ঢাকা, রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ১৮ মিনিট আগে
শিরোনাম

‘বদির মেটিকুলাস ডিজাইনেই একরাম হত্যা’, বললেন চিফ প্রসিকিউটর

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ২০:১৩

‘বদির মেটিকুলাস ডিজাইনেই একরাম হত্যা’, বললেন চিফ প্রসিকিউটর

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিই টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মেরে ফেলার ছক কষেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম।

ওই ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নেওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই মামলার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ বিভিন্ন সারকামস্টেন্সিয়াল এভিডেন্স (পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য)—এগুলোর ভিত্তিতে সেখানে আমাদের সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি হিসেবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আবদুর রহমান বদি—সেখানকার একজন কুখ্যাত…আমরা সংসদ সদস্য বলতে লজ্জাবোধ করছি। উনি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তার মেটিকুলাস ডিজাইনেই, এই বদির পরিকল্পনায় এই ঘটনাটা ঘটেছিল।

তিনি বলেন, কারণ এই একরাম ছিল তার প্রতিপক্ষ এবং এটাও আপনাদেরকে একটু অবহিত করে রাখি—এটা পরবর্তীতে হয়তো সাক্ষ্য-প্রমাণে আসবে, আপনারা দেখবেন যে একরামকে হত্যা করার পর তার সম্পত্তি কিন্তু এই বদি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিল এবং নেপথ্যের নায়ক ছিল সেই আবদুর রহমান বদি।

প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলামের তরফে রোববার সকালে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।

এদিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এছাড়া অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা তিনজনকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের একজন টেকনাফের এক সময়ের এমপি আবদুর রহমান বদি।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন—সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান।

আসামিদের নাম উল্লেখ করে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, এদের বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে তাদের সম্পৃক্ততা, তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাদের কাছে রিপোর্ট সাবমিট করে। সেই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আজকে তাদের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দিয়েছি এবং সেই ফরমাল চার্জের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মাননীয় ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন। সেখানে বেশ কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার আছে, তাদেরকে শোন অ্যারেস্ট করা হয়েছে এবং যারা পলাতক আছে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়া হয়েছে। সেই মামলাটিও আগামী ২৫/৮/২৬ তারিখে আপনার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আপনারা জানেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার—তারা যে মতের মানুষই হোক না কেন, যখনই তাদের মতের বিরুদ্ধে আচরণ করত; তখনই তাদেরকে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে টার্গেট করে অপহরণ করা হত, পরবর্তীতে তাদেরকে কাউকে আয়নাঘরে বন্দি করা হত অথবা কাউকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হত। এরকমই একটি ঘটনা হচ্ছে আমাদের তৎকালীন কাউন্সিলর একরাম হত্যা মামলা। যেখানে একরামের মোবাইল ফোনটা সুইচ অন ছিল এবং সেই সুইচ অন থাকা অবস্থায় তার মেয়েরা এবং তার স্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডের এই যে গুলির…মানে ফায়ারিংয়ের আওয়াজ, তার পরে একরামের যে কথোপকথন—এগুলা সব শুনতে পাচ্ছিল। এবং সেটি আমাদের তখনকার ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকা একটা নিউজও করেছিল। এই সমস্ত কিছু আমরা আলামত হিসেবে নিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামি রুহুল আমিন ও আশেকুর রহমান তারা সরাসরি গুলি করেন। আর মিফতাহ উদ্দিনসহ অন্যান্য র‍্যাব কর্মকর্তারা, যারা তখন ঐ স্পটে উপস্থিত ছিল এবং তাদের তত্ত্বাবধানে, তাদের পরিকল্পনায় ওখানে হত্যাকাণ্ডটা সংঘটিত হয়। শুধু তাই না, এই ঘটনার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এবং শেখ হাসিনা এই ঘটনাটা যাতে আর বাড়াবাড়ি না হয়, এটা নিয়ে যাতে কোনরকমের তারা উচ্চবাচ্য না করে, সে কারণে একরামের স্ত্রীকে শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে এসে তাকে বলেছিল যে, এটা নিয়ে যাতে আর বাড়াবাড়ি না করে, তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ওবায়দুল কাদের নিজে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং ওবায়দুল কাদেরের এই ঘটনার মধ্যে তার একটা স্বীকারোক্তি আছে। সেগুলি সাক্ষীরা, বিশেষ করে একরামের স্ত্রী, তার বক্তব্যের মধ্যে বিস্তারিত ঘটনা আসছে। এবং তিনি বলেছেন যে, ওবায়দুল কাদের তাকে নিয়ে এসে শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছে এবং এই ঘটনাটা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই সমস্ত কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং এই সমস্ত ইনভেস্টিগেশনটা আমরা পর্যালোচনা করে যাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ প্রাইমারি ফেইজে কেস পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ফরমাল অভিযোগপত্র দাখিল করেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এটি বলেছে যে, আমাদের যে রাষ্ট্রকাঠামো, যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি আজকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি এরকম হত্যাকাণ্ডের সাথে, এরকম নরহত্যার সাথে যদি তারা জড়িয়ে যায় এবং যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড—এরকম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মানে, একটা শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে যদি এরকম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তাহলে তো এটি অত্যন্ত অ্যালার্মিং বলে আজকে ট্রাইব্যুনালের মাননীয় চেয়ারম্যান শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে র‌্যাবের কথিত বন্দুক যুদ্ধে মারা যান টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক। পরে র‌্যাবের বিজ্ঞপ্তিতে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ এবং ‘ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার’ আখ্যায়িত করে বলা হয়েছিল, একরামের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

একরামুলের ভাই এহসানুল হক বাহাদুর তখন বলেছিলেন, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের পরিচয় দিয়ে সাধারণ পোশাকের কিছু লোক শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার ভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। তারা জানায়, জমি বিক্রির ব্যাপারে একরামুলের সঙ্গে কথা বলতে চায় তারা। পরে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একরামুলের নিহত হওয়ার খবর পান।

পরে একরামের মৃত্যুর সময়কার একটি অডিও প্রকাশ পেলে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ ওঠে, র‌্যাব পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে। একরামকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

একরাম হত্যার সময় র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় বেনজীরের পাশাপাশি কক্সবাজারে র‌্যাব-৭ এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের নামও আসে।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত