ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২০, ১৫:২২

প্রিন্ট

বাঙালনামা- ১

চলো কলকাতা মহারাজার সঙ্গে

চলো কলকাতা মহারাজার সঙ্গে
ছবি: কলকাতায় ১৯৭৯ সালে মা ও আমি। এসপ্লানেড (সম্ভবত)
শান্তা মারিয়া

সেটা ১৯৭৯ সাল। আগস্ট মাস। আমার ন’বছর বয়স। বাবা বললেন, চলো একবার কলকাতায় ঘুরে আসা যাক। কলকাতার দিকে বাবা মা দুজনেরই অন্য রকম টান। আমার দাদা (ঠাকুরদা) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পৈতৃক ভিটাবাড়ি চব্বিশ পরগণায়। বশিরহাটের পেয়ারা গ্রাম। এর পাশেই ভাসলে গ্রামে আমার দাদীর (ঠাকুরমা) বাড়ি। সেসব গ্রামে বাবা তার শৈশবে অনেক দিন ছিলেন। কিশোর বয়সে নারিকেল ডাঙার মিলিটারি স্কুলে অনেক দিন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতের সরকার কলকাতায় প্রি-ক্যাডেট মিলিটারি ট্রেনিং স্কুল নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলে। সেখান থেকে ট্রেনিং প্রাপ্তরা মিলিটারি একাডেমিতে যেত ব্রিটিশ ভারতের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য। বাবা ঢাকা কলেজ থেকে আই এ পাস করে প্রি-ক্যাডেট মিলিটারি ট্রেনিং স্কুলে ছ’ মাসের ট্রেনিং নেন। সে সময় তিনি নারিকেল ডাঙাতে ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও কর্মী আমার বাবা (কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ) পঞ্চাশের দশকে জেলে বন্দী ছিলেন বছর পাঁচেক। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৫৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে যোগ দিতে তিনি কলকাতায় যান। সেসময়ও অনেক দিন তিনি বশিরহাটে ও কলকাতায় ছিলেন। তাই কলকাতার প্রতি তার রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। আর আমার মায়ের জন্ম ও শৈশব সবই কলকাতায়। সে কথা যথাসময়ে বলবো।

স্থির হলো প্লেনে যাওয়া হবে। কারণ বাবা ও মায়ের ভয় বেনাপোল দিয়ে যাবার ঝক্কি আমরা মানে আমি ও আমার ভাই সইতে পারবো না। ভাইয়া তখন মাত্র এইচএসসি পাস করেছে ঢাকা কলেজ থেকে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সব ঠিকঠাক।

আমার জীবনে সেই প্রথম প্লেনে চড়া হবে। পাসপোর্ট তৈরি হলো আমাদের চারজনেরই। মুক্তিযুদ্ধের পর বাবা আর এর মধ্যে বিদেশ যাননি। নতুন দেশের নতুন পাসপোর্ট। পাসপোর্টে লেখা গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। দেখেও ভালো লাগে। বাংলাদেশ নামটায় হাত বোলাতে ইচ্ছে করে।

এয়ার ইন্ডিয়ায় যাব। টিকেট কাটা হলো পুরানা পল্টনের কর্ণফুলী ট্রাভেলস থেকে। এই ট্রাভেল এজেন্সির মালিক আমাদের লতায় পাতায় আত্মীয়। এর অন্যতম মালিক ছিলেন বাবার দিকের আত্মীয় কোটিপতি ধনী ইসমাইল সাহেব। বাবার ইসমাইল ভাই। তিনি ১৯৬৪ সালে কায়রোর প্লেন ক্র্যাশে মারা যান।

কর্ণফুলী ট্রাভেলসের কাচের দরজার সামনে একটি বড় পুতুল রাখা আছে। মাথায় পাগড়ি, গায়ে কুর্তা, পায়ে নাগরা জুতো। এয়ার ইন্ডিয়ার মাসকট মহারাজা। বাবা বুঝিয়ে বললেন আসল কথাটা হচ্ছে মহারাজ। ইংরেজরা বলে মহারাজা। কি চমৎকার কাগজের লম্বা বইয়ের মতো টিকেট। অনেকটা ব্যাংকের চেকবই গোছের। ভিতরে ইংরেজিতে আমার নাম লেখা।

ঢাকার বিমান বন্দর তখন তেজগাঁতে। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। বোর্ডিং ব্রিজের কোন বালাই ছিল না। সিঁড়ি দিয়ে প্লেনে পৌঁছানো গেল। আমি আর বাবা পাশাপাশি বসেছি। অন্যদিকে মা আর ভাইয়া। শুনেছি প্লেন টেক অফ করাটা খুব ভয়ের ব্যাপার। কানে নাকি তালা ধরে যায়। ভাইয়ার পরামর্শে মুখের মধ্যে চুইং গাম নিয়ে চিবোচ্ছি।

একটুক্ষণ গড়গড়িয়ে চলে প্লেন একসময় টুক করে লাফ দিয়ে উঠে পড়লো আকাশে। কই, তেমন ভয় লাগলো না তো!

এখন আমি যে কথা লিখতে যাচ্ছি তা নিজের কাছেই বিশ্বাস হচ্ছে না। ঢাকা থেকে কলকাতা তো প্লেনে কতবারই যাওয়া হয়। আজকাল কোন এয়ার লাইন্সই যাত্রীদের তেমন আপ্যায়ন করে না। কেমন একটু গাছাড়া ভাব দেখি এয়ার ক্রুদের মধ্যে। অথচ সেই প্রথমবার আমাদের দেয়া হয়েছিল স্যান্ডুইচ, কমলা, আইসক্রিম, অরেঞ্জ জুস, সন্দেশ, কাজুবাদাম। আবার আমার জন্য আলাদা উপহার ছিল বড় একটা চকলেট। ভাবা যায়? আর এয়ার হোস্টেজের মিষ্টি হাসির তো কোন তুলনাই নেই। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। কি সুন্দর এদের সাজগোজ। পোশাকটাও কেমন আঁট করে পরা। কি স্মার্ট।

মাত্র ৪৫ মিনিটের যাত্রা। দেখতে না দেখতেই কখন কলকাতা পৌছে গেছি। দমদমের এয়ারপোর্টে আমাদের হ্যান্ড লাগেজ চেক করা হচ্ছে। কেউ বিদেশি জিনিস এনেছে কিনা তা দেখা হচ্ছে খুঁটিয়ে।

১৯৭৯ সালের আমার প্রথম বই ‘মাধ্যাকর্ষণ’ প্রকাশিত হয়। আমার ছোট্ট ছোট কবিতা সে বইতে। যিনি মালপত্র পরীক্ষা করছিলেন তার চোখে পড়ে বইটি। বাবাকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন এটা কি ব্যাপার। বাবাও অমনি মেয়ের গুণপনা ব্যাখ্যা করতে বসলেন। তখন তখনি এয়ারপোর্টের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সে বইয়ের কয়েকটি কপি উপহার দিতে হলো।

সঙ্গে ড্রাগস আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে মা তার হাত ব্যাগে থাকা ওষুধের বাক্স দেখালেন। রাজ্যের প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড আর এমনিধারা ওষুধ। ভদ্রলোক হেসে বললেন, এগুলো তো মেডিসিন। সেই প্রথম আমি শিখলাম মেডিসিন আর ড্রাগসটা আলাদা বস্তু। এর আগে সব সময় ওষুধের দোকানে সাইন বোর্ডে লেখা দেখেছি ‘কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট’ ।

(চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best