”
জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, “মোজাম্মেল বাবু একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান ছিলেন এবং ফারজানা রুপা সেখানে কাজ করতেন। মোজাম্মেল বাবুর নির্দেশে ফারজানা রুপা ‘সমীকরণ’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। সেখানে শাপলা চত্বরে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়। এটাও একটি অপরাধ।”
এ সময় বার্গম্যান জানতে চান, “সেটা কী ধরনের অপরাধ? ওই প্রতিবেদন তো ঘটনার ছয় মাস পর প্রচারিত হয়েছিল। তাহলে সেটি কীভাবে এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধ হয়?”
এর জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, “একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিবেদকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘটনার ফুটেজ ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো গোপন করেন, লুকিয়ে রাখেন এবং এর মাধ্যমে তারা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা (অ্যাবেটমেন্ট) করেন। এ কারণেই তাদের আসামি করা হয়েছে।”
ওই তথ্যচিত্রে এক হেফাজত নেতার সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ তুলে বার্গম্যান কথা বলতে শুরু করলে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত অভিযোগ পেয়েছি এবং আমাদের হাতে প্রাইমা ফেসি (প্রাথমিক প্রমাণ) রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমাদের প্রমাণ করতে দিন। তারা এই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পাবেন।”
বার্গম্যান এরপর জানতে চান, “শাহরিয়ার কবিরের বিষয়টি কী? তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?”
জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমি ইতোমধ্যে চার্জে সেটা বলেছি। আপনি চার্জগুলো দেখুন।”
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










