হেমন্তের নবান্নে কুয়াশা–শিশির–ধানের প্রাচুর্যে মুখর জনপদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৫৭ আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১২

আজ পহেলা অগ্রহায়ণ। বছর ঘুরে আবারও এল নবান্ন উৎসব। নবান্ন উৎসব ঘিরে বাংলার লোকসাহিত্যে আছে নানা কাব্য। এ সময়ে বাংলার প্রকৃতি হলুদ-সবুজে একাকার হয়ে যায়। সোনালি ধানের প্রাচুর্যে ভরে ওঠে কৃষকের উঠান। আনন্দধারা বয়ে যায় কৃষকের মন-প্রাণে। নতুন ধানের ম ম গন্ধ। সব মিলিয়ে পিঠাপুলির উৎসবে আনন্দমুখর হয়ে উঠবে বাংলার জনপদ।

হেমন্তের হিমেল ভোরে ঘাসের ডগায় টলটলে মুক্তোবিন্দুর মতো শিশির জমে। ধানের শিষে ঝুলে থাকা সেই স্বচ্ছ বিন্দুগুলো যেন আকাশের আলো জ্বেলে রাখা ক্ষুদ্র প্রদীপ। আদিগন্ত মাঠ জুড়ে এখন সোনালি ধানের প্রাচুর্য—সবুজ স্বপ্ন দুলছে অবিরত। হলুদে-সবুজে মিলেমিশে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে নয়নাভিরাম, অপরূপ। চারদিকে হেমবরন এক ধূসর আবহ; দিবসে সোনা ঝরা রোদ্দুর, ওপরে অখণ্ড নীলের বিস্তার।
হেমন্তের স্বল্পায়ু দিন ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হয়ে আসে। শেষ বিকালে কুয়াশার আবছা চাদর নেমে ঢেকে ফেলে প্রকৃতিকে। শিশিরপাতে নামতে শুরু করে সন্ধ্যা। গভীর নিশিথে টুপটাপ শিশিরপতনের হিরন্ময় শব্দে দুলে ওঠে নির্জনতা। আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে কৃষকের মন-প্রাণ ভাসে আনন্দধারায়—বাড়ির উঠোনে উঠবে নতুন ধানের ম-ম গন্ধ। এসেছে অগ্রহায়ণ, এসেছে হেমন্তের প্রাণ—নবান্ন।

বাঙালির প্রধান অন্ন আমন ধান কাটার মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই নবান্ন উৎসব। কৃষিভিত্তিক সভ্যতার পুরোভাগে থাকা এ উৎসব অনাদি কাল ধরে বাঙালির জীবনে অধিকার করে আছে। নতুন ধান থেকে পাওয়া চালে হয় নবান্নের আয়োজন। হিন্দু লোককথায় দিনটি ধরা হয় বাৎসরিক মাঙ্গলিক দিবস হিসেবে। নতুন আমন চালের ভাত, নতুন ব্যঞ্জন, পিঠে–পুলি—উৎসবমুখর হয়ে ওঠে জনপদ।
গ্রামে মেয়েকে নাইয়র আনা হয় বাপের বাড়ি। কোথাও নতুন ধানের ভাত মুখে দেওয়ার আগে দোয়া, আবার কোথাও মসজিদে শিন্নি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। হিন্দু কৃষকের ঘরে চলে ধুমধাম পূজা। বারো মাসের তেরো পার্বণের বড় পার্বণ—নবান্ন।
এ উৎসবকে ঘিরে হিন্দু সমাজে প্রচলিত রয়েছে বারো পূজা। নতুন অন্ন প্রথম উৎসর্গ করা হয় পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ও অন্যান্য প্রাণীকে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন শেষে গৃহকর্তা ও পরিবারের সদস্যরা নতুন গুড়সহ নবান্ন গ্রহণ করেন। লোকবিশ্বাসে কাকের মাধ্যমে এই নৈবেদ্য মৃতের আত্মায় পৌঁছে যায়; এই অন্নকে বলা হয় ‘কাকবলী’।
রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। অগ্রহায়ণের প্রথম দিনকে ‘আদি নববর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। বহু জনপদে বসেছে গ্রামীণ মেলা, মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এসব আয়োজন। কৃষক রাশি রাশি সোনার ধান কেটে আনে ঘরে। কুয়াশায় মোড়া প্রকৃতির ভেতর ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় হেমন্তের বাতাসে। যদিও যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় আজ আর ঢেঁকির মুখরতা আগের মতো নেই, তবুও সেই আনন্দঘন আবহ ম্লান হয়নি পুরোপুরি। নতুন চালের পিঠা বানাতে শুরু হয় খেজুরের রস সংগ্রহ—নতুন রস আর নতুন চালের পিঠা বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত অংশ।

লোকায়ত গবেষকদের মতে, কৃষিপ্রথা চালুর পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালিত হয়ে আসছে। একসময় অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস—‘অগ্র’ মানে প্রথম, ‘হায়ণ’ মানে মাস। অতীতে নবান্ন পালিত হতো প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে। হেমন্তে আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ বা পৌষ মাসজুড়ে উৎসবে মেতে উঠত গৃহস্থরা।
হেমন্তের প্রকৃতির বিস্ময়কর রূপ ধরেছেন কবি-সাহিত্যিকরা। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন পুনর্বার ফিরে আসার অদম্য আকুতি—
‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
আবার কোথাও তাঁর বর্ণনায়— ‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল।’

এ সময় দেশজুড়ে চলছে আগাম আমন ধান কাটা ও মাড়াই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল উৎপাদনের মৌসুম। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আমন উৎপাদন হয় এসব দিনে। ফসল ঘরে তোলার আনন্দ ধরা পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যেও— ‘ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।’
অগ্রহায়ণে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে শীতের দশ প্রহরণও যেন মিলতে থাকে। জীবনানন্দেরই ভাষায়—
‘পাণ্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দ্বীপের কাছে আমি
নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে;
নবান্ন তাই শুধু নতুন ধানের স্বাদ নয়—ঋতুর পরিবর্তন, প্রকৃতির রূপ, কৃষকের পরিশ্রম, লোকাচার ও বাঙালি সংস্কৃতির এক সম্মিলিত উৎসবচিত্র। হেমন্তের শিশিরে, ধানের গন্ধে, রোদ্দুরে আবহমান বাংলা আজও খুঁজে পায় নিজের শেকড়ের ছোঁয়া।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










