বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছে রাজনৈতিক দলগুলো
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ২২:৫৩

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বর্ণনা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বলছে, এই বাজেট বাস্তবায়ন ‘অনেক কঠিন’। অবশ্য কোনো কোনো দল বাজেটকে স্বাগতও জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নতুন বাজেটকে ‘গণবিরোধী ও গণনিপীড়ক’ আখ্যা দিয়ে ঢাকায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে ঢাকা মহানগর জামায়াতের নেতাকর্মীরা। দলটি শুক্রবার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে। সেদিন বিক্ষোভ মিছিল করবে কোনো কোনো দল।
রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, বাজেটে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
এই বাজেট ‘বাস্তবায়ন করা কঠিন’: জাতীয় পার্টি
নতুন অর্থবছরের জন্য যে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, “এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য না, বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা কখনোই অর্জন হবে না। ফলে সরকার ডেভেলপমেন্ট বাজেট এডিপি থেকে ঋণ করে করবে, বেতন, সরকারি রেভিনিউ বাজেটও দেখা যাবে লোনের ভিত্তিতে হবে।
“এটা অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে; পাশাপাশি যদি বেতন বাড়ানো হয়, পে-স্কেল ইমপ্লিমেন্ট হয়, বেসরকারি খাতকে কিন্তু চাপে ফেলবে। প্রচণ্ড মুদ্রা স্মৃতি হওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। মুদ্রা স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের কোনো নির্দেশনা বাজেটে নাই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঠিক নির্দেশনা নাই।”
শামীম হায়দার বলেন, “চর এলাকার মানুষদের জন্য যাদেরকে আমরা চর ফাউন্ডেশন করা উচিত বা চর এলাকার যে ভাগ্য উন্নয়ন সেটার জন্য এখানে কোনো নির্দেশ নাই, বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে। আরো অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত।”
উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট: এনসিপি নেতা
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শুক্রবার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে এনসিপি।
তবে দলটির ‘ছায়া বাজেট কমিটি’র প্রধান আতিক মুজাহিদ এমপি বৃহস্পতিবার ফেসইবুক পোস্টে বলেছেন, “এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট। সরকার প্রায় ২.৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা বললেও বাস্তবে ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে ৪.৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
“কারণ প্রস্তাবিত ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অর্জন করা অসম্ভব। আমার ধারণা, রাজস্ব আদায়ে ২ লাখ কোটিরও বেশি ঘাটতি থেকে যেতে পারে। সুতরাং প্রকৃত হিসাব বিবেচনায় এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই: গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট
দশটি বামপন্থি রাজনৈতিক দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট বলছে, প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতনের পাটঅনো বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ জনকল্যাণ খাত অবহেলিতই রয়ে গেছে।
জোটের নেতারা বলেন, “সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কালো টাকা সাদা করার পুরোনো প্রক্রিয়া এবারও বহাল রাখা হয়েছে । রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাতবায়ন হবে কীভাবে? চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।”
বড় ফাঁপা বাজেট: সিপিবি
নতুন বাজেটকে ‘গণবিরোধী’ বর্ণনা করে সেটিকে স্বাগত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
দলের সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেট অনেক বড় অংকের কিন্তু একইসাথে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসার বা ফাঁকা বলে প্রতিভাত হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোন আশাবাদ প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। এই বাজেট বৈষম্য বৃদ্ধি করবে।”
বাজেটে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো দিক নির্দেশনা নেই বলে মনে করে সিপিবি।
দলটি বলছে, প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জিত হবে, সরকারের ওপর এমন আস্থাও রাখা যাচ্ছে না।
শুক্রবার বাজেট বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানাবে সিপিবি।
জাসদের কাছে বাজেট ‘চমকবাজি’
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘রাজনৈতিক চমকবাজি’ বলে বর্ণনা করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।
দলটির ভাষ্য, “বাজেটের আকার বড় দেখানোর জন্য ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা অবাস্তব এবং কোনোভাবেই অর্জনযোগ্য নয়।”
দলের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের পাঠানো প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, “বিএনপি সরকার ড. ইউনূসের মবের শাসন, মগের মুল্লুকের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আনতে পরেনি। আইনের শাসন ও সুশাসনের অনুপস্থিতির কারণে দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ করার বদলে তাদের পুরাতন শিল্প—কল—কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে।”
বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে সেটা অবাস্তব বলে মনে করে জাসদ। দলটি বলছে, বিগত অর্থবছরের বাজেট নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয় নাই।
তবে জাসদের বিবৃতিতে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে বলা হয়, বাজেটে মোবাইল ফোনের উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে ভ্যাট প্রত্যাহারের সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখা, মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনে ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানির উপর কর কমিয়ে আনা; কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারের উপর শর্ত সাপেক্ষ কর কমিয়ে আনা, মোবাইল সিমের উপর ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব সাধুবাদ যোগ্য।
‘সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণে আধাআধি প্রচেষ্টা রয়েছে: বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
নতুন বাজেট সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণে আধাআধি প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে বিশাল অংকের ঘাটতি বাজেটের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপরই বর্তাবে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণে নির্ভরতাও বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, “বিশাল ঘাটতি পূরণ আর রাজস্ব সংগ্রহই হবে বাজেট বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি রোধ করতে না পারলে প্রবৃদ্ধির কোনো খতিয়ান কাজে আসবে না। কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব অর্থনৈতিক দূর্বৃত্তায়নকে নতুন করে উৎসাহ যোগাবে “
সাইফুল হক বলেন, ‘বাজেট প্রস্তাবনায় ' সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণের আধাআধি প্রচেষ্টা রয়েছে', সমাজের নানা অংশকে তুষ্ট করার চেষ্টা আছে।
আশাবাদে ভারাক্রান্ত সুলিখিত বাজেট: ইসলামী আন্দোলন
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বলেছেন, “বাজেটে এতো বেশি আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, বাজেটকে আশাবাদে ভারাক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।”
স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনা করে বাজেট প্রস্তাব করায় তা সাধুবাদযোগ্য মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু ২০৩৪-এর মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির আশাবাদ, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ এ নামিয়ে আনা, ৬.৫ প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রা অর্জন করা বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন হবে।
“বাজেট বক্তব্যে ভঙ্গুর অর্থনীতি, অস্থির বিশ্বরাজনীতির কথা আলোচনা করেও এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা কেবলই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলেই মনে হচ্ছে।”
কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত জরুরি: বাংলাদেশ ন্যাপ
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি মোকাবেলায় দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেন, “সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য বড় বাজেট বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত জরুরি।
“বড় বাজেট দিয়ে আবার যদি কোনো কারণে ২০-৩০ শতাংশ লোপাট হয়ে যায়, তাহলে তো কোনো লাভ হয় না। বাজেট যে যে কাজে ব্যবহার করা হবে, সততার সঙ্গে প্রয়োজন যতটুকু, ততটুকু যেন স্ব স্ব বিভাগ ব্যবহার করে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।”
বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার বিক্ষোভ করবে বাসদ। বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
সূত্র: বিডি নিউজ
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










