সেনা মোতায়েনের কারণ জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১৮:৩০

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের ছয় এলাকায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘‘গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর লক্ষ্য সম্ভাব্য নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা।’’
সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কোন কোন জায়গায় তাদের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ) অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আরও কিছু বিষয় আছে। সেগুলো ফাঁস করতে চাই না। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু মহল অপতৎপরতায় লিপ্ত আছে, সে জন্য আমরা অ্যালার্ট থাকার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগর, গাজীপুর মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ এবং ফরিদপুর জেলায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সেনা মোতায়েনের কারণ ব্যাখ্যা করে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আনা একটি রুটিন কার্যক্রম। মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে আনা হয়, বিজিবিকেও আনা হয়। গত দেড় বছর মাঠে থাকা সেনাবাহিনীকে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে এবং গত ১৫ জুন সেই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগের সেনা মোতায়েনের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সিদ্ধান্তের কোনো মিল নেই।”
তিনি বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ ‘মাফিয়া বাহিনী’ আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় তারা মিছিল-সমাবেশের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমাদের মনে হয়েছে তারা অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে। এ বিবেচনায় সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি আজ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ আইন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে যে কোনো ধরনের অপতৎপরতা মোকাবিলা করা যায়।”
পুলিশের ওপর আস্থার অভাব থেকেই সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “এখানে আস্থাহীনতার প্রশ্ন আসে কেন? আমাদের পুলিশ বাহিনী যে কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করেছে, তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। আবার যেখানে উচ্ছৃঙ্খলতা হয়েছে, সেখানে শাস্তিও নিশ্চিত করা হয়েছে। এখানে আস্থাহীনতার কোনো বিষয় নয়।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণেই সরকার সেনা মোতায়েন করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, তবে আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।”
এ সময় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবকে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনো বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে সবাই সমান। পুলিশের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে প্রয়োজন মনে করে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার আগে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বজনীন অধিকারে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, বর্তমান সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের হার সবচেয়ে কম। দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।”
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে হরিদাস চন্দ্রের রামমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ এবং অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সকল সম্প্রদায়েরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা আবশ্যক। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে—এমন যে কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে।”
বৈঠকে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং অর্পিত সম্পত্তি আইনসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মার নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










