ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৪৬

প্রিন্ট

লাগ ভেলকি লাগ, যেই লাউ সেই কদু নীতি

লাগ ভেলকি লাগ, যেই লাউ সেই কদু নীতি
ছবি: সংগৃহীত

রাজীব কুমার দাশ

১। হাট-বাজার, রাস্তার মোড়, বাস-ট্রেন স্টেশনে কথিত ডাক্তার কবিরাজ পসরা বসিয়ে সবরোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। ওখানে যারা চিকিৎসা নেন, সবাই কিন্তু আমজনতা। আমজনতা আঁতেল ডাক্তার কবিরাজের শতভাগ গ্যারান্টি-কসম বিশ্বাসে ভর করে দশ-বিশ টাকায় দুধদাঁতের ব্যথা পেরিয়ে যৌবন শেষ করে কৃমি চোখের ছাউনি কেটে বাতের ব্যথা শেষ করে নতুন করে যৌবন বটিকা দানে এমন কী ক্যান্সার-করোনা তাড়িয়ে চিরযৌবন লাভ করে জীবনকে মাতিয়ে দেন।

কথিত ডাক্তার হারবাল কবিরাজ বেশ ভালো করেই জানেন, কস্তুরী উনি জীবনে ও দেখেননি, পদ্মমধু তো দূরের কথা। আমজনতার সর্বরোগ সারাতে দেয়া হয়েছে- ময়দা, গুড়, খাবার কর্পূর। আমজনতাও জানেন, বর্তমানে ফুটপাতের ডাক্তার-কবিরাজ দন্ত চিকিৎসা নিয়ে সুফল কেউই পাননি। তদুপরিও কেন জানি! ফুটপাতের কবিরাজের একবারের ভাষণে পকেটের সব টাকাই শেষ। সবাই আফসোস করে বলেন, ‌‘আমরা কেউ তো নিতে চাইনি; কিন্তু সবই কবিরাজের হাতে থাকা শয়তান-পিশাচের হাড্ডি ‘লাগ ভেলকি লাগ’ জাদু দিয়ে আমাদের পকেটের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’

২। ভুক্তভোগী চালাকচতুর-ফতুর আমজনতা এখন নতুন কবিরাজ খুঁজতে তেমন একটা আগ্রহী নন; কারণ তাদের জীবনে এ পর্যন্ত ফুটপাত পেরিয়ে সরকারি-বেসরকারি কবিরাজ ধরে তেমন সুফল বয়ে আনেনি।

এক সময়ে রাস্তা গলির মোড়ে সহজ সরল আমজনতা চা দোকানে বসে চা-পান খেয়ে বিড়ির সুখটানে সিনেমা নাটকে থানা পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, বিচারকের হাতে একটি হাতুড়ি দেখে অর্ডার অর্ডার শুনে আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসির মঞ্চ দেখে ‘আইন সবার জন্য সমান’ মনে করে বুকে সাহস নিয়ে নতুন নতুন কবিরাজ আটক করে থানা পুলিশ হয়ে কোর্টে গিয়ে সারাদিন অভুক্ত থেকে যখন বাসায় ফিরে খালি হাতে খালি পেটে রাত পার করে বারবার পুলিশের সাথে সাক্ষী হয়ে কোর্টে গিয়ে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১১(১)অনুচ্ছেদে নির্দোষতার অনুমান নীতি (presumption of innocence) জানতে পেরেছে! ফুটপাত কবিরাজ হয়ে দেশের সকল কবিরাজের একই নির্ভুল ডায়ালগ ‘লাগ ভেলকি লাগ’ কৌশল বুঝতে পেরেছে! আমজনতাকে আর কবিরাজের শপথ কসম, চোখের পলক, হাসির ঝলক নিয়ে কখনোই উৎসাহী উৎসুক হতে দেখা যায়নি।

৩। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো- জনগণের কল্যাণ সাধন করা। কী প্রকারে, কীভাবে জনগণের সেবা করতে হবে? কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের দিন হতে অবসরের শেষ দিন পর্যন্ত আমজনতার ঘাম ঝরানো টাকায় সরকার বেতনের সাথে রেশন টিএ/ডিএ দিয়ে এমনকি বিদেশ পাঠিয়ে পর্যন্ত জনগণের সেবায় নিয়োজিত রাখেন। কিন্তু নির্দয় নির্মম ব্যাপার হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসামাত্র সুবোধ যুবক-যুবতী দাবি করে বসেন ‘এ চেয়ারে বসতে আমার অনেক টাকা, শ্রম মেধা খরচ হয়েছে যে প্রকারেই হোক; সুদাসল চক্রবৃদ্ধিহারে উঠিয়ে নিতে হবে।’

সরকার ও নিজের প্রাতিষ্ঠানিক সব নিয়মকানুন পরিপত্র কর্তব্য ভুলে নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে নতুন নতুন ‘লাগ ভেলকি লাগ’ কবিরাজি মানবতা চালু করেন। নিজের কেতাদুরস্ত রসিকরাজ ঘরানা ব্যক্তিত্ব জাহির করে বলেন, ‘আমি ওমুক বংশের তমুকের ছেলে মেয়ে। বাড়িতে এটা-সেটার চাষ হয়, অমুক জায়গায় আমার সমুক মামা, খালু, ভাই আছে। আমার বাবা শালুক- তালুক দলের সভাপতি সেক্রেটারি।

প্রকাশ্যে দাম্ভিকতা ঔদ্ধত্য নিয়ে আরো বলেন, ‘আপনারা আমার বিরুদ্ধে কোথায় নালিশ-সালিশ দিবেন দেন, আমার কিছু হবে না, কিছু করতে পারবেন না।’ নতুন নতুন ফ্যাশন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে অফিসের কারুকাজ করে অফিস রুমে আমজনতার অফিস তাড়িয়ে রাতারাতি করে নেন হোয়াইট হাউস। অফিসের সামনে পেছনে বাউন্ডারির চারিদিকে নিজের বাহারি দামি রোদচশমা পরা সালোক, আমজনতা জড়িয়ে ধরে কিছু খাইয়ে দেয়া, গলা হাতে কিছু পরিয়ে তুলে দেয়া সালোক দামী অবিনশ্বর প্রচার ব্যানার সাঁটিয়ে ভীষণ কবিরাজ বাণী দিয়ে আমজনতাকে ভীষণ সততা বাণী বড়ি গিলতে বাধ্য করেন। এ ভীষণ কবিরাজ সবার সামনে কিন্তু বেশ সৎ! পুরাতন কিছু কাপড়-কম্বল চাল ডাল ভাগিয়ে নিয়ে দান করেন ও ছবি তুলে মানবতার ফেরিবাবা সেজে মিডিয়া, পোর্টালে লাগাতার প্রচার করে নিজের পেজ-ফেসবুক সরব রাখেন। মাঝে মাঝে ভাঙ্গা ভাঙ্গা আঞ্চলিকতার টানে লাইভে এসে নিজের দৈনন্দিন পেশা নেশার জানান দেন। সবার সামনে কিন্তু বেশ সৎ! টুকটাক খুচরা টাকা পয়সা নিয়ে হাত ময়লা করতে চান না। কিন্তু রাতের আঁধারে চোখের ইশারা, সিন্ডিকেট কারসাজি করে অধিক্ষেত্রের ইঞ্চি, গজ, ফুট জায়গার হিসাব পাঁই পাঁই করে বুঝে নেন। এ হলো দেশ বিদেশের উন্নয়নশীল দেশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বহুমুখী বহুরূপী সততার নির্মম বাস্তবতা!

এ সিন্ডিকেট আবার ‘যেই লাউ সেই কদু’ নীতিতে বিশ্বাস করেন। এদের নেই কোনো ধর্মনীতি, আদর্শ, নেই ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা সৌজন্যবোধ! চেয়ার এদের আজীবনের জন্য, চেয়ার ওদের জীবন চেয়ার ওদের মরণ।

৪। একসময় এ ভীষণ কবিরাজের দাপটে এলাকা কেনো? তাদের সহকর্মী, এমনকি নিয়ন্ত্রণকারী বস পর্যন্ত ভয়ে তটস্থ থাকেন। কারণ এ কবিরাজের দল জাতীয় কৃতঘ্ন ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক ঘরানা হয়ে কখন কোথায় কীভাবে নিঃস্ব করে দিতে পারেন, তা কেউ টের পর্যন্ত পান না। এ ভীষণ চেয়ার সংস্কৃতিতে এরাই বছরের পর বছর ঘুরে ফিরে দাপটের সাথে আমজনতা শাসন, শোষণ, পেষণ করে জমিদারের নাতি হয়ে আমজনতা লালন পালন করেন।

৫। সকল আমজনতা না বুঝেই এ ভীষণ সরকারি-বেসরকারি কবিরাজের ‘লাগ ভেলকি লাগ’ সততা অভিজ্ঞ চালে কুপোকাত হয়ে সর্বস্বহারা হলে ও চালাক অভিজ্ঞ আমজনতা এ সম্প্রদায়ের চোখের ভাষা, মুখের ভেংচি, হাসি হাতের ইশারা সব বুঝে উচ্চবাচ্য না করে সবকুল হারানো ভাসমান নারীর মতো মুখ বুজেই ‘যেই লাউ সেই কদু’ নীতিতে জীবন কাটিয়ে দেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি ও পুলিশ পরিদর্শক।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত