ঢাকা, শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : ১৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২০, ১৮:৩৮

প্রিন্ট

আম্পানে ভেসে গেছে উপকূলের ঈদ

আম্পানে ভেসে গেছে উপকূলের ঈদ

Evaly

শাকিলা ইসলাম জুঁই, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে সাতক্ষীরা জেলায় ২২ হাজার ৭১৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৬১ হাজার ঘরবাড়ি। এছাড়া কৃষি খাতে টাকার পরিমানে ক্ষতি হয়েছে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর প্রাণীসম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

আম্ফানে বাতাসের তোড়ে ৭৫০টি বৈদ্যুতি খুঁটি ভেঙে পড়েছে, আর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে আরও ৯৫৫টি বৈদ্যুতিক পোল। ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চলন ব্যবস্থ্যা বন্ধ হয়ে গত দু’দিনে অচল হয়ে পড়ে পুরো সাতক্ষীরা।

এ অবস্থার মধ্যে সব চেয়ে বশি ক্ষতি হয়েছে জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনিতে। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, মরিচ্চাপ, কাকশিয়ালী নদীসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৭.৫০ কিলোমিটার বেড়িবাধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে শ্যামনগর ও আশাশুনির অনেক বাঁধ এখনো মেরামত না হওয়ায় সেখানে দিনে দুইবার জোয়ার ভাটা খেলছে। এ অবস্থায় উপকূলজুড়ে যে দিকেই চোখ যাবে শুধু পানি থৈ থৈ করছে।

সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে ভেসে গেছে উপকূলের ঈদ আনন্দ। প্রিয় জনের নতুন জামা উপহার দেয়া তো দূরের কথা, অনেকেই সেমাই চিনি কেনার সাধ্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যে প্রলংয়কারী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষদের সর্বশান্ত করে দিয়ে গেছে। এ যেন মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘাঁ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষিরা।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, আম্ফানের তাণ্ডবে উপকূলীয় উপজেলা কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ মোট ৩টি উপজেলার ছোট বড় ১০ হাজার ২৫৭টি চিংড়ি ও মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। চিংড়ি মাছ, রেণু ও অবকাঠামোসহ মোট ১৭৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর কাঁকড়া প্রজেক্ট ও চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মোট ৪০ লক্ষ টাকা।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী গ্রামের আকরাম হোসেন জানান, আম্ফানের তাণ্ডবে বাড়ির সামনে চুনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বাড়ি-ঘর পানিতে থৈ থৈ করছে। ভেসে গেছে ১০০ বিঘা চিংড়ি ঘের ও তিনটি মিষ্টি পানির পুকুরসহ ২ হাজার ডিম দেওয়া মুরগির (লেয়ার) খামার। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তাদের। বাঁধ মেরামত না হওয়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন তারা।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, এবারের ঈদ যেন তাদের কাছে মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন। বাড়িতে বৃদ্ধ মা'কে ওষুধ খাওয়ানোর মতো একটুও মিষ্টি পানিও নাই। সেখানে আবার ঈদ। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডব আর নদীর জলোচ্ছাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তাদের ঈদ আনন্দ।

পাশ্ববর্তী দাঁতিনাখালী গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মুছাগাইন জানান, করোনার কারণে দুই মাস ইটভাটায় কাজ বন্ধ। না খেয়ে অর্ধাহারে ভাই দিন পার করছি। তাতে ঝড়ে চুনা নদীর বাঁধ ভেঙে বাড়ির উঠানে পানি উঠে আছে। জোয়ারে পানি উঠে আর ভাটিতে নেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে তারা ঈদের আনন্দ ভুলে গেছে। বাড়িতে চাল নেই, ঈদের জন্য এখনো সেমাই-চিনিও কিনতে পারেননি তিনি।

একই এলাকার দিনমজুর ফারুখ গাজী জানান, মাটি কেটে আর নদীতে মাছ ধরে তাদের সংসার চলে। করোনাভাইরাসের কারণে এখন আর কাজ নেই। বেশ কিছু দিন বাড়িতে বেকার বসা। তার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পান তাদের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে নদীর পানিতে তলিয়ে আছে ঘর-বাড়ি।

তিনি বলেন, দূর্গাবাটি ও দাঁতিনাখালি বাধ মেরামত না হওয়ায় বাড়ির সাথে নদীর পানির জোয়ার-ভাটা খেলছে। সেখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের বিষয়টি মনে নেই তাদের।

কলবাড়ী এলাকার জিএম মোস্তাফিজুর জানান, আম্পানের তাণ্ডবে বাধ ভেঙে পানিতে ৩০ বিঘা চিংড়ির ঘের ভেসে গেছে। দুটি কাঁকড়া প্রজেক্ট নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া কাঁকড়া প্রজেক্টের ১২ হাজার প্লাষ্টিকের বাক্স ভেসে গেছে। ক্ষতি হয়েছে ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা।

তিনি জানান, এবারের ঈদে মা ও ছোট ভাইয়ের জন্য কোন নতুন শাড়ি বা পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী কিনতে পারেনি। তাই মন খারাপ। কাছে নগদ কোন টাকাও নেই।

চারিদিকে নদী বেষ্টিত সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ী এলাকার হুসাই বিল্লাহ জানান, ঝড়ে তিনটা ঘর বিধ্বস্ত হয়ে পানিতে ভেসে গেছে। এখনো বাড়ির উঠানে হাঁটু পানি। সরকারিভাবে এখনো কোন সাহায্য মেলেনি। ৬ জনের সংসার নিয়ে কষ্টে আছি। ঈদের জন্য এখনো সেমাই দুধ ও চিন কিছুই কেনা হয়নি। সেখানে পরিবারের প্রিয়জনের জন্য নতুন কাপড়সহ উপহারসামগ্রী কেনাকাটার কথা ভাবতেই কষ্ট,আরও বেশি হচ্ছে।

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের মধ্যেই সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ্য প্রতিটি মানুষের দুঃখ দুর্দশা আরও চরম আকার ধারন করেছে। এবারের ঈদ আন্দন তাদের কাছে ম্লান হয়ে গেছে।

উপকূলজুড়ে যেদিকেই চোখ যাবে শুধু পানি আর পানি। এখনো শ্যামনগর ও আশাশুনির সাইক্লোনের তোড়ে ধসে যাওয়া বেড়িবাঁধগুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় বাড়ির আঙিনাসহ খাল-বিল রাস্তাঘাট পানিতে থৈ থৈ করছে। নদীতে জোয়ার-ভাটার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেন সাইক্লোন আম্পানে ভেসে গেছে উপকূলবাসীর ঈদ আনন্দ। তাই উপকূলবাসী ত্রাণ চায় না, চায় বেড়িবাঁধ সংস্কার।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা জানান, সুপার সাইক্লোন আম্পানে ৭ হাজার ৮৫০টি বাড়ি সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে ও আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার ৬শ’ ঘর-বাড়ি। এছাড়া এলজিইডির ৩০ কিলোমিটার রাস্তার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। আর কপোতাক্ষের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ৮ হাজার ৬৯৮ হেক্টর মৎস্য ঘের। ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্তের পাশাপাশি ৩২৯ হেক্টর জমির কৃষির ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম আবুজর গিফারী জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ৩০ হাজার হেক্টর জমির চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। সাড়ে ৪ হাজার মাটির ঘর-বাড়ি ভেঙে পড়েছে। আংশিক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে আরও ১১ হাজার বাড়ি।

এদিকে জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জলোচ্ছ্বাসে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জের ১২ ইউনিয়নের ১৩ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমির ঘের পানিতে ভেসে গেছে। যাতে ১,৬৭৭ মেট্রিক টন সাদা মাছ এবং ২,৫৩১ মেট্রিক টন চিংড়ির ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী ও কালিগঞ্জ উপজেলার মৎস্য চাষিরা।

তিনি জানান, ঝড়ের আগে ১,৯০৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ জন্য মৃত্যু কম হয়েছে। ঝড়ের আগে ৩৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। নতুন করে আরও ৩৭৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ঢেউ টিন ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত